কবিতার মত রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার প্রেমতলী থেকে খরচাকা পর্যন্ত পদ্মা নদীতে এখন হাঁটুপানি। ফলে দুইটি সেচ প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে। নদীতে অসংখ্য চর জেগে উঠায় নদীর গতিপথ পাল্টে গিয়ে ভারতের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার কারণে এই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে বলে নদীর পাড়ের লোকজন জানান। অথচ বর্ষা মৌসুমে পদ্মা নদীতে পানি ভরে যাওয়ায় এই এলাকায় বন্যা দেখা দেয়। পদ্মা নদীতে সারাবছর জুড়ে মাছ ধরার কাজ করে ২ শতাধিক মত্স্যজীবী। আর নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে শতাধিক নৌকার মাঝি। কিন্তু গত ২ বছর ধরে শুষ্ক মৌসুমে নদীতে হাঁটুপানি থাকায় আবার কোথাও কোথাও একেবারেই পানি না থাকার কারণে মত্স্যজীবী ও মাঝিরা লোকজন বেকার হয়ে পড়েছে।
পদ্মা নদী থেকে পানি উত্তোলন করে বোরো ধানের চাষ করা হতো। এজন্য প্রেমতলী ও খরচাকা এলাকায় দুইটি সেচ বসানো হয়। ছোট ছোট শ্যালো মেশিনের মাধ্যমে নদীর তীরের জমিগুলোতে সেচ দেয়া হত। নদীতে পানি না থাকার কারণে এই সেচ প্রকল্প দুইটি একেবারেই বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ এলাকায় প্রায় ১ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ করা সম্ভব হয়নি। খারিজাগাতী গ্রামের বাবলু (৫৫) জানান, নদীর পানি ব্যবহার করতো নদী পাড়ের প্রায় ২০ গ্রামের মানুষ। নদীতে পানি না থাকার কারণে তারা তীব্র পানি সংকটে রয়েছে। খরচাকা গ্রামের সাদিকুল ইসলাম বলেন, নদীর পানির উপর নির্ভর করে নদীর এপার-ওপারে প্রচুর ফসল চাষ হতো। এবার চরে কলাই ছাড়া অন্য কোন ফসল হয়নি। কুমরপুর এলাকায় গিয়ে সরজমিনে দেখা যায়, নদী থেকে নৌকাগুলো তুলে নদীর পাড়ে রেখেছে। হাঁটুপানির উপর দিয়ে রাস্তা তৈরি করে গরুর গাড়ি, ট্রাক ও লোকজন নদী পারাপার হচ্ছে। আবার হাঁটুপানির মধ্য দিয়েই গরুর গাড়ি নিয়ে কলাই আনার জন্য এপার থেকে ওপারে যাচ্ছে। গোসল করতে আসা লোকজন বধনা ও মগে করে পানি তুলে গোসল করছে। নদীতে পানি না থাকার কারণে পরিবেশেরও মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। সেচের কারণে নদী তীরের গ্রামগুলোতে ফলজ ও বনজ গাছ তেমন হচ্ছে না। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির জন্য বসানো নলকূপগুলোতে তেমন পানি উঠছে না বলে প্রেমতলীর তোজাম্মেল হক জানান। এদিকে, গোদাগাড়ীর সুলতানগঞ্জ থেকে বালিয়াঘাট্টা পর্যন্ত এলাকায় মহানন্দা নদীতেও অসংখ্য চর জেগে উঠার কারণে নৌকা চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গত কয়েক বছর ধরে পদ্মা ও মহানন্দা নদীতে বর্ষা মৌসুমে পানিতে ভরে যাওয়ার কারণে বন্যা ও নদীর তীর ভাঙ্গন দেখা দেয়। আর শুষ্ক মৌসুমে অসংখ্য চর জেগে উঠায় নদীর পানি ২/৩ ভাগে বিভক্ত হয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি না থাকার কারণে বিরূপ প্রভাব পড়ছে বরেন্দ্র অঞ্চলে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সেচ সংকটের কারণে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে বিশুদ্ধ পানির সংকট আকার ধারণ করেছে। ফলে বরেন্দ্র অঞ্চলের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে পদ্মা ও মহানন্দা নদীর গভীরতা বাড়ানো না গেলে আগামীতে পদ্মা ও মহানন্দা মরা নদীতে পরিণত হতে পারে এমনটাই আশঙ্কা করছে নদী বিশেষজ্ঞরা।
