শতরঞ্জির নবযৌবন

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:১৬
রংপুর শহর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার পশ্চিমে নিসবেতগঞ্জ গ্রাম। সে গ্রামেই প্রথম গড়ে ওঠে ঐতিহ্যবাহী শতরঞ্জি শিল্প। শিল্পের নামানুসারেই গ্রামের নাম হয়েছে শতরঞ্জিপল্লী। মোটা বুনননির্ভর যেসব শিল্প এখনো টিকে আছে শতরঞ্জি তার অন্যতম। রঙ-বেরঙের সুতা আর গ্রাম বাংলর প্রকৃতিনির্ভর নকশার সমন্বয় খুঁজে পাওয়া যায় শতরঞ্জির বুননে। কয়েক’শ বছরের ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল। রংপুরে ক’জন কৃতী উদ্যোক্তার প্রচেষ্টায় আবারো শতরঞ্জি পেয়েছে তার নতুন যৌবন। শুধু দেশে নয়, ইউরোপের দেশগুলোতেও তৈরি করে নিয়েছে এর চাহিদা। প্রতিবছর দেশ থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যে পরিমাণ কারুশিল্প সামগ্রী রফতানি করা হয় তার ৫০ ভাগই শতরঞ্জি। আর এ ৫০ ভাগ শতরঞ্জির জোগান দেয় কেবল কারুপণ্য রংপুর লিমিটেড। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে স্থানীয় শ্রমিকদের ডিজাইনে করা শতরঞ্জি রফতানি করে প্রতিবছর অর্জিত হচ্ছে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা। রংপুরের অভাবী মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। বৃটিশ আমলে শতরঞ্জির ব্যবহার হতো দেশীয় রাজা-জমিদারদের প্রাসাদে। সে সময় শিল্পমনা পরিবারে একটি শতরঞ্জি ঘরের মেঝেতে না থাকলে যেন আভিজাত্য প্রকাশ পেতো না। বর্তমানেও একটি শতরঞ্জির ব্যবহার শৈল্পীক আভিজাত্যের পরিচয় বহন করতে শুরু করেছে। শতরঞ্জি আগে শুধু ঘরের মেঝেতে বিছানোর জন্যই তৈরি হতো। কিন্তু কালের প্রসার ঘটতে শুরু করেছে। একই বুননে ওয়ালম্যাট, টেবিলম্যাট, কুশনকভার, সোফার রুমাল, জায়নামাজ, পাপোশ ইত্যাদি তৈরি হচ্ছে। প্রায় ২শ’ বছর আগে নিসবেতগঞ্জ গ্রামের মানুষ নিজ উদ্যোগে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাঁশের তৈরি তাঁত যন্ত্রে মোটা সুতি কাপড় ও উলেন সুতা ব্যবহার করে পাটি জাতীয় এক ধরনের সামগ্রী তৈরি করতো। স্থানীয় ভাষায় যার নাম ছিল ‘মালুদা’। সেই মালুদায় তাঁতীরা কারুকাজে গ্রাম বাংলার প্রকৃতি ফুটিয়ে তুলতো। ধীরে ধীরে এ দৃষ্টিনন্দন সামগ্রী পাশের দেশগুলোতে প্রসার লাভ করে। সেই মালুদাই শতরঞ্জি নাম ধারণ করেছে। ইউরোপের বাজারে শতরঞ্জির একমাত্র রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান কারুপণ্য রংপুর লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী শফিকুল আলম সেলিম ইত্তেফাককে বলেন, ১৯৯১ সালের কথা। রংপুরে ‘কারুপণ্য’ দোকান চালু করি। তখন দোকানে অন্যান্য কারুপণ্য সামগ্রীর পাশাপাশি কিছু শতরঞ্জির রাখি এবং ক্রেতাদের এর গুণ তুলে ধরে কিনতে উদ্বুদ্ধ করি। সে সময় শতরঞ্জির তাঁতীরা প্রায় সবাই পেশা বদল করে অন্য পেশায় চলে গেছেন। আমরা তাদের খুঁজে বের করি এবং ঐ তাঁতীদের মাধ্যমে কিছু নারী-পুরুষকে প্রশিক্ষণ দিয়ে নতুন করে শতরঞ্জির কদর বৃদ্ধির চেষ্টা করি। বর্তমানে রংপুরে তার ৫টি শতরঞ্জি কারখানা রয়েছে। যেখান থেকে তৈরি শতরঞ্জি বিদেশে রফতানি হচ্ছে। শফিকুল আলম মনে করেন, শতরঞ্জি উত্পাদনে সরকারের সাবসিডি দেয়া উচিত। সরকার এ শিল্পের জন্য সহজ শর্তে ঋণ বা আয়কর না নিয়ে সহযোগিতা করতে পারে। তাহলে স্থানীয় বাজারেও এ শিল্পের বাজার তৈরি হবে। উদ্যোক্তা বৃদ্ধি পাবে মানুষের কর্মসংস্থান হবে। রংপুর শহর থেকে পশ্চিমে সেনানিবাসের পিছনে শতরঞ্জিপল্লী। সেখানে গ্রামের প্রায় হাজার পরিবার এ শিল্পের কাজ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। শতরঞ্জির সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেকে এ শিল্প প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী হয়ে উঠছেন। শতরঞ্জি পল্লীতে কাজ করছে প্রায় ৩শ’ কর্মী। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত চলে শতরঞ্জি তৈরির কাজ। পল্লীর আশপাশের নারী-পুরুষ এ শিল্পের শ্রমিক। অনেকে বাপ-দাদা সূত্রে পেয়েছেন এ শিল্পে সৃজনশীল ক্ষমতা। ৮শ’ টাকা থেকে ৭/৮ হাজার টাকায় পাওয়া যায় একটি শতরঞ্জি। বড়-ছোট মাপের তারতম্য, গাঁথুনি ও সুতার ভিন্নতার কারণে দামের পার্থক্য হয়। শতরঞ্জি পল্লীর আদুরী বেগম বললেন, শুধু ঘরের মেঝেতে বিছানোর জন্য নয়, এখানে তৈরি হয় টেবিলম্যাট, কুশনকভার ইত্যাদি। ক্রেতা মূলত শিল্পমনা অভিজাত শ্রেণীর মানুষ। রংপুর শহরে কিছু শতরঞ্জির বিক্রয় কেন্দ্রও দেখা যায়। শতরঞ্জি পল্লীতে খটখট শব্দে মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে দেখা যায় বাক প্রতিবন্ধী হায়দার আলীকে। তিনি ইশারায় বুঝিয়ে দেন, ডিজাইন দেখিয়ে দিলে দ্রুত নিখুঁত বুননে তৈরি করতে পারেন শতরঞ্জি। হায়দার আলী ১৫-১৬ বছর বয়স থেকেই এই শিল্পে জড়িত। শ্রমিকদের মজুরি হয় সাপ্তাহিক কাজের ভিত্তিতে। মো. জাফর আলী শতরঞ্জির ডিজাইনার হিসাবে কাজ করছেন ৪০ বছর ধরে। তার দুই ছেলে, এক মেয়েও শতরঞ্জি বুননের কাজ করেন। বললেন, এনজিওদের প্রদত্ত প্রশিক্ষণ ও উদ্যোগে পল্লীর বিভিন্ন জায়গায় গড়ে উঠেছে ছোট-ছোট করখানা।