জামায়াত-শিবিরের নাশকতা ঠেকাতে পুলিশের রণপ্রস্তুতি

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:২৯
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণা করা হবে আজ। আর এ কারণেই আজ সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে জামায়াত-শিবির। হরতালের শুরুতে ভোররাতেই শিবির রাজধানীতে ব্যাপক নাশকতা চালাতে পারে—এমন তথ্য পেয়েছেন পুলিশ ও গোয়েন্দারা। প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে ইতিমধ্যে রাজধানীতে ৫০ হাজারেরও বেশি ক্যাডার ও সমর্থক জড়ো করেছে তারা। তাই তাদের রুখতে রণপ্রস্তুতি নিয়েছে পুলিশ। হরতাল ও রায় উপলক্ষে গতকাল সোমবার বিকাল থেকেই এন্টি পারসোনেল ভেহিকেল, আর্মাড কার, জলকামান, পিপার স্প্রে নিয়ে মাঠে নেমেছে পুলিশ। এছাড়াও তাদের কাছে থাকছে টিয়ারসেল, রাবার বুলেট ও গ্যাস গ্রেনেড। প্রয়োজন হলে এর সবই প্রয়োগ করা হবে। রাজধানীর আটটি ক্রাইম জোনে নামানো হচ্ছে ১০টি ভ্রাম্যমাণ আদালত। এসব আদালত হরতালে নাশকতার সঙ্গে জড়িতদের তাত্ক্ষণিক গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়ে জেল বা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করবে। এদিকে জামায়াত-শিবিরের হুমকি আর পুলিশের রণ প্রস্তুতিতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন নগরবাসী। দফায় দফায় শিবিরের ককটেল বিস্ফোরণ, ভাঙচুর-আগুন আর পুলিশের প্রতিরোধে গতকাল সন্ধ্যা থেকেই আতঙ্কের নগরীতে পরিণত হয় রাজধানী। পাশাপাশি জামায়াত-শিবিরের লাগাতার হরতালের হুমকির কারণে বেশ বেকায়দায় পড়েছেন রাজধানীবাসী। হরতালের কারণে গতকাল বিকাল থেকেই রাজধানীতে গাড়ির সংখ্যা কমে যায়। অফিস-আদালত ফেরত মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েন। ফার্মগেটে শত শত মানুষ গাড়ির জন্য অপেক্ষা করেছেন। ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার বেনজির আহমেদ হরতাল সমর্থকদের হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছেন, হরতালে গাড়ি ভাংচুর ও জনজীবনের নিরাপত্তা ব্যাহত করার চেষ্টা করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের মুখপাত্র ও ডিবির দায়িত্বে থাকা যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম গতকাল সাংবাদিকদের কাছে প্রস্তুতির বিষয়ে জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানতে পেরেছি, জামায়াত-শিবিরের প্রধান টার্গেট পুলিশ। কাদের মোল্লার রায় ঘোষণা করাকে কেন্দ্র করে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা নাশকতা চালাতে পারে। পিকেটিংয়ের নামে তারা জ্বালাও-পোড়াও এবং ভাংচুরের ঘটনা ঘটাতে পারে। যানবাহন চলাচলে বাধা সৃষ্টির পাশাপাশি তারা কলকারখানা, ব্যাংক-বীমাসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিস ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অচলাবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখেই নিরাপত্তা ছক তৈরি করা হয়েছে। মার্কেট, শপিংমল ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র এলাকায় বিপুলসংখ্যক ফোর্স মোতায়েন করা হচ্ছে। এদিকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। জোরদার করা হয়েছে ট্রাইব্যুনাল সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। র্যাব-পুলিশের পাশাপাশি প্রস্তুত রাখা হয়েছে পুলিশের বিশেষায়িত বাহিনী সোয়াত। গোটা ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে সোয়াত। