দিনাজপুর পৌরসভায় চাকরি করেন রাজু বাসফোর, হামিদা বাসফোর, মালতি বাসফোর, জ্যোস্না হেলা ও বারেক হেলাসহ আরো অনেকে। সব মিলিয়ে ১০৫ জন। তাদের কাজ হলো ঝাড়ু দিয়ে শহর পরিষ্কার রাখা। সকাল সকাল লোক চলাচল বেশি হওয়ার আগেই নির্দিষ্ট রাস্তা, বাজার ঝাড়ু দেয়ার কাজ শেষ করতে হবে।
কিন্তু দলিত হরিজন সমপ্রদায়ের এই ঝাড়ুদাররা মোটেও ভালো নেই। কারণ তাঁদের টাকা নেই। পৌরসভা যে বেতন দেয়, তা এতই কম যে, ঐ টাকায় ৭ দিনেও চলা যায় না। সেখানে এক মাস কীভাবে চলবে তা ভাবতে গিয়ে তাঁদের কুল-কিনারা থাকে না।
পৌরসভার এই ঝাড়ুদারের বেতন মাত্র ৯০০ টাকা। বর্তমান মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম ৩০০ টাকা বাড়ানোর ফলে ৯০০ টাকা হয়েছে। আগের মেয়র সফিকুল হক ছুটুর সময় বেতন ছিল ৬০০ টাকা। তার আগে সৈয়দ মোসাদ্দেক হোসেন লাবুর সময় ছিল মাত্র ৩০০ টাকা। এত অল্প বেতনে কেমন করে চলেন তাঁরা?
“চলে না”—বলেন বারেক বাসফোর। “চলে না বলে সারাদিন কাজ খুঁজি। কিন্তু কাজও পাওয়া যায় না। কোনোদিন কাজ পাওয়া গেলেও বেশিরভাগ সময়ই বেকার থাকতে হয়। যেদিন ২/৩ শ টাকা হয়, ঐ দিন একটু বাজার-টাজার করি। না হলে আধপুরা খেয়ে দিন পার করি।’’ এভাবেই নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন বারেক বাসফোর।
দিনাজপুর পৌরসভার প্রায় সব ঝাড়ুদারের অবস্থা এই আধপেটা খাওয়াই বলা যায়। কাজ নেই তাদের। কাজ নেই বলে টাকা নেই। টাকা নেই বলে খাওয়া-পরার নিশ্চয়তা নেই। অভাব-অনটনে দিশেহারা জীবন তাদের।
২৯ বছর বয়সী রাজু বাসফোর ৪ মেয়ে এবং ১ ছেলে সন্তানের জনক। স্ত্রী সীতা বাসফোরসহ ৭ জন খানেওয়ালা তার। কিন্তু সংসার চালাতে গিয়ে চোখে সর্ষে ফুল দেখা ছাড়া উপায় থাকে না। তিনি বলেন, “কাজের জন্য সারাদিন ঘুরি। কিন্তু কাজ পাই না। কোনোদিন পেলেও ২/৩ শ টাকার বেশি হয় না। কিন্তু বর্তমান চড়া মূল্যের বাজারে এ টাকায় কিছুই হয় না।”
‘এই যুগে এতগুলো বাচ্চা কেন? ফ্যামিলি প্লানিংয়ের পরামর্শ দেয়নি কেউ?’ প্রশ্ন করি রাজু বাসফোরকে। রাজু বলেন, “ফ্যামিলি প্লানিংয়ের লোক কখনো আমাদের কাছে আসে না। বাচ্চা কয়টা হবে না হবে তা নিয়ে আমরা ভাবি না। ভগবান বাচ্চা দিলে আমরা কী করব?”
রাজুর মতো অবস্থা পুতুল বাসফোরের (৩৬)। তাঁরও সন্তান ৪ জন। সারাদিন কোদাল, ঝাড়ু নিয়ে কাজ খোঁজেন তিনি। কিন্তু দিনাজপুর শহরে এখন সার্ভিস পায়খানা নেই বললেই চলে। যখন এ ধরনের পায়খানা ছিল, তখন কাজের অভাব ছিল না। এখন সব পায়খানাই আধুনিক স্যানিটেশনের আওতায় এসেছে। গরিব মানুষও এখন কুয়া কিংবা রিং পায়খানা দেয়। পায়খানার এ আধুনিকায়নের কারণে সু্ইপারদের প্রয়োজনীয়তা প্রায় ফুরিয়ে গেছে। সার্ভিস পায়খানা উঠে যাওয়ার কারণেই বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সুইপারকে ঝাড়ুদারের চাকরি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সামান্য বেতনের এ চাকরি আসলে তাদের সঙ্গে প্রহসন।
দিনাজপুর পৌরসভায় চাকরি করেন কুলদীপ হেলা, বাসফোর হেলা, সাখাওয়াত, রফিকুল, ফুলমতি, বিক্রম, চান্দিয়া, সন্তু। তাঁদের সকলের অবস্থাই রাজু-পুতুলদের মতো। পৌরসভার পয়ঃপ্রণালী পরিদর্শক গোলাম নবী জানালেন, ঝাড়ুদারদের সবাই হরিজন। তাঁদের চাকরি অস্থায়ী। তাঁরা সকালবেলা নির্ধারিত জায়গায় ঝাড় ু দেয়ার কাজ করেন। এক-দেড় ঘণ্টায় এ কাজ শেষ হয়।
বেতন মাত্র ৯০০ টাকা কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘ঝাড়ুদারদের বেশি কাজ নেই। সকালে এক/দু ঘণ্টা ঝাড়ু দিয়েই তাদের কাজ শেষ। সে হিসেবে বেতন কম বলা যাবে না। তাছাড়া আগে বেতন ৬০০ টাকা ছিল। মানবিক দিক বিবেচনায় আমি এটা ৯০০ টাকা করেছি।’
দলিত ঝাড়ুদাররা সামান্য বেতনে পৌরসভার চাকরি ধরে রেখে দিনের বেলা অন্য কাজ খুঁজে বের করার চেষ্টা করলেও সফল হচ্ছেন না। কারণ তাঁদেরকে সহযোগিতা করার জন্য সরকারি কিংবা বেসরকারি পর্যায়ে তেমন উদ্যোগ নিয়ে কেউ এগিয়ে আসছে না। অথচ তাঁরাও মানুষ। তাঁদের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে সরকারের বিশেষ পরিকল্পনা ও কর্মসূচি দরকার।
হরিজন ঝারড়ুদারদের মানবেতর অবস্থা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। কর্মসংস্থানসহ মানুষের সব ধরনের মৌলিক অধিকার পাবার অধিকার তাঁদের আছে। তা না হলে মানবাধিকার লংঘন হয়। এটি রাষ্ট্রের ভেবে দেখা দরকার।
দিনাজপুর
