ভাটির দেশ, পানি ও প্রাণের দেশ বাংলাদেশ। এদেশে রয়েছে প্রচুর জলাশয়, হাওর-বাঁওড়, বিল-ঝিল, নদী-নালা, ডোবা। এক সময় এগুলো পরিচিত ছিল মত্স্য ভাণ্ডার হিসেবে। মাছের পর্যাপ্ততার জন্য বাঙালিকে বলা হত মাছে ভাতে বাঙালি।
বর্ষায় উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছের অবাধ বিচরণ ও প্রজনন শুরু হয়। বংশ বৃদ্ধি হয়ে বিভিন্ন প্রজাতির মাছে ভরে ওঠে প্ল্লাবিত জলাভূমি। শুকনো মৌসুমে সামান্য পানির তলানীতে জড়ো হয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। বড় বড় এসব বিল-ঝিলে সাধারণত মত্স্যজীবীদের কাছে ইজারা দেয়া হয়। তারা এ জলাশয়গুলো সন্তানের মত লালন-পালন করে মাছকে বড় করে তোলে। আগে প্রতি তিন বছরে একবার মাছ ধরা হত। এ পদ্ধতিকে বলা হত ‘পাইল’ পদ্ধতি। দেশে মাছ ধরা ও বিক্রিকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু সমপ্রদায়ের সৃষ্টি হয়েছিল। কৈবর্ত, মাইমল, নিকারী, দাস বা গাবর নামে তাদের ডাকা হয়। ’পাইল’ দেয়ার মূল উদ্দেশ্যই ছিল অভয়াশ্রম সৃষ্টি করে মাছের প্রজনন বৃদ্ধি ঘটানো, বড় হওয়ার সুযোগ করে দেয়া। ওপর মহল ও ইজারাদারদের যোগ সাজসে ‘পাইল’ -এর নাম এখনো কোনো কোনো জায়গাতে শোনা যায়। তবে সঠিক তদারকির অভাবে প্রতিবছর মাছ হরিলুটের মত ভাগাভাগি হয়ে যায়। এভাবে ক্ষণিকের জন্য ইজারাদারদের ভূঁড়ি মোটা হলেও নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে মত্স্য সমপদের উত্স ও গরিব থেকে গরিব হচ্ছে জেলেরা।
বর্তমানে হাওরের মাছের কার্যক্রমের সাথে জড়িত রয়েছে অমত্স্যজীবীরা। তারা কাদা খুুঁড়ে মাছ ধরে মাছের উত্স ধ্বংস করে ফেলছে। প্রকৃত মত্স্যজীবীরা ইজারা বা ডাকের কাছেও যেতে পারছে না। তাদের সে সামর্থ নেই। “জাল যার জলা তার” -এ নীতি শুধু শ্ল্লোগানের ফানুস মাত্র। আগে ছোট ছোট বিলগুলো ইজারা দেয়া হত না। এসব বিলে অবাধে লোকজন বিনা বাধায় মাছ আহরণ করতে পারত। বর্তমানে জেলেরা বিলের ধারেই ভিড়তে পারে না। আগে কখনো ইজারাকৃত বিল থেকে মাছ উজাড় করে ধরা হত না, শুকিয়ে তো নয়ই। বর্তমানে ফাল্গুন-চৈত্র মাসে প্রায় সব বিল-ঝিল শুকিয়ে মাছ ধরার মহাত্সব চলে। অতীতে কিছু মাছ রেখে দেয়া হত প্রজননের জন্য। বর্তমানে কিছুই থাকে না। এখন ছোট বড় বিল ইজারা দেয়া হচ্ছে ইচ্ছেমত। যার মূল উদ্দেশ্য রাজস্ব আদায়। ইজারার নামে চলে টাকা ছড়ানোর খেলা। এতে সরকারের কোষাগারে খুবই সামান্য রাজস্ব জমা হয়। অন্যদিকে এক টাকাও ব্যয় করা হয় না এ জলমহাল উন্নয়নে।
শুকনো মৌসুমে পানির অভাবে মাছের ভাণ্ডার হিসাবে খ্যাত হাওরে, উজান এলাকায় ক্রমান্বয়ে ধ্বংস হচ্ছে মাছের আবাস, প্রজনন ও বিচরণ ক্ষেত্রগুলো। এছাড়া প্রজনন মৌসুমে মাছের পোনা ধরা হচ্ছে। বাঁধ দিয়ে বা ফাঁদ পেতে পানি ও মাছের স্বাভাবিক চলাচলে বাঁধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। বিল-ঝিলগুলো পলি জমে ভরাট হয়েও পানি ও মাছ ধারণ ও পরিবহন ক্ষমতা কমে গেছে।
মাছের উত্পাদন বৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে জল সেচে কাদা খুঁড়ে মাছ ধরা কঠোর হাতে দমন করতে হবে। হাওর মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা, অভয়াশ্রম সৃষ্টি, জলজ পরিবেশ অক্ষুন্ন রাখা ও জলজ বৃক্ষ রোপণ, জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। মাছ ও পানি প্রবাহের অবাধ ও নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। ভরা বর্ষায় মাছের পোনা উন্মুক্ত জলাশয়ের বিভিন্ন পয়েন্ট হতে ছাড়া যেতে পারে। বিল-ঝিল ডোবাগুলো খননের ব্যবস্থা নিতে হবে। মাছের উপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোকে প্রজনন সময়ে মাছ ধরা হতে নিবৃত রেখে বিকল্প কাজ বা রেশন প্রথা চালু করা যেতে পারে। মাছ আহরণ অব্যাহত রাখতে মাছ চাষে মোটিভেশন ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। যার কাজ, তারই সাজে ভিত্তিতে প্রকৃত জেলেদের হাতে জলমহাল ছেড়ে দিতে হবে। ভাসমান হাওরের পানিতে মাছ চাষের সহজ প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সমপ্রসারণ করতে হবে, দিতে হবে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা। মাছের খাদ্যে ভেজাল রোধ এবং ইন ব্রিডিং বন্ধ করতে হবে। তৈরি করতে হবে সঠিক বাজার ও মূল্যপ্রাপ্তি নিশ্চিতকরণ ব্যবস্থাপনা। সর্বোপরি হাওর উন্নয়ন বোর্ডকে সক্রিয় করতে হবে।
পানি হচ্ছে হাওরের প্রাণ। পানি, পাখি, মাছ, জল ও জলবায়ু একে অপরের পরিপূরক, হাওরের পরিবেশ এদের সাথে গভীরভাবে জড়িত। একের অভাব অন্যের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে বাধ্য। প্রাকৃতিক সম্পদ উেসরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। জলমহালের জল সেচে কাদা খুঁড়ে মাছ ধরা হবে আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য জাদুঘরে দেশি প্রজাতির মাছ দেখার মত।
লেখক:প্রকৌশলী, সার্ক এগ্রিকালচার সেন্টার, ফার্মগেট, ঢাকা