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিশেষ প্রশিক্ষণ নেয়া ও ভারী আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে সোয়াত সদস্যদের কাছে। কোন জিম্মি উদ্ধার বা বড় ধরনের নাশকতা রোধেও বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সোয়াত বাহিনীর সদস্যরা। সরাসরি গুলি করারও অনুমতি আছে তাদের। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীর চিটাগাং রোড, পল্টন ও বায়তুল মোকাররম মসজিদের আশপাশের এলাকা, বিজয়নগর পানির ট্যাংকি, কাকরাইল মোড়, মালিবাগ চৌধুরীপাড়া, কারওয়ান বাজার ও চকবাজার এলাকাসহ অন্তত ২০টি পয়েন্টে শিবির নাশকতা চালাতে পারে। এর বাইরেও যেসব এলাকায় শিবিরের বিশেষ তত্পরতা রয়েছে সেসব জায়গায়ও রণ প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। আর এ কারণেই গতকাল বিকালে পুলিশ কমিশনার রাজধানীর সব বিভাগের উপ-কমিশনারদের ডেকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন। পুলিশ সদর দফতর থেকেও এসপিদের কাছে বিশেষ বেতার বার্তা পাঠানো হয়েছে। গতকাল দুপুর থেকেই রাজধানীতে ডিএমপি’র ৯ হাজার ৫৩৩ জন পোশাকধারী ফোর্স এবং ১ হাজার রিজার্ভ ফোর্সসহ প্রায় ১৬ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়। এছাড়া টহলে থাকছে র্যাবের প্রায় ২ হাজার সদস্য। পালাক্রমে দায়িত্ব পালনের জন্যে এসব সদস্যের ডিউটি সিডিউল তৈরি করা হয়েছে। দাঙ্গা ফোর্সের পাশাপাশি এপিবিএন, সোয়াত টিম ও বোম ডিস্পোজাল টিম গতকাল সকাল থেকেই ‘ওয়ার্মআপ’ করেছে। দাঙ্গা পুলিশের প্রত্যেক ইউনিটে পর্যাপ্ত টিয়ার সেল মজুদ করা হয়েছে। স্পর্শকাতর স্পটে থাকবেন গোয়েন্দা ওয়াচম্যান, ডিবির ভিডিও ও স্টিল ক্যামেরাম্যানরা। যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ও নাশকতার ছবি, ভিডিও ফুটেজ এবং তথ্য সংগ্রহ করবেন তারা। হরতালের সমর্থনে গতকাল বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে কারওয়ান বাজার এলাকায় শিবির মিছিল বের করে। মিছিল থেকে আন্ডারপাসের সামনে তিনটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। এরপরই পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে কয়েক রাউন্ড রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। শিবির কর্মীরা দৌড়ে পালিয়ে গেলেও কোন ধরনের ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগ করেনি। পুলিশের সঙ্গে ধাওয়ার ঘটনায় কেউ আহতও হয়নি। যাত্রাবাড়ীতে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ইলিশ পরিবহনের কাউন্টারের সামনে গাড়ি ভাঙচুর করার সময় স্থানীয় জনতা ৩ জনকে আটক করে পুলিশে দিয়েছে। তাত্ক্ষণিকভাবে আটক ৩ জনের নাম-পরিচয় জানা যায়নি। এ সময় হরতালের সমর্থনে পিকেটাররা ৪টি গাড়ি ভাঙচুর করেছে বলে জানা গেছে। ডেমরা জোনের পুলিশের সহকারী কমিশনার মিনহাজুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। এছাড়া পল্টন মোড়ে সন্ধ্যা ৭টার দিকে কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এদিকে বাড্ডায় গতকাল সন্ধ্যায় জামায়াত-শিবির কর্মীরা মিছিল বের করার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। প্রতিবাদে শিবির কর্মীরা অন্তত ১০টি গাড়ি ভাংচুর করে। সেখানে কয়েকটি ককটেলেরও বিস্ফোরণ ঘটায় শিবির কর্মীরা। একই সময় পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার এলাকায় জামায়াত-শিবির কর্মীরা ৬-৭টি গাড়ি ভাঙচুর করেছে। সন্ধ্যা পৌনে সাতটায় রাজধানীর উপকণ্ঠ টঙ্গী বাজারে দুটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন ধরিয়ে দেয় শিবির কর্মীরা। পরে টঙ্গী ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিভিয়ে ফেলে। আমাদের বিশেষ প্রতিনিধি জানান, জামায়াত আজ মঙ্গলবার দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ঘোষণা করেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আজ সংগঠনের নেতা আবদুল কাদের মোল্লার রায় ঘোষণার দিন এ হরতাল আহ্বান করেছে সংগঠনটি। ঘোষিত রায়ে যদি কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দেয়া হয় তবে পরদিন বুধবার থেকে লাগাতার হরতাল চলবে। জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল মওলানা রফিকুল ইসলাম খান গতকাল এক বিবৃতিতে এই ঘোষণা দিয়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, বিচারের নামে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে গঠিত ট্রাইব্যুনাল সরকার নির্দেশিত ছকে আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে রায় প্রদান করে সরকার ঘোষিত শাস্তির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে আজ মঙ্গলবার দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করা হলো। সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে জামায়াত নেতৃবৃন্দকে শাস্তি প্রদানের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে। বিশ্ব জনমতকে উপেক্ষা করে সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বাস্তবায়নের জন্য এই বিচারকার্য পরিচালনা করছে। সরকারের মন্ত্রী-এমপি ও সরকার দলীয় নেতৃবৃন্দ বার বার ঘোষণা দিচ্ছেন জামায়াত নেতাদের ফাঁসি দেয়া হবে এবং সরকারের চলতি মেয়াদেই তা কার্যকর করা হবে। বিবৃতিতে বলা হয়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মিসরে গিয়ে বলেছেন, এই সপ্তাহে যুদ্ধাপরাধের দ্বিতীয় রায় ও ১৪ ফেব্রুয়ারি তৃতীয় রায় ঘোষণা করা হবে। ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক ঘোষিত আব্দুল কাদের মোল্লার রায় আগামীকাল নির্ধারিত হওয়ায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণার সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে এবং সরকারের ইচ্ছা অনুযায়ী এ রায় প্রদান করা হচ্ছে বলে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। এর আগে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, জামায়াত নেতাদের ফাঁসি দেয়া হবে। বিবৃতিতে আরো বলা হয়, বেশ কিছুদিন পূর্বে আওয়ামী লীগের জনৈক নেতা সমাবেশে বলেছেন, জামায়াত নেতাদের ফাঁসি দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে কার্যকর করা হবে। সবশেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিচারের সুনির্দিষ্ট দিন ও তারিখ নির্ধারণ করেছেন। রায়ের জন্য সময় নির্ধারণের দায়িত্ব আদালতের। কিন্তু সরকার যখন ফাঁসির কথা বলেন ও রায়ের দিন তারিখ সম্পর্কে সুস্পষ্ট বক্তব্য দেন তখন জনগণের বুঝতে আর কষ্ট হয় না যে, সরকারের নীলনকশা অনুযায়ী বিচারকার্য সম্পন্ন হচ্ছে এবং এই বিচারে সরকারের প্রতিহিংসারই প্রতিফলন ঘটবে। দেশের মানুষ প্রহসনের বিচারের নামে কোন রাজনৈতিক হত্যা নীরব দর্শকের মত অবলোকন করতে পারে না। অন্যায়ভাবে এক ব্যক্তিকে হত্যা করা গোটা জাতিকে হত্যা করার নামান্তর। তিনি বলেন, সরকারি পরিকল্পনায় বিচারের নামে এই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার চক্রান্ত দেশবাসী প্রতিহত করবে। এসএসসি পরীক্ষা চলমান থাকা অবস্থাতেও সরকারের নীলনকশার ষড়যন্ত্র ও বিচারের নামে অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য সকাল-সন্ধ্যা হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করছি। হরতালের আওতামুক্ত :জামায়াতের প্রেস রিলিজে বলা হয়, সংবাদপত্রের গাড়ি, সাংবাদিক, অ্যাম্বুলেন্স, জরুরি ওষুধ সরবরাহে নিয়োজিত গাড়ি হরতালের আওতামুক্ত থাকবে।