পদ্মা সেতুতে অর্থায়নের জন্য বিশ্বব্যাংককে করা অনুরোধ ফিরিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে চিঠি দিয়ে বিশ্বব্যাংককে এ কথা জানিয়ে দেয়া হয়। তবে এই সেতু এখন নিজস্ব অর্থায়ন না বিকল্প অর্থায়নে হবে সে সম্পর্কে চূড়ান্ত কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। সরকারের একটি দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, সেতু প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য বিশ্বব্যাংকের বাইরে একাধিক দেশ ও দাতা সংস্থাকে নিয়ে একটি পৃথক কনসোর্টিয়াম গঠনের চেষ্টা চলছে।
গতকাল শুক্রবার সকালে বিশ্বব্যাংকের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে প্রথম জানানো হয়, বাংলাদেশ পদ্মা সেতুতে অর্থায়নের অনুরোধ ফিরিয়ে নিয়েছে। এর পরপরই এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, জানুয়ারির মধ্যে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে কোন ইতিবাচক সাড়া না পেয়ে সরকার অর্থায়নের অনুরোধ প্রত্যাহার করে নিয়েছে। তিনি বলেন, সরকার এখন তার বর্তমান মেয়াদে সেতুর নির্মাণ কাজ শুরুর জন্য বিকল্প অর্থায়নের ব্যবস্থা করবে। অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, জাতীয় সংসদ অধিবেশনে রবিবার তিনি চিঠির বিস্তারিত দিক এবং সেতু নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরবেন। এদিকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আরস্তু খান ইত্তেফাককে বলেন, বিশ্বব্যাংকের সব প্রক্রিয়া শেষ হতে অনেক সময় লাগবে। কিন্তু সরকারের পক্ষে সেতুর কাজ করার ক্ষেত্রে আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই। সে জন্যই আমরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
গত বুধবার বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম ওয়াশিংটনে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পের সব শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বব্যাংক অর্থায়নের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে না। একই সঙ্গে এ বিষয়ে চলমান ফৌজদারি তদন্ত পূর্ণাঙ্গ ও সুষ্ঠু হওয়ার নিশ্চয়তাও থাকতে হবে। এর পরপরই বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে অনুরোধ ফিরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত বিশ্বব্যাংককে জানিয়ে দেয়া হল।
বিশ্বব্যাংকের কাছে পাঠানো বাংলাদেশ সরকারের চিঠিতে বলা হয়েছে, এই প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে বাংলাদেশ তদন্ত চালিয়ে যাবে। বাংলাদেশ সরকারের এই চিঠি বিশ্বব্যাংক গ্রহণ করেছে। ব্যাংক তরফে আশা প্রকাশ করা হয়েছে, প্রকল্পের অভিযোগ ওঠা বিষয়ে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন পরিপূর্ণ ও স্বচ্ছ তদন্ত করবে।
এদিকে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, পদ্মা সেতুর অর্থায়নের ব্যাপারে মালয়েশিয়া, চীন, ভারত অর্থায়ন করতে পারে। তিন দেশের প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে নিজস্ব অর্থায়নেও পদ্মা সেতুর নির্মাণের প্রস্তুতি রয়েছে বলে যোগাযোগমন্ত্রী উল্লেখ করেন। গতকাল সকালে গাজীপুরের নয়নপুর এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার তিন নম্বর প্যাকেজের কাজ উদ্বোধন করতে গিয়ে যোগাযোগমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি জানান, কোন্ প্রক্রিয়ায় অর্থায়ন হবে এ মাসেই সে ব্যাপারে জানা যাবে।
পদ্মা সেতু প্রকল্পে স্বল্প সুদে বিশ্বব্যাংকের ১২০ কোটি ডলার ঋণ দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে গত বছরের জুন মাসে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পের ঋণচুক্তি বাতিল করে। পরে সরকারের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে গত সেপ্টেম্বর মাসে আবার ফিরে আসার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্বব্যাংক। তখন শর্ত দেয়া হয়, তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) সহায়তা করতে বিশেষজ্ঞ দল পাঠাবে বিশ্বব্যাংক। সেই স্বাধীন দলটির পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে অর্থায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে বিশ্বব্যাংক। ইতিমধ্যে পর্যবেক্ষণ দলটি দুইবার বাংলাদেশ ঘুরে গেছে। দুদক পদ্মা-দুর্নীতি নিয়ে মামলা করেছে। কিন্তু প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন (এফআইআর) থেকে মূল অভিযোগের আঙুল যার দিকে, সেই সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের নাম বাদ দেয়া নিয়ে বিশ্বব্যাংকের স্বাধীন পর্যবেক্ষণ দলটির সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশনের মতবিরোধ তৈরি হয়। সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ দলটি আবুল হোসেনকে বাদ দেয়ার কারণসহ দুদকের কাছে আটটি প্রশ্নের জবাব চেয়ে পাঠায়। এসব প্রশ্নের জবাবও ইতিমধ্যে পর্যবেক্ষক দলের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে দুদক।
