শুধু ফসলের নিবিড়তা নয়। ভাবতে হবে নিবিড় ধান চাষের কথাও। চারা রোপণ থেকে শুরু করে সার ও কীটনাশক প্রয়োগসহ ধান চাষের প্রতিটি ক্ষেত্রে এখন সাশ্রয়ী হওয়ার বিকল্প নেই। কারণ, ফসল আবাদের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাড়ছে ব্যয়। বাড়ছে বাণিজ্যিক তত্পরতা। এই সময়ে সাশ্রয়ী ও নিবিড়তার পদ্ধতিগুলোই কৃষকের জন্য সবচেয়ে জরুরি। দেশে অনেক আগেই গবেষণা ও সম্প্রসারণ পর্যায়ে এস আর আই পদ্ধতি সম্পর্কে জানাশোনা রয়েছে। কিন্তু এর কোনো প্রচলন নেই। যতদূর জানা যায়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা কার্যালয়ের মাধ্যমে এ পদ্ধতি সম্প্রসারণের তাগিদও দেয়া আছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তাই ভাল করে জানেন না। সম্প্রসারণ তো দূরের কথা। কোনো কোনো উপজেলা পর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ এস আর আই পদ্ধতিতে একটি প্রদর্শনী প্লট তৈরি করেই শেষ করেছেন তাদের দায়িত্ব।
প্রশ্ন হল এস আর আই কী? ঝুংঃবস ড়ভ ত্রপব ওহঃবহংরভরপধঃরড়হ সংক্ষেপে যাকে বলা হয় এস আর আই। এস আর আই পদ্ধতি সর্বপ্রথম আবিস্কার করেন মাদাগাষ্কারের একজন স্কুল শিক্ষক হেনরী ডি লাওলানী। যিনি একটানা ৩০ বছর কৃষি ও কৃষকের সঙ্গে কাটানোর পর এমন একটি পদ্ধতি আবিস্কারে সমর্থ হন। পরে তিনি একটি বেসরকারি সংগঠন গড়ে তোলেন পদ্ধতিটি কৃষক পর্যায়ে পৌঁছে দিতে। পরে ইউএসএআইডি’র সহায়তায় এ পদ্ধতিটি প্রচারে আসে।
এটি কোনো জটিল কিছু নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ধান চাষের সমন্বিত প্রযুক্তি ব্যবহারের পদ্ধতিগুলোর মতই একটি। ভারত, শ্রীলংকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই শুরু হয়েছে এ পদ্ধতির ব্যবহার। এর মধ্য দিয়ে সবদিক দিয়েই সাশ্রয় করার সুবিধা রয়েছে। এস আর আই পদ্ধতিতে রোপণ করতে হয় ১০ থেকে ১৫ দিনের চারা। সারি থেকে সারির দূরত্ব রাখতে হয় ২৫ সেন্টিমিটার, চারা থেকে চারার দূরত্ব ২০ সেন্টিমিটার। প্রতি গোছায় লাগাতে হয় ১ থেকে ২টি চারা। সেচ দেয়ার সময় অনুসরণ করতে হয় এ ডব্লিউ ডি। তবে চারা রোপণের সময় থেকে কাইচ থোড় আসা পর্যন্ত জমিতে পানি রাখতে হবে। এই সময়ে আগাছা দমন করতে হবে। সমন্বিত এ পদ্ধতির মধ্যে কীটনাশক সম্পূর্ণ না ব্যবহার করার পরামর্শ রয়েছে। ব্যবহার করতে হবে আইপিএম পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে বেশি মাত্রায় ব্যবহার করতে হয় জৈব সার, কমিয়ে দিতে হয় রাসায়নিক সার। এতে স্বাভাবিকভাবেই কৃষকের উত্পাদন খরচ যেমন কমে আসে, একইভাবে বেড়ে যায় ধানের ফলন।
নব্বইয়ের দশকে প্রথম এই এস আর আই পদ্ধতি ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে ওঠে চীন। পরে ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিন, শ্রীলংকা ও বাংলাদেশে পদ্ধতির উপযোগিতা দারুণভাবেই প্রমাণিত হয়। এর মধ্যে শ্রীলংকা সবচেয়ে ভাল করেছে বলা যায়। সেদেশের আঠারোটি জেলায় এস আর আই পদ্ধতি
