বেলতলায় তুমুল উত্তেজনা

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:২৭
‘আর্টস বিল্ডিং’ (তখনো ‘কলাভবন’ শব্দটির প্রচলন শুরু হয়নি) প্রাঙ্গণে আবারও ছাত্রসমাবেশ। বেলতলা থেকে আমতলা পর্যন্ত। ঢাকায় চলছে ছাত্র ধর্মঘট। প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিন ভাষা সংক্রান্ত অসন্তোষের শুকনো বারুদে স্ফূলিঙ্গপাত ঘটিয়ে করাচি রওয়ানা হয়ে গেছেন। ছাত্রদের এতদিনকার ছাইচাপা আগুন বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। বুঝতে পারেনি নুরুল আমিন সরকার কিংবা তাদের রাজনৈতিক সংগঠন মুসলিম লীগের শীর্ষনেতৃত্ব। সাতাশে জানুয়ারি পাক প্রধানমন্ত্রীর বাংলা বিরোধী বক্তৃতার সব ছাত্র এলাকায় ৪ ফেব্রুয়ারির ছাত্র সমাবেশ ছিল সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ। গোটা ঢাকা শহরের স্কুল-কলেজ সেদিন উত্তপ্ত—বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস তো বটেই। প্রচলিত ইতিহাসে উল্লেখ নেই, কিন্তু সেদিনের ছাত্রসভায় সালামসহ আমরা জনাকয় মেডিক্যাল ছাত্র উপস্থিত ছিলাম। কারিগরি শিক্ষায়তনের সার্বক্ষণিক ব্যস্ততার মধ্যে সকালবেলাটা গুরুত্বপূর্ণ বলে অনেকে ওই সভায় উপস্থিত হতে পারেনি। অথচ ৩১ জানুয়ারি বার লাইব্রেরির সভায় এদের অনেকে উপস্থিত ছিল। বন্ধু আবদুল মতিনের ভাষ্য মতে, বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কমিটি এ সভা আহবান করে। যে কমিটির আহবায়ক স্বয়ং আবদুল মতিন। শহরের বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রী ছোট ছোট মিছিল করে সভা প্রাঙ্গণে হাজির হয়। ছাত্র এলাকায় ইতিমধ্যে ছাই উত্তাপ-উত্তেজনার একটা বড় কারণ ছিল শাসক শ্রেণীর পক্ষ থেকে রাষ্ট্রভাষা উর্দুর পক্ষে প্রচারের পাশাপাশি আরবি হরফে বাংলা লেখার সরকারি ষড়যন্ত্র। সম্ভবত তাই সেদিন ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’-এর পাশাপাশি বার বার ক্ষুব্ধ শ্লোগান ওঠছিল ‘আরবি হরফে বাংলা লেখা চলবে না’। তাছাড়া ছিল ‘ মীরজাফর নাজিমুদ্দিনের’ বিরুদ্ধে শ্লোগান—পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে ভাষার দাবি নিয়ে তার বিশ্বাসঘাতকতার কারণে। এ সভার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—শুধু ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২-তে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে দেশবাসী কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত পুনরায় ঘোষণার জন্যই নয়, এ সভায় ছাত্র-ছাত্রীদের দৃঢ় উত্তেজিত সাহসী সরকার-বিরোধী মনোভাব। আর সে কারণে কয়েক হাজার ক্ষুব্ধ ছাত্রী এই প্রথম শহর পরিক্রমায় অংশ নেন। অবশ্য তাদের ক্ষোভ-ক্রোধ উপচে পড়ছিল মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনের বাসভবনের সামনে এসে বিক্ষোভ প্রদর্শন ও সরকার-বিরোধী শ্লোগান উচ্চারণের সময়। ছোট্ট পুকুরের পাশে বেলতলায় অনুষ্ঠিত এ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ছাত্রনেতা গাজীউল হক। বক্তৃতা করেন বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক আবদুল মতিন, সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক কাজী গোলাম মাহবুব। এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য ঘটনা—ছাত্রলীগের