রাজধানীর উত্তরায় একই বাসার দুই শিশু গৃহকর্মী রহস্যজনকভাবে নিহত হয়েছে। গৃহকর্তা ও গৃহকর্ত্রী বিষয়টি আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় পুলিশ গৃহকর্তাকে আটক করলেও থানা থেকে জোর করে মুচলেকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ঘটনার পর নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যা মামলা করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও গৃহকর্ত্রীর চাপে অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, ময়নাতদন্তের রিপোর্টের পর বিষয়টি হত্যা না আত্মহত্যা তা নিশ্চিত হওয়া যাবে। হত্যার ঘটনা ঘটলে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হবে। গত মঙ্গলবার রাত চারটার সময় উত্তরার জসীম উদ্দিন রোডের ৩ নম্বর সেক্টরের ১ নম্বর রোডের ৪০ নম্বর বাড়ির ছয় তলার গার্মেন্টস ব্যবসায়ী মাজেদুল ইসলামের ফ্ল্যাটের দুই শিশু গৃহকর্মী নিহত হয়। নিহতরা হলো রুবি (১৪) ও হালিমা (১৭)। ওই বাড়ির পাশে একটি একতলা বাড়ির ছাদ থেকে তাদেরকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিত্সকরা মৃত ঘোষণা করেন।
নিহতদের পারিবারিক সূত্র জানায়, রুবির গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ থানার মান্দারি গ্রামে। তার বাবা মৃত মো. হানিফ ও মা লাকী বেগম। আর হালিমার পরিবারের সদস্যরা গাজীপুরের কোনাবাড়িতে ভাড়া থাকেন। তারা গার্মেন্টস ব্যবসায়ী মাজেদুল ইসলামের ছয় তলার ফ্ল্যাটে কাজ করত। রুবি আড়াই বছর এবং হালিমা এক সময় কাজ ছেড়ে দিলেও পরে আবারো এই বাসায় কাজে যোগ দেয়।
মাজেদুল ইসলামের মালিকানাধীন ছয় তলা বাড়ির সিকিউরিটি গার্ড গতকাল বলেন, মঙ্গলবার রাত ৪টার দিকে বাড়ির পাশে এক তলা বাড়ির ছাদ থেকে তিনি গোঙানির শব্দ শুনতে পান। তিনি পাশের বাসার সিকিউরিটি গার্ডকে সঙ্গে নিয়ে ছাদে যান। সেখানে মাজেদুল ইসলামের ফ্ল্যাটের দুই গৃহকর্মীকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। একজনের বাম পা ও বাম হাতের কয়েক স্থানে ভেঙে গেছে। অন্যজনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। এরপর তারা দুজনকে উদ্ধার করে ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিত্সকরা জানান, একজনের আগেই মৃত্যু হয়েছে। অপরজন ভর্তি করার পর মারা যায়। পরে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠায়। বুধবার বিকালে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ দুইটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এদিকে ঘটনার পর পুলিশ গৃহকর্তা মাজেদুল ইসলামকে আটক করে। উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি তপন চন্দ্র সাহা বলেন, মাজেদুলের বাড়ির সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে—দুই গৃহকর্মী রাত ৩টা ৩২ মিনিটে গৃহকর্তার বাসা থেকে বের হয়ে সিঁড়ি ভেঙে ছাদের দিকে যাচ্ছে। ছাদে গিয়ে তারা লাফ দিয়েছে না কি পাইপ বেয়ে পালাতে গিয়ে পড়ে গেছে না কি কেউ তাদের ধাক্কা দিয়ে ফেলে হত্যা করেছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তদন্ত চলছে। তাদের কাছ থেকে একটি ব্যাগ উদ্ধার করা হয়েছে। তাতে আট হাজার নগদ টাকা ও একটি স্বর্ণের চেইন পাওয়া গেছে। তিন ভরি ওজনের স্বর্ণের চেইনটি মাজেদুলের বড় মেয়ের বলে জানান তিনি। তবে দুই শিশু গৃহকর্মীর ব্যাগে টাকা ও স্বর্ণের চেইন উদ্ধার করার বিষয়টি সাজানো হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন এলাকাবাসী।
গতকাল মাজেদুলের ফ্ল্যাটে গণমাধ্যম কর্মীরা এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়। মাজেদুলের স্ত্রী সাংবাদিকদের কাছে নিজের নাম পরিচয় গোপন রেখে বলেন, ‘ঘটনার আগে তারা রাতের খাবার খাওয়ার পর তাদেরকে ঘুমাতে যেতে বলা হয়। এর কয়েক ঘণ্টা পর ভোর রাতে তাদেরকে পাশের এক তলা বাড়ির ছাদ থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।’ তাদের ওপর কোনো নির্যাতন চালানো হয়নি বলে তিনি জানান।
এ ঘটনায় থানা পুলিশের পাশাপাশি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ছায়া তদন্ত করছে। পিবিআই’র পুলিশ সুপার বশির আহমেদ বলেন, থানা পুলিশের পাশাপাশি তাদের একটি টিম ঐ ঘটনায় তদন্তে নেমেছে। তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
