জলবায়ু তহবিলের অর্থ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্জি অনুযায়ী ব্যয় হচ্ছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা চিহ্নিত করা থাকলেও প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে তা গুরুত্ব পাচ্ছে না। নজরদারির যথাযথ কোন ব্যবস্থাও নেই। এসব বিষয় নিয়ে চিন্তিত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে উন্নয়ন সহযোগীদের বড় ধরনের অর্থ পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।
বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ক্লাইমেট সেলসূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালে কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ট্রাস্ট ফান্ডে (সিসিটিএফ) বাজেট থেকে পাওয়া গেছে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। নিয়ম অনুযায়ী আকস্মিক দুর্যোগ মোকাবেলার জন্যে এই অর্থ থেকে ১১৫৫ কোটি টাকা স্থায়ী আমানত হিসাবে ব্যাংকে জমা রাখা রয়েছে। বাকি ১৩৪৫ কোটি টাকা দিয়ে মূলত সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ১২০টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ শেষ হয়েছে। সরকারি এসব প্রকল্পের গুণগত মান বা এসব প্রকল্প দিয়ে আসলে মানুষের কি উপকার হচ্ছে তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আহসান উদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন কৌশলপত্র ও কর্ম পরিকল্পনা আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত প্রশংসিত একটি দলিল। সেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় অতি জরুরি, জরুরি এভাবে অগ্রাধিকার চিহ্নিত করা আছে। কিন্তু বাস্তব কাজে নেমে এই অগ্রাধিকারের জায়গা উপক্ষো বা অগ্রাহ্য করা হচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান যা করতে চাইছে সেভাবেই সবকিছু হচ্ছে। এর সঙ্গে কৌশলপত্র বা জনমানুষের চাওয়া-পাওয়ার কার্যত কোন সম্পৃক্ততা নেই। বরং আঞ্চলিক বৈষম্য প্রকট হয়ে উঠেছে।
অনুমোদন পাওয়া ১০৭টি প্রকল্পের তথ্যাদি খতিয়ে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম অঞ্চলের দিকে গেছে ২১ শতাংশ প্রকল্প। আর সবচেয়ে বিপজ্জনক হিসাবে চিহ্নিত খুলনা অঞ্চল পেয়েছে ১১ শতাংশ প্রকল্প। খরা পীড়িত হিসাবে চিহ্নিত বরেন্দ্র অঞ্চল পেয়েছে ২ দশমিক ২ শতাংশ প্রকল্প। এর মধ্যে রাজশাহী পেয়েছে দশমিক ২ শতাংশ এবং রংপুর পেয়েছে ২ শতাংশ। ড. আহসান উল্লেখ করেন, অতি সমপ্রতি বিভিন্ন সেমিনারে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার পর প্রকল্প বরাদ্দের ক্ষেত্রে কিছুটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। তবে প্রথম দুই দফা যে প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়েছে তার ৫০ শতাংশের বেশি চলে গেছে চট্টগ্রাম অঞ্চলের দিকে।
ড. আহসান আরও বলেছেন, সরকার যে ব্যয়টা করছে দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরা সেদিকে নজর রাখছেন এবং তারা যে খুব ভাল ধারণা করে বসে আছেন এমন নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় ‘বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীলতা তহবিল’ (বিসিসিআরএফ) নামের অন্য একটি তহবিলে দাতারা অর্থ দিচ্ছে। ২০০৮ সালে যুক্তরাজ্য সরকার এই তহিবলে প্রায় ১০ কোটি ডলার অনুদান দিয়েছিল। তারপর থেকে চার বছরে অস্ট্রেলিয়া, ডেনমার্ক, ইসি, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড ও ইউএসএইড থেকে অনুদান এসেছে মাত্র ৯ কোটি ডলারের মতো। আমরা যেমনটি আশা করেছিলাম বাস্তবে সেভাবে দাতাদের সাড়া পাওয়া যায়নি। বরং বলা যেতে পারে, সামগ্রিক পরিস্থিতি দেখে দাতাদের মধ্যে একধরনের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। স্বচ্ছতার সঙ্গে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই আস্থাহীনতা দূর করতে না পারলে ভবিষ্যতে তহবিল পাওয়া কঠিন হবে বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন। উল্লেখ করা যেতে পারে, এই তহবিলটি দেখাশোনা করে বিশ্বব্যাংক। বাংলাদেশ সরকারের নিয়োগকৃত একটি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ প্রকল্প অনুমোদন করে পাঠালে বিশ্বব্যাংক সেই প্রকল্পের অনুকূলে অর্থছাড় করে থাকে।
উন্নয়ন সহযোগীদের সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ তার নিজস্ব তহবিল কতটা স্বচ্ছ ও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে তা পর্যবেক্ষণ করছে জাতিসংঘসহ উন্নত দেশগুলো। বাংলাদেশ সফল ও কার্যকরভাবে এ তহবিল ব্যবস্থাপনা করতে পারলে ধনী দেশগুলো বাংলাদেশকে অর্থ দেয়া শুরু করবে।
এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহকালে অভিযোগ করা হয়েছে, যেসব প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশন থেকে বাদ দেয়া হচ্ছে সেগুলো আবার খিড়কি দিয়ে জলবায়ু তহবিলে হাজির হচ্ছে। এ নিয়ে কয়েকদিন আগে অনুষ্ঠিত একটি সেমিনারে আলোচনা হয়। সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ট্রাস্ট ফান্ডের সদস্য ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ। তিনি বলেন, ভাল প্রকল্প পাওয়া যায় না। জলবায়ু সম্পর্কিত ভাল প্রকল্প নিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রকল্পের বরাদ্দের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার কোন অভাব নেই। তবে বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণে কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে যথাযথ লোক নিয়োগের মাধ্যমে এই কাজটি করতে হবে।
এনজিওদের দেয়া তহবিল ঃ জলবায়ুর অভিঘাত কমানোর জন্যে সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ট্রাস্ট ফান্ড থেকে এনজিওদেরও কিছু তহবিল দেয়া হচ্ছে। তাদের দেয়া হবে প্রায় ২৫ কোটি টাকা। এটা মূল তহবিলের ১ শতাংশেরও কম। এই তহবিল দেয়ার জন্যে ১১৩টি এনজিও বাছাই করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৩টি এনজিওর অর্থছাড় শুরু হয়েছে। এই বাছাই প্রক্রিয়ায় সময় অভিজ্ঞতা নেই বা আওয়ামী লীগ নেতাদের আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্কিত এনজিওদের কাজ দেয়া হচ্ছে এমন অভিযোগ উঠার পর এনজিওদের তহবিল দেয়ার বিষয়টি পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের হাতে দিয়ে দেয়া হয়েছে।
বন ও পরিবেশ মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ ইত্তেফাককে বলেছেন, সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ট্রাস্ট ফান্ড (সিসিটিএফ) অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালনা করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকও বিবৃতি দিয়ে আমাদের কাজের প্রশংসা করেছে। এটি পরিচালনার ক্ষেত্রে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় অনেকটা একনেকের মতো কাজ করছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় আমাদের কাছে প্রকল্প পাঠায়। বিভিন্ন ধাপে যাচাই-বাছাই শেষে ট্রাস্টের বোর্ড এসব প্রকল্প অনুমোদন দিয়ে থাকে। ট্রাস্টের এই বোর্ড অত্যন্ত শক্তিশালী। সরকারের সিনিয়র কয়েকজন মন্ত্রী, সচিব এবং বেসরকারি খাতের ব্যক্তিদের সমন্বয়ে এটি গঠিত।
প্রকল্প নজরদারির জন্যে কি ব্যবস্থা রয়েছে এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যেসব মন্ত্রণালয় প্রকল্প পায় তারা তদারকি করে। আবার আমরা নিজেরাও তদারকি করি। সেই অর্থে বলা যেতে পারে, জলবায়ু তহবিলের প্রকল্প দুইভাবে তদারকি করা হয়। প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক বৈষম্যের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, কোন প্রকল্প অনুমোদনের সময় আমরা খেয়াল রাখি সেখানে অন্য কোন সরকারি প্রকল্প চলছে কিনা। যদি একটি জায়গায় অন্য সরকারি প্রকল্প চলমান থাকে সেক্ষেত্রে পুনরাবৃত্তি এড়ানোর জন্যে সাধারণত আমরা কোন প্রকল্প দেই না। খুলনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে সরকারের অন্য প্রকল্প চলমান থাকায় প্রথমদিকে সেখানে বেশি প্রকল্প দেয়া হয়নি।
তিনি বলেন, সামগ্রিকভাবে আমরা উপকূলীয় এলাকাকে গুরুত্ব দিচ্ছি। দাতাদের অর্থায়ন সম্পর্কে তিনি বলেন, এটা বাড়ছে। সামনে আরও বাড়বে। আমি শুধু এটুকু বলব, সামগ্রিক অর্থছাড়ের হিসাবে আমরা কম পাইনি। এনজিওদের প্রকল্প দেয়ার প্রসঙ্গ উঠলে মন্ত্রী বলেন, প্রকল্প পাওয়া ১০ এনজিওর সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাদের আত্মীয়দের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলা হয়েছে। যদি আত্মীয়তার প্রশ্নই উঠে তাহলে ১০টি কেন তহবিল পাওয়া ৬৩ এনজিওর অন্তত অর্ধেক আওয়ামী লীগ নেতাদের আত্মীয়দের হওয়ার কথা। বাস্তবে আমি নিজে একসময় একটি এনজিওতে কাজ করতাম। তারাও কোন প্রকল্প পায়নি। এনজিওদের অর্থ বাছাই ও অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে কিছু কথা উঠায় আমরা এ দায়িত্ব পিকেএসএফ এর উপর ছেড়ে দিয়েছি।
টিআইবির ফলো দ্য মানি প্রকল্প ঃ জলবায়ু তহবিল ব্যবহারের স্বচ্ছতা খতিয়ে দেখতে ‘ফলো দ্য মানি’ শীর্ষক একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে টিআইবি। এ প্রকল্পের অধীনে এ তহবিলের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রতি নজর রাখা হবে।
