জীবন বিপন্ন করার প্রতিযোগিতা রুখতে হবে

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:৪৮
গ্রাম-গঞ্জের দোকানগুলো ক্রেতাদের কাছে আসল ও কার্যকর ওষুধ বিক্রি করছে কিনা তা এখন একটি বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। গত ৩০ ডিসেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, রাজধানীর কেরানিগঞ্জ এলাকার একটি ভবনে র্যাব হানা দিয়ে বিপুল পরিমাণ নকল ও ভেজাল ওষুধ এবং ওষুধ তৈরির সরঞ্জামাদিসহ এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে। সামপ্রতিক সময়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার প্রতিবেদন থেকে আরো জানা যায়, গ্রাম-গঞ্জের প্রত্যন্ত এলাকার বাজারগুলো এমনকি ঢাকা ও চট্টগ্রামের অভিজাত এলাকা নকল-ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধে সয়লাব হয়ে গেছে। বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলের বাজারগুলোতে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টিকারী এ অপকর্মটি বেশি ঘটে চলেছে। তবে এর শিকার কেবল উত্তরাঞ্চলের জনগণই নয়। যেহেতু এই ধরনের ওষুধ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে দেশের কোনো এলাকার মানুষই নকল-ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ক্ষতিকর ওষুধের আওতা থেকে মুক্ত নয়। এর শিকার রোগ নিরাময় প্রত্যাশী দেশের প্রত্যেক এলাকার মানুষ। একদিকে যেমন দেশে নকল ওষুধ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে নকল-ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধসমূহ প্রতিবেশী দেশের সীমান্ত অতিক্রম করে চোরাইপথে এদেশে প্রবেশ করছে। দামি বিদেশি ওষুধ তো বটেই, বাংলাদেশে তৈরি হয় এবং ভালো বাজার আছে এমন ওষুধও সীমান্তের ওপার থেকে নকল করে এদেশে চালান করা হচ্ছে। এর মধ্যে জীবন রক্ষাকারী বেশকিছু ওষুধও রয়েছে যা অত্যন্ত নিম্নমানের কিংবা নকল ও ভেজাল। এসব ওষুধ ব্যবহার করলে ব্যবহারকারীর পরিণতি কী হবে তা আর উল্লেখের প্রয়োজন পড়ে না। অর্থ-সম্পদ খরচ করে যে মৃত্যুকে ঠেকানোর জন্য রোগাক্রান্ত মানুষের আকুল প্রচেষ্টা, সেই মৃত্যুকেই যে আহবান করা হচ্ছে ওইসব বিপজ্জনক ওষুধ সেবন করে তা অনেক হতভাগ্য রোগীর ও তাদের অভিভাবকদের অজানা থেকে যায়। অভিভাবকরা বুঝতেও পারেন না, এসব নকল-ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ কিনে রোগমুক্তির জন্য প্রিয়জনের মুখে তুলে দিয়ে তাকে তারা কীভাবে ধীরে ধীরে মৃত্যুর পথে ঠেলে দিচ্ছেন। এ জাতীয় নীতি-নৈতিকতা বহির্ভূত অবৈধ ব্যবসার বিরুদ্ধে অতীতে অনেক লেখালেখি হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, জনঅকল্যাণকর এ হীন ব্যবসা আজও বন্ধ হয়নি। বরং বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ব্যবহূত বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেয়া ডিসপোজেল সিরিঞ্জগুলো রি-সাইক্লিং পদ্ধতিতে পুনরায় প্যাকেটজাত করে বাজারে বিক্রিরও নজির আছে। এ যেন চলছে এবং চলতেই থাকবে। মানুষের জীবন বিপন্ন করার এমন প্রতিযোগিতা যেন কেউ নেই বন্ধ করার। দেশের সংশ্লিষ্ট এলাকার আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন কেন যে এমন ঘাতক ওষুধের ব্যবসা বন্ধ করার জন্য উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ করে না তা অত্যন্ত রহস্যজনক। কেন যে বিপজ্জনক ওষুধপত্র সীমান্ত পথ দিয়ে পাচার হয়ে আসা রোধ করতে পারে না? কিংবা সীমান্ত প্রহরার কাজে সবসময় নিয়োজিত বিভিন্ন বাহিনীর লোকজন যে কেন এসবের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে অপারগ হয় তা বোধগম্য নয়। আমরা সাধারণ মানুষ মনে করি এসব ব্যর্থতা জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নয়। আমরা চাই সরকার জনস্বার্থে উল্লিখিত অনিয়ম ও ব্যর্থতার প্রতিকার করতে এগিয়ে আসুক। মনে রাখতে হবে সীমান্তপথে অন্যান্য ভোগ্যপণ্য ও দ্রব্যাদির চোরাচালানের সঙ্গে নকল-ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ প্রাণঘাতী ওষুধের চোরাচালানের বিষয়টির বিশেষ পার্থক্য রয়েছে। চোরাচালানের ভোগ্যদ্রব্য ও অন্যান্য পণ্যাদি দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড নষ্ট করে বটে, তবে মানুষের স্বাস্থ্যহানি কিংবা প্রাণনাশ করে না। কিন্তু প্রতিবেশী দেশ থেকে সীমান্তপথে পাচার হয়ে আসা এসব নকল-ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ ব্যবহারকারী জনগণের স্বাস্থ্যনাশ ও প্রাণহানির কাজটিই সর্বাগ্রেও করে। কথিত ওষুধ নামের এই বস্তুগুলো রোগ নিরাময়ে সহায়ক নয়। বরং এসব সেবনে নানান পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াসহ মৃত্যুই ত্বরান্বিত হয়। সুতরাং যে কোনো মূল্যে এসব ঘাতক ওষুধের অনুপ্রবেশ রুখতে হবে। রোধ করতে হবে দেশের ভেতর এর ছড়িয়ে পড়া। এছাড়া আরো যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো এসব ঘাতক ওষুধ যেসব দোকানে বিক্রি হয় তাদের মালিকরা জানে যে এগুলো সঠিক ও নিরাপদ ওষুধ নয়। অতিরিক্ত মুনাফার লোভেই তারা পাচারকারীদের সহায়তা দান করে ক্রেতাদের কাছে এসব বিপজ্জনক ওষুধ বিক্রি করে প্রতারণার মাধ্যমে। এভাবে জনগণের স্বাস্থ্যহানি ও জীবনের প্রতি হুমকি সৃষ্টি করার দায়ে এসব দোকান মালিকও অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হওয়া উচিত। পত্রিকান্তরে প্রকাশ—এই ধরনের বিপজ্জনক ওষুধের ব্যবসায় সহায়তা দেয়ার জন্য সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে গড়ে উঠেছে ড্রাগ লাইসেন্সবিহীন অসংখ্য ওষুধের দোকান। আর সীমান্তের অপর পাড়ে গড়ে উঠেছে নকল ওষুধ তৈরির অসংখ্য কারখানা। সব মিলে বোঝা যাচ্ছে, একটি বিশাল দুষ্টচক্র এই অপকর্মে যুক্ত রয়েছে। তাই জরুরিভিত্তিতে মানুষের জীবন বিপন্ন করার প্রতিযোগিতা রুখতে হবে। একইসঙ্গে জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তা, দেশীয় ওষুধশিল্পের মঙ্গল বিধান এবং রোগ নিরাময় প্রত্যাশী মানুষের জীবন রক্ষা ও ক্রেতাস্বার্থ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ওই দুষ্টচক্রকে স্থায়ীভাবে নির্মূলের ব্যবস্থা করা ছাড়া উপায় নেই। চট্টগ্রাম