স্বদেশি আর বিদেশি মিলে ওরা পাঁচজন। আর তাদের সহযোগী হয়ে কাজ করছে আরও কমপক্ষে ১৫ জন। আর ওদের খপ্পরে যারা পড়েছেন তাদের মধ্যে রাজধানীর একাধিক ফাইভস্টার হোটেল কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি আর রয়েছে অনেক সাধারণ মানুষ। এ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে প্রায় দুই বছর ধরে। তাদের চাল চলন আর আর কথাবার্তায় কোন ভাবেই আঁচ করার উপায় নেই তারা প্রতারক। কথাগুলো মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এডিসি ( পশ্চিম) মশিউর রহমানের। ডিবি পুলিশ শুক্রবার রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানের নিকেতন আবাসিক এলাকা থেকে তাদেরকে গ্রেফতার করে। উদ্ধার করা হয় ৫০ লাখ টাকা মূল্যের সমপরিমাণ জাল মার্কিন ডলার, ইউরো এবং জাল নোট তৈরির সরঞ্জামাদি। গ্রেফতারকৃতরা হলেন দক্ষিণ আফ্রিকার জিংগে ফিলিক্স সিফু, ক্যামেরুনের নাগরিক সামজেলা ক্রিস। আর বাংলাদেশের নাগরিক স্টিফেন লুক, গোলাম কিবরিয়া ও ইউসুফ আলী।
ডিবি পুলিশ গতকাল তাদেরকে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে আদালতে পাঠান। আদালত শুনানি শেষ তাদের ঢাকা কেন্দ ীয় কারাগারে পাঠিয়েছে।
এডিসি মশিউর রহমান জানান, স্বদেশি আর বিদেশি মিলে এই সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা শহরের গুলশান, বনানী, উত্তরা এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে জাল বিদেশি নোটের ব্যবসা ও প্রতারণামূলক কার্যকলাপ চালিয়ে আসছিল। তারা হোটেল র্যাডিশন, হোটেল রিজেন্সি, হোটেল ওয়াশিংটনসহ নগরীর নামিদামি হোটেলে অবস্থান করে গার্মেন্টস ব্যবসা ও বিদেশে পাঠানোর নামে প্রতারণার উদ্দেশে বিভিন্ন বাংলাদেশি নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতো। তাদের সর্বশেষ শিকার লন্ডন ফেরত এক সিলেটের অধিবাসী। তার কাছ থেকে বিদেশে পাঠানোর নাম করে ৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। এডিসি জানান, গ্রেফতারকৃত জিংগে ফিলিক্স সিফু এবং সামজেলা ক্রিস প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করে, তারা বাংলাদেশে এসে গুলশানের নিকেতন আবাসিক এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে জাল ডলার ও ইউরো তৈরি করে আসছিল। আর তাদের সহযোগী হিসেবে এসব জাল বিদেশি মুদ্রা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্রয় বিক্রয় করে আসছিলো বাংলাদেশি নাগরিক স্টিফেন লুক, কিবরিয়া ও ইউসুফ।
তিনি আরও জানান, গার্মেন্টস ব্যবসার ছদ্মাবরণে অপরাধ সংঘটনের উদ্দেশ্যে এদেশে এসে বিদেশি নাগরিক জিংগে ফিলিক্স সিফু ও সামজেলা ক্রিস পরিকল্পিতভাবে নিজেদের পাসপোর্ট ও ভিসা হারিয়ে ফেলে। পরে নতুন করে পাসপোর্ট ও ভিসা পাওয়ার জন্য স্ব-স্ব দেশের হাইকমিশন বরাবরে আবেদন জানিয়ে বাংলাদেশে অবস্থান করতে থাকে তারা। নতুন কাগজপত্র বাংলাদেশে এসে পৌঁছার মধ্যবর্তী কয়েক মাস সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন অপরাধীর যোগসাজশে মাদক ব্যবসা, ডলার ও ইউরোসহ বিভিন্ন বিদেশি মুদ্রা জালসহ প্রতারণামূলক কাজে লিপ্ত হয় তারা। পরে অপরাধ সংঘটন করে তারা নতুন পাসপোর্ট নিয়ে আবারও নিজের দেশে চলে যায়। স্টিফেন লুক (বাংলাদেশি খ্রিস্টান) ভালো ইংরেজি বলতে পারে। তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে ?আরও অনেক বিদেশির সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক স্থাপন করেন। যে সব বাংলাদেশি বিদেশ থেকে ফেরত আসেন বিশেষ করে তাদেরকেই টার্গেট করেন তিনি। অল্প খরচে পুনরায় বিদেশে পাঠানোর কথা বলে তাদের জিংগে ফিলিক্স সিফু ও সামজেলা ক্রিসসহ আরও কিছু বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন স্টিফেন লুক। পরে টাকা পয়সা লেনদেন করে বিদেশি নাগরিকরা বাংলাদেশ ছেড়ে হয় পগারপর আর স্টিফেন লুকসহ তাদের দেশীয় সহযোগীরা দেয় গা-ঢাকা।
যেভাবে ধরা পড়ে : প্রতারিত সিলেটের অধিবাসীর দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই এডিসি মশিউর রহমানের নেতৃত্বে এডিসি মিশুক চাকমা ও এসি মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে ডিবি পুলিশ গুলশান থানার নিকেতন আবাসিক এলাকার রোড-৪, বাসা-৭৯, ফ্ল্যাট-৮/এ বাসায় অভিযান চালায়। উদ্ধার করা জাল ৪৫ হাজার ৮ শত ইউএস ডলার, ১২ হাজার ৫শ’ জাল ইউরো, ১টি প্রিন্টার, ২টি ল্যাপটপ, ১ বান্ডিল টাকা ছাপানোর কাগজ, ১০ বান্ডিল ইউএস ডলারের ছাপযুক্ত কালো কাগজ এবং পাউডার ও রাসায়নিক দ্রব্যসহ অন্যান্য সরঞ্জামাদি।