এই প্রেক্ষাপটে কয়েক দিন আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ৩১ জানুয়ারির (গতকাল) মধ্যে বিশ্বব্যাংক সিদ্ধান্ত না জানালে বাংলাদেশ নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নেবে। তবে গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে বর্তমান সরকারের আমলে পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজ শুরু করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেন, বর্তমানে বিশ্বব্যাংকের সাথে অমীমাংসিত বিষয় নিরসনের চেষ্টা করা হচ্ছে। নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণের প্রস্তুতিও চলছে।
সরকার ইতিমধ্যে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু তৈরি করতে উদ্যোগ নিয়েছে। এ জন্য কোন্ অর্থবছরে কত টাকা দরকার হবে, তা জানাতে সেতু বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অর্থমন্ত্রী গত সোমবার সেতু বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এর আগে অর্থমন্ত্রী, যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও বৈঠক করেন। প্রধানমন্ত্রী দেশীয় অর্থায়নের ওপর জোর দিয়ে বিশ্বব্যাংকের বাইরে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাপানের আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা জাইকা ও ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংককে (আইডিবি) প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা যায় কি না, সেটি বিবেচনার পরামর্শ দেন।
সেতু বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রাথমিক কাজ শুরু করতে চলতি (২০১২-২০১৩) অর্থবছরে প্রয়োজন হবে প্রায় ১ হাজার ২শ’ কোটি টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রয়োজন ৯ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রয়োজন হবে ৭ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা এবং ২০১৫-১৬ সালে প্রয়োজন হবে ৩ হাজার ৭শ’ কোটি টাকা। অর্থাত্ মোট ৪ বছরে প্রয়োজন হবে কমবেশি ২৩ হাজার কোটি টাকা।
এদিকে গতকাল সরকারের দায়িত্বশীল একটি সূত্র ইত্তেফাককে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, সরকার সেতুর কাজ শুরু করবেই। জাজিরা পয়েন্ট থেকে কাজ শুরু হবে। চলতি বছরের মধ্যে এই সেতুতে ১২০০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। তবে এ সিদ্ধান্তটি এখনো চূড়ান্ত নয় যে, বিকল্প অর্থায়নে না সম্পূর্ণ দেশীয় অর্থায়নে সেতু নির্মিত হবে। সরকারের নীতি নির্ধারকদের একটি অংশের মত হলো - সম্পূর্ণ প্রকল্পটিকে এক সঙ্গে না দেখে ভিন্ন ভিন্নভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া উচিত। যেমন, মূল সেতুটি একজন করবে, সংযোগ সড়ক একজন করবে এবং নদী শাসনের কাজ দেয়া হবে অন্য কাউকে। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, এই চিন্তাগুলোর কোনটিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। শিগগিরই এ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়ে যাবে।
গত বছরের জুলাই মাসেই নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের বিষয়টি মন্ত্রিসভা কমিটি অনুমোদন করে। সে সময় মূল সেতুর দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছিল। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের ফিরে আসার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় সেবার দরপত্র আহ্বান করা হয়নি। সেতু বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এখনো সরকারের পক্ষ থেকে দরপত্র আহ্বান কিংবা ঠিকাদারের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যাপারে সরকারের কোন নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। সেতু বিভাগের সচিব খোন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম গতকাল ইত্তেফাককে বলেছেন, যেভাবেই হোক না কেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ অর্থ যোগাড় করবে। তারপর আমরা কাজে নামব। আমরা তহবিলের জন্য বসে আছি।