ব্যবহারের মধ্য দিয়ে ধানের উত্পাদন ব্যয় কমিয়ে ফলন প্রায় দিগুণে তুলতে সক্ষম হয়েছেন কৃষক। এছাড়াও এ পদ্ধতি ব্যবহার করছে কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মায়ানমার, ফিলিপিনস্, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, চীন, ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা, জাম্বিয়া, মাদাগাস্কার, মুজাম্বিক, সিয়েরা লিয়ন, ঘানা, বেনিন, বারবাডোস, ব্রাজিল, কিউবা, গায়ানা, পেরু ও আমেরিকা।
এস আর আই মূলত অল্প উপকরণ ব্যয়ে ধান উত্পাদন কৌশল। খরাপ্রবণ অঞ্চলের জন্য এটি দারুণ উপযোগী। বিজ্ঞানীদের নিবিড় গবেষণায় উঠে এসেছে, এস আর আই পদ্ধতিতে শেকড় হয় বেশি ও স্বাস্থ্যবান। এতে ধানের কুশিও হয় স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ এবং ধানের শীষ হেলে পড়ে না। ধানের দানাও হয় পুষ্ট। এছাড়া রোগ-বালাইয়ের আক্রমণও কম হয়। এই পদ্ধতি ব্যবহারে পানি, সার ও কীটনাশকের ব্যয় অনেক কমানো সম্ভব।
চারা তৈরি থেকে ধান উত্পাদনের প্রতিটি ধাপে সমন্বিত এ পদ্ধতির বিভিন্ন দিক অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। যেমন, বীজতলার মাটি জৈব সার মিশিয়ে প্রস্তুত করতে হবে এবং পলিথিন ও কলাপাতা দিয়ে ঢেকে বীজতলা তৈরি করতে হবে। স্বাভাবিকভাবে যেখানে ১ হেক্টর জমিতে আবাদের জন্য বীজতলা তৈরিতে প্রয়োজন হয় ৫০ থেকে ৬০ কেজি। সেখানে এ পদ্ধতিতে বীজ প্রয়োজন হয় মাত্র ৫ কেজি।
ষাটের দশকে সবুজ বিপ্লবের কল্যাণে আসে উচ্চফলনশীল ধান আবাদের বার্তা। বলা বাহুল্য, ধানের উত্পাদন বিশ্বব্যাপীই সাফল্যজনকহারে বেড়েছে। আর এই বৃদ্ধির পেছনে অন্যতম একটি নিয়ামক উপকরণের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার। সেচ, সার, কীটনাশকের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে এখন মাটি ও পরিবেশ অনেকটাই বিষিয়ে উঠেছে। পাশাপাশি একই জমিতে শুধু সার প্রয়োগ করে এক রকমের জোরপূর্বক ফসল উত্পাদনের কারণে জমিও হারিয়েছে তার উর্বরাশক্তি। বিষয়গুলো উপলব্ধি করেই ভিয়েতনামের বিজ্ঞানীদের হাত দিয়ে ‘থ্রি আর’ বা তিনভাবে উপকরণ কমিয়ে ধানের ফলন বৃদ্ধির প্রযুক্তি আসে। সেটি হচ্ছে বীজ বোনার ক্ষেত্রে ড্রাম সিডারের ব্যবহার, সার প্রয়োগের জন্য লিফ কালার চার্টের ব্যবহার এবং বালাই দমনের জন্য আই পি এম এর ব্যবহার। এই তিনভাবে বীজ, সার ও কীটনাশকে ব্যয় সাশ্রয়ের মধ্য দিয়ে কৃষক ধানের বেশি ফলন নিশ্চিত করেন সেখানে। এস আর আই পদ্ধতিটিও এমনই একটি সমন্বিত পদ্ধতি, যা অনুসরণের মধ্য দিয়ে পাল্টে যেতে পারে ধান আবাদের হিসাব নিকাশ।
উল্লেখ করা যেতে পারে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর এ পদ্ধতি সম্প্রসারণে পিছিয়ে পড়লেও বেসরকারি দুয়েকটি সংগঠন তাদের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে এটি ছড়িয়ে দেয়ার কাজ করে চলেছে। বৃহত্ পরিসরে সরকারের পক্ষ থেকে এ নিয়ে ব্যাপক কার্যক্রম হাতে নেয়া জরুরি। লেখক:সাংবাদিক
