বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:১৮
বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সরকার রাজনৈতিক ও সুশীল সমাজের কার্যক্ষেত্র সংকীর্ণ করেছে, বিভিন্ন সময় আইন লঙ্ঘন করা সত্ত্বেও নিরাপত্তা বাহিনীকে আইনী ব্যবস্থার মুখোমুখি করেনি এবং বিভিন্ন গুম ও হত্যার তদন্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। গতকাল শুক্রবার মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) প্রকাশিত বৈশ্বিক প্রতিবেদন-২০১৩ তে এ চিত্র উঠে এসেছে। ৬৬৫ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে সংস্থা ৯০টির বেশি দেশের ২০১২ সালের মানবাধিকার পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরেছে। বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক প্রতিবেদনে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের অনীহা, বিডিআর বিদ্রোহ ও যুদ্ধাপরাধের বিচারে নিরপেক্ষতার প্রশ্ন, রাখাইনদের বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা অগ্রাহ্য, নারী নির্যাতন, সুশীল সমাজ ও এনজিওর উপর নজরদারিসহ নানা বিষয় উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমান সরকার বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল। কিন্তু সরকার এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আদৌ কিছু করছে বলে মনে হচ্ছে না। বাংলাদেশে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে ক্রসফায়ার হিসেবে চালিয়ে দেয়া ও বিরোধী দলের সদস্য ও রাজনৈতিক কর্মীদের গুমের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। তবে ২০১২ সালে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কমে আসাকে স্বাগত জানিয়ে মানবাধিকার সংস্থাটি বলেছে, তার পরও হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বেশি ছিল। এশিয়া বিষয়ক পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এমন দাবি সরকার ও র্যাব কর্মকর্তারা করলেও এখন পর্যন্ত কাউকে অত্যাচার ও হত্যার কারণে দায়ী করা হয়নি। এমনকি স্কুল ছাত্র লিমনকে গুলি করার মতো আলোচিত মামলাতেও কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়নি বরং কর্তৃপক্ষ লিমনের বিরুদ্ধে ভ্রান্ত মামলা দায়ের করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৯ সালে বিদ্রোহের জন্য অভিযুক্ত বাংলাদেশ রাইফেলস’র সদস্যদের বিরুদ্ধে ত্রুটিপূর্ণ বিচার ২০১২ সালেও চলেছে। গত বছরের জুলাই মাসে এইচআরডব্লিউ নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু এবং তার সাথে গণবিচারে প্রাপ্য প্রক্রিয়াগত অধিকারে গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রতিবেদন আকারে তুলে ধরে। সরকার সেসব অভিযোগ তদন্ত না করেই সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে। এমনকি এইচআরডব্লিউ’র সাথে একটি সভায় বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রিপোর্টটি না পড়েই সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন। মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নামে পরিচিত সম্পূর্ণভাবে দেশীয় আদালতের মামলার কার্যক্রমে নিরপেক্ষ বিচারের জন্য প্রয়োজনীয় মানের ব্যাপক ঘাটতি দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার এবং বহু আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে নানা প্রস্তাব আসা সত্ত্বেও এই বিচারের মূল আইন ও কার্যবিধিতে উপস্থিত গুরুতর ত্রুটি আমলে নেয়া হয়নি। ২০১২ সালে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে অনুষ্ঠিত সকল মামলা ছিল বাদী ও বিবাদীপক্ষের নানা অভিযোগে পরিপূর্ণ। একটি মামলায় বাদী পক্ষ জানায়, তদের পক্ষে কিছু সংখ্যক সাক্ষীকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা সম্ভব নয়। ঐ সাক্ষীদের পূর্বে লিখিত বক্তব্য তথ্যপ্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করার অনুরোধ করে। অথচ এদের মধ্যে কিছু সাক্ষী সেইফ হাউসে অবস্থান করছিলেন এবং ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত হয়ে জবানবন্দি প্রদান করতেও সক্ষম ছিলেন। সরকারি সেইফ হাউসের লগ-বইতে উপস্থিত এমন প্রমাণ বিবাদী পক্ষ ট্রাইব্যুনালের সামনে তুলে ধরে। গত ডিসেম্বরে দি ইকনমিস্ট সাময়িকী ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান ও ব্রাসেলসে অবস্থানরত এক উপদেষ্টার মধ্যেকার ইমেইল ও স্কাইপ কথোপকথন থেকে একটি প্রতিবেদনে প্রকাশ করে। এসব কথোপকথনে চেয়ারম্যান, সরকার, বাদী পক্ষ এবং ব্রাসেলসে অবস্থান করা উপদেষ্টার মধ্যে বহুদিন ধরে চলতে থাকা নিষিদ্ধ যোগাযোগ প্রকাশ পায়। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমে সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপও ধরা পড়ে। এই রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পর চেয়ারম্যান পদত্যাগ করেন। এই পদত্যাগের ফলে ট্রাইব্যুনালে এমন একটি বেঞ্চ তৈরি হয়, যেখানে তিনজন বিচারকের মধ্যে একজনও এক অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ তথ্য-প্রমাণ শোনেননি। এসব কারণে দায়ের করা পুনর্বিচারের চারটি আবেদন ট্রাইব্যুনাল প্রত্যাখ্যান করে নিজের নিরপেক্ষতা প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। এ বিষয়ে ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, অভিযুক্ত বিদ্রোহী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অত্যন্ত সমস্যাপূর্ণ প্রক্রিয়ার মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে এবং বিচারকদের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা এবং সর্বোপরি বিচার প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এর ফলে গুরুতর অপরাধ সংঘটনের জন্য দায়ী ব্যক্তিরা প্রহসনমূলক বিচারের শিকার হচ্ছেন বলে মনে হতে পারে। কোনো পর্যাপ্ত তদন্ত না করেই সকল অভিযোগকে প্রত্যাখ্যান করে সরকার দেখিয়েছে যে, তারা ভোট পাওয়ার জন্য যতটা মনোযোগী, আইনের শাসন বাস্তবায়নের জন্য ততটা মনোযোগী নয়। ২০১২ সালের জুন মাসে পার্শ্ববর্তী দেশ বার্মার (মিয়ানমার) আরাকান রাজ্যে ঘটে যাওয়া সামপ্রদায়িক সহিংসতার কারণে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করলে সরকার তার আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা অগ্রাহ্য করে। সরকার এই বলে শরণার্থীদের নৌকায় তুলে দিয়ে ফেরত পাঠিয়ে দেয় যে, নিরাপদ আশ্রয়স্থল প্রদানে তাদের প্রতি কোনো দায়দায়িত্ব নেই। এছাড়াও সরকার কক্সবাজারে অবস্থিত রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে কাজ করা এনজিওদের কার্যক্রমেও হস্তক্ষেপ করে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, এইচআরডব্লিউ’র মতে বাংলাদেশে নারীর উপর সহিংসতা রোধের জন্য শক্ত আইন থাকলেও আইনের বাস্তবায়ন নেই বললেই চলে। ধর্ষণ ও যৌতুক সংক্রান্ত নিপীড়নসহ নারীর উপর সহিংসতা, এসিড সন্ত্রাস, ফতোয়ার নামে বেআইনি শাস্তি প্রদান এবং যৌন অপরাধ ঘটেই চলেছে। এছাড়া সুশীল সমাজের উপর চাপ প্রয়োগ ও নজরদারী বেড়ে যাওয়া ছিল বছরের সবচেয়ে উদ্বেগজনক।