অপরিবর্তিত নকশায় তিন বছরে রেলসহ পদ্মাসেতু

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:২৬
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেছেন, নকশায় কোন পরিবর্তন না এনে রেল ও সড়ক সংযোগসহ নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। চলতি অর্থ বছরেই এর নির্মাণ কাজ শুরু হবে। এ জন্যে চলতি অর্থ বছরের বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হবে। তিনি আরও বলেন, পদ্মা সেতু হবেই। আগামী তিন বছরের মধ্যে এই সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হবে। সেতু নির্মাণ প্রকল্পে কোন দুর্নীতি বা অনিয়ম হয়নি দাবি করে অর্থমন্ত্রী বলেন, জীবন সায়াহ্নে এসে এই সেতু নির্মাণ প্রকল্পে জড়িত হতে পেরে আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি। সবাইকে আশ্বস্ত করছি এই প্রকল্পে কোন দুর্নীতি হয়নি। হবেও না। কোন ধরনের দুর্নীতি সহ্যও করা হবে না। গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালীর ৩০০ বিধিতে দেয়া এক বিবৃতিতে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য কিছু কাজ আমরা সম্পন্ন করেছি। অবশিষ্ট যে কাজগুলো রয়েছে সেগুলো হলো: সেতু নির্মাণের ঠিকাদার নিয়োগ; সেতু নির্মাণের জন্য পর্যবেক্ষণ পরামর্শক নিয়োগ; নদীশাসনের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ; সার্ভিস এরিয়া প্রস্তুতির জন্য ঠিকাদার নিয়োগ; জাজিরা অ্যাপ্রোচ রোড নির্মাণ এবং মাওয়া অ্যাপ্রোচ রোড নির্মাণ। মোট ৩০৫ কোটি মার্কিন ডলার অর্থাত্ ২৪,৩৯৪ কোটি টাকা লাগবে এবং এই ব্যয়ের জন্য আমাদের অর্থ সাশ্রয় এখন থেকে চার বছরের মধ্যে করতে হবে। আমরা পুরো প্রকল্প আমাদের নিজস্ব ব্যয়ে করতে চাই। এজন্য যে বিষয়টির দিকে আমাদের প্রথমেই নজর দিতে হবে সেটি হলো যে, নিজস্ব সম্পদ থেকে মোট ১৮০ কোটি মার্কিন ডলারের সমমানের বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ। আমরা মনে করি যে, পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন এখন ২০১২-১৩ অর্থবছরে শুরু হবে এবং পরবর্তী তিন বছরে তা সম্পূর্ণ হবে। এই অর্থবছরে পদ্মা সেতুর জন্য বাজেটে যে বরাদ্দ রয়েছে তা আমাদের কিছু বাড়াতে হবে। পরবর্তী তিন বছরের জন্য পদ্মা সেতুর যে প্রাক্কলিত বাজেট আছে সেটি ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হবে। এই বিষয়ে অর্থ বিভাগ মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোয় আগামী বছরগুলোর যে ব্যয়ের হিসাব দিয়েছে সেটা পরিবর্তন করার উদ্যোগ ইতিমধ্যেই নেয়া হয়েছে। সম্ভবত বর্তমান অধিবেশনেই আমরা এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরতে পারব। আমরা ইতিমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে পদ্মা সেতুর ডিজাইন বা প্রাক্কলিত হিসাবে আমরা কোন পরিবর্তন করছি না। অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন যে অবস্থানে আছে সেই অবস্থানটি চার/পাঁচ বছর আগে চিন্তাও করা যেত না। এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন নিজস্ব অর্থে করা মোটেও অসম্ভব নয়। যদিও এর জন্য অন্যান্য খাতে খরচ কিছু কমাতে হবে অথবা রাজস্ব সূত্রে আদায় আরো বাড়াতে হবে। পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পে ইতিমধ্যেই আমরা প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার মত কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছি। জমি অধিগ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে এই ব্যয়টি হয়েছে এবং এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত দুর্নীতির কোন অভিযোগ পাইনি। যে অভিযোগ বিশ্বব্যাংক করেছে সেটি হচ্ছে দুর্নীতির সম্ভাবনা নিয়ে। এবং এই অভিযোগটি করা হয়েছে বিভিন্ন কারণে। তার মধ্যে প্রথম কারণটি হচ্ছে বাংলাদেশে দুর্নীতির ক্ষেত্রে অত্যন্ত ন্যক্কারজনক রেকর্ড। দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে ঠিকাদারদের অভিযোগ প্রবণতা। তৃতীয় কারণ সম্ভবত বড় বড় প্রকল্পে বিখ্যাত ঠিকাদারদের দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ। অর্থমন্ত্রী বলেন, দুদকের তদন্ত কাজে বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ দলের সম্পৃক্তিও চাই। বিশ্বব্যাংককে না করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গত ৩১ জানুয়ারি আমি বিশ্বব্যাংকের সভাপতি এবং অন্য তিনটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারকে চিঠি লিখে জানিয়ে দেই যে, পদ্মা সেতুর জন্য বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন আমরা চাই না। কারণ, প্রকল্প বাস্তবায়নে তাদের যে সময়সূচি তার সঙ্গে আমাদের সময়সূচির মিল নেই। আমরা প্রকল্পটির বাস্তবায়ন এখনই শুরু করতে চাই। তাই বিকল্প অর্থায়নের ব্যবস্থা করে বাস্তবায়নের পদক্ষেপ আমরা এখনই নেবো। একইসঙ্গে অন্য উন্নয়ন সহযোগীদের আমি এ বিষয়ে অবহিত করি এবং তাদের কাছে আবেদন করি যে তারা যেন এই প্রকল্পে অর্থ সহায়তা বহাল রাখেন। তিনি আরও বলেন, পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির সূচনা হয় সম্ভবত ২০১১ সালের মার্চ মাসে। যখন আমাদের তরফ থেকে সেতু নির্মাণের জন্যে ঠিকাদারদের যে সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রণয়ন করা হয় তখন শুরু হয় চীনের সিআরসিসি প্রতিষ্ঠানের জন্য জোর তদ্বির। সেই তদ্বিরে জালিয়াতির আশ্রয় নেয় ঐ প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশ প্রতিনিধি ভেন্চুরা ইন্টারন্যাশনাল। এই বিষয়ে আমরা তদন্ত করে জালিয়াতিটি প্রমাণ করি। এই প্রতিষ্ঠানকে চীনা প্রতিষ্ঠান বরখাস্ত করে। তারপরেই বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান সাকো-এর বিরুদ্ধে সেপ্টেম্বর মাসে অভিযোগ আসে যে তারা ঠিকাদারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। এই বিষয়েও আমাদের দুর্নীতি দমন কমিশন সব ঠিকাদারের সাক্ষ্য নিয়ে এবং আরো অনেক সাক্ষ্য-সাবুদ নিয়ে অভিযোগের কোন ভিত্তি পায় নি। সেই সময়ই বলা হয় যে, কানাডীয় প্রতিষ্ঠান এসএনসি লাভালিন দুর্নীতির ষড়যন্ত্র করছে। এই অভিযোগ উঠার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা এই প্রতিষ্ঠানটিকে কালো তালিকাভুক্তির সুপারিশ করি। ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে আর একটি অভিযোগ আসে যে, এসএনসি লাভালিনের একজন কর্মকর্তা কোন কোন ব্যক্তিকে ঘুষ দেবেন তা ডাইরিভুক্ত করেছেন। কিন্তু কার সঙ্গে তার আলোচনা হয়েছে সে ব্যাপারে কোন তথ্য আমরা এখনও পাইনি। আমাদের দুর্নীতি দমন কমিশন কানাডায় গিয়ে এ বিষয়ে সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের ব্যবস্থা করছে এবং অতি সত্বরই সেই কাজটির সমাধা হবে।