নারীর ভাবনা, নারীর প্রত্যাশা

চাকরি আগে, নাকি বিয়ে

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৯:০০
আজ শিক্ষিত সমাজের একটি বৃহত্ অংশ নারী। শুধু তাই নয়, দীর্ঘদিনের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে, ফলাফলের দিক থেকে নারীরাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে এগিয়ে। বিশাল এই শিক্ষিত নারী সমাজ তাদের শিক্ষা জীবনের শেষদিকে এসে একটি সমস্যার সম্মুখীন হন। একদিকে তারা চান ক্যারিয়ার গঠন করতে, শিক্ষা জীবনের সমাপ্তিকে পরিপূর্ণ করতে চান চাকরির সাফল্য দিয়ে। অন্যদিকে পরিবার-সমাজ-পরিপার্শ্বের চাপ তৈরি হয় বিয়ের জন্য। এই পরিস্থিতিতে নারীর মধ্যে তৈরি হয় মানসিক ও বহির্জাগতিক দ্বন্দ্ব। কী করে নিরসন করা যায় এই দ্বন্দ্ব, নারীর কী করণীয় থাকে এই পরিস্থিতিতে তা নিয়ে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন— অলভী সরকার দাদীর মুখে গল্পে শুনেছিলাম, তাদের যুগে মেয়েদের এমন বয়সে বিয়ে হতো, যখন পোশাক পরার অনিবার্যতাটুকু অনুভবের বয়সও তাদের হয়নি। আদরের কন্যাকে হয়তো বাবা সকালবেলা কোলে করে দিয়ে যেতেন। শ্বশুরবাড়িতে মেয়ের পুতুল খেলা শেষ হলে বিকেলবেলা আবার নিয়ে যেতেন সাথে করে। আজকের দিনের তরুণদের কাছে এটা গল্পের মতোই মনে হবে। সেদিনের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হার, সংস্কারবোধ ইত্যাদি কারণে নারীদের অগ্রযাত্রা থমকে ছিল। কিন্তু বদলে গিয়েছে দিন। ক্রমশ আরো বদলাচ্ছে। আজ আর পুতুল খেলতে খেলতে নারীরা শ্বশুরবাড়ি যায় না। জীবনও তাদের কাছে নেহায়েত পুতুল খেলার বিষয় নয়। কারণ তারা নিজেরাই এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন হয়ে উঠেছে। উচ্চশিক্ষায় তারা যেমন পুরুষের সমকক্ষ হয়েছে তেমনি চাকরির ক্ষেত্রেও এগিয়েছে এবং আরো আগাচ্ছে। ফলে বিয়ের আগে নারীর অর্থনৈতিক বুনিয়াদ গঠনের স্বপ্নটি যেমন অবাস্তব নয়, তেমনি বিয়ে এবং চাকরির তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দ্বন্দ্বে পড়ে যাওয়াও অস্বাভাবিক নয়। এ বিষয়ে তরুণ প্রজন্মের সাথে কথা বলে ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় রকম কথাই শুনতে পাওয়া যায়। স্নাতকোত্তর শ্রেণির ছাত্রী অলকা। আর ক’দিন পরেই প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার গণ্ডি পেরোবেন তিনি। কী ভাবছেন ক্যারিয়ার নিয়ে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, লেখাপড়ার অংশটি পেরিয়ে গেলে নিজের ও পরিবারের প্রতি এক অন্যরকম দায়িত্ব এসে পড়ে। একদিকে তিনি শিক্ষিত হয়েছেন, তাই পরিবারের প্রত্যাশা থাকে মেয়েটি চাকরি করবে। অন্যদিকে ‘বয়স বেড়ে যাচ্ছে, মেয়ের বিয়ে দিতে হবে’— এই ভাবনায় তাদের সুখনিদ্রা ব্যাহত হয়। এই পরিস্থিতিতে নারীটির মনে বেজে উঠতে পারে দ্বন্দ্বের সুর। তবে কি অনেক প্রত্যাশার ক্যারিয়ারটি গড়া হবে না? অলকা বলেন, তার অগ্রজদের জীবনে এই দ্বন্দ্ব প্রত্যক্ষ করেছেন তিনি। আর সেখান থেকেই শিখেছেন কীভাবে জয় করতে হয় এই পরিস্থিতি। নিজের জীবনের ক্ষেত্রে তিনি সচেতন। আগে থেকেই ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে রাখতে চান, কোন পরিস্থিতিতে কী সিদ্ধান্ত নেবেন। বিয়ে আগে করবেন, নাকি ক্যারিয়ারটাকে বিয়ের আগেই খুব ভালভাবে গুছিয়ে নেবেন, সে সম্পর্কে ভাবনাটা সবার একরকম নয়। যদিও একটা বিষয়ে মিল আছে— প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষিত একজন নারী সাধারণত অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হতে চান। তবে বিয়েটিকে সময়ের ধারাবাহিকতার কোন অবস্থানে রাখবেন, এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। অনেকে শিক্ষা জীবনের শেষ সময়ে বা শিক্ষাজীবন শেষ হবার প্রায় সাথে সাথে বিয়ের পর্বটি চুকিয়ে নিয়ে এরপর ক্যারিয়ারের কথা ভাবেন, যাতে পারিবারিক ও সামাজিক চাপে তাদের মানসিক দ্বন্দ্ব তৈরি না হয়। আবার এর বিপরীত চিত্রও দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে একজন নারী আশঙ্কা করেন যে, বিয়েটা তার ক্যারিয়ারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে কিনা। ফলে তিনি বিয়ের আগেই পরিপূর্ণভাবে সাবলম্বী হয়ে উঠতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। এই দুই ধরনের সিদ্ধান্তের উভয়টিই আসলে নারীর নিজের মনোবল এবং পরিস্থিতি সামাল দেবার যোগ্যতার উপর নির্ভর করে। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত এবং দৃঢ় আত্মবিশ্বাস নারীকে নিয়ে যেতে পারে বহুদূর। ক র ণী য় ++ প্রথমত, একজন নারীর নিজেরই সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত যে, তিনি কী করবেন। এতে তার মনোবল অটুট থাকবে। ++ একটি সিদ্ধান্ত নেবার পেছনে শক্ত যুক্তি দাঁড় করানো কাজের ক্ষেত্রে মঙ্গলজনক। ++ কোনো পরিস্থিতিকে বাধা করে পিছিয়ে না এসে এগিয়ে যেতে হবে দৃঢ় আত্মপ্রত্যয় নিয়ে। ++ বিয়ের আগে ক্যারিয়ার গড়তে চাইলে পরিবারের সাথে আলোচনা করে তাদেরকে নিজের লক্ষ্যটি চমত্কারভাবে উপস্থাপন করা যায়, যাতে তারাও সহযোগিতামূলক জায়গায় দাঁড়াতে পারেন। ++ বিয়ের পরে নিজেকে গড়ে তুলতে চাইলে সবার সাথে বোঝাপড়ার মাধ্যমে নিজের প্রত্যয়ী অবস্থানটিকে জিইয়ে রাখতে হবে। ++ মানুষের সবচেয়ে আপন জায়গা হলো তার পরিবার; সে বাবা-মা-ই হোক, অথবা স্বামী। সবারই উচিত একইসাথে হূদয় এবং যুক্তি দিয়ে নারীর ইচ্ছাকে, লক্ষ্যকে উপলব্ধি করা এবং সম্মানের চোখে দেখা।