কিছুকসংখ্যক নেতার মিছিল-বিরোধিতা। কারণ দুর্বোধ্য। অন্যদিকে এ প্রতিবাদ সভার কর্মসূচি সফল করতে যুবলীগের নেতা-কর্মীদের ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তুলনীয় ২১শে ফেব্রুয়ারি সকালে আমতলার ছাত্র-ছাত্রী সভায় সংঘটিত অনুরূপ ঘটনা যদিও সেটা ছিল ১৪৪ ধারা অমান্য করা নিয়ে। ইতিমধ্যে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি নিয়ে ছাত্র, তরুণ, এমনকি জনমনে বিক্ষোভের সঞ্চার কতটা ব্যাপক হয়ে ওঠেছিল তার প্রমাণ মেলে ঢাকা শহরে নির্ধারিত কর্মসূচি দেশের প্রধান প্রধান শহরে পালনের স্বতঃস্ফূর্ততায়। সেসব স্থানেও দেখা গেছে ক্ষুব্ধ ছাত্র-ছাত্রীদের শহর-পরিক্রমা, প্রশাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে। লক্ষ্য করার মতো বিষয় যে, কী ঢাকা, কী অন্যত্র সাধারণ ছাত্র সমাজে বিরাজমান অবিশ্বাস্য এক সরকার-বিরোধী অনমনীয় দৃঢ়তা কর্মসূচির নিয়ামক হয়ে দাঁড়ায় যা দেখা গিয়েছিল ১৯৪৮ সালের মার্চে আন্দোলন স্থগিত করার সময়ও। সেখানেও সাধারণ ছাত্ররা ছিলেন আন্দোলন স্থগিতের বিরুদ্ধে। ঢাকার বেলতলায় অনুষ্ঠিত সভা-সমাবেশ ও প্রতিবাদী মিছিলের গুরুত্ব উপলব্ধি করেই সম্ভবত সাপ্তাহিক ‘ইত্তেফাক’ ও সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’ পত্রিকায় এ সম্বন্ধে বিশদ বিবরণ প্রকাশিত হয় যাতে উচ্ছ্বাস ও আবেগ ছিল যথেষ্ট। তবে প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে ওই সভায় দশ হাজার ছাত্র-ছাত্রীর উপস্থিতি নিয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে বলে মনে হয়। আবেগ সেখানে প্রবল যুক্তি, তা জনসংখ্যার প্রশ্নে কিছুটা হলেও পিছু হটে। যেমন আমরা দেখি, ২২ ফেব্রুয়ারি মেডিক্যাল হোস্টেল প্রাঙ্গণে লক্ষাধিক মানুষের জমায়েত হবার কথা পত্রিকা বিশেষ লেখা হয়। হোস্টেল প্রাঙ্গণে ও রাস্তার পাশে লক্ষাধিক দূরে থাক— পঞ্চাশ হাজার জনসংকুলানের মতো স্থান ছিল না। তবে একথা সত্য, এসব ক্ষেত্রে সংখ্যা প্রধান বিবেচ্য বিষয় নয়, বিবেচ্য বিষয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মানসিক দৃঢ়তা ও যেকোনো মূল্যে লক্ষ্য অর্জনে ইস্পাত কঠিন মনোবল—যা জয় নিশ্চিত করতে পারে। প্রসঙ্গত আর একটি কথা বলা দরকার যে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পূর্ববঙ্গের যেকোনো দাবির প্রশ্নে ‘প্রাদেশিকতা’ ও ‘পাকিস্তান ধ্বংস করার’ অভিযোগ তোলা হতো। যেমন দেখা গেছে, আটচল্লিশের ভাষা আন্দোলনে, মূলনীতি কমিটির সুপারিশের বিরোধিতায় তেমনি বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময়েও। অথচ বিভাগ পূর্বকালে মুসলিম লীগ রাজনীতির একটি প্রধান বিষয় ছিল—প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি। এবং লীগ সভাপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘুরে-ফিরে বার বার এ দাবি উত্থাপন করেছেন কংগ্রেসের সঙ্গে সংলাপে এবং ভাইসরয়ের কাছে আবেদন। অথচ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তাদের চিন্তা-ভাবনা পাল্টি খায়। জিন্নাহ-লিয়াকত-নাজিমুদ্দিন সাহেব থেকে সব লীগ নেতাই বলতে থাকেন: প্রাদেশিকতা মহাপাপ, এবং তা রাষ্ট্রদ্রোহের তুল্য। পল্টন ময়দানে খাজা নাজিমুদ্দিন একই কথা বলেন। এরই নাম রাজনীতি! লেখক: ভাষা সংগ্রামী ও প্রাবন্ধিক