‘প্রাদেশিকতা’ শব্দটি পাকিস্তানে মুসলিম লীগের কর্তাব্যক্তিদের মাথায় ভূতের মতো চেপে বসেছিল। স্বতন্ত্র ভুবন পাকিস্তানের প্রাথমিক পর্যায়ে লীগ নেতৃত্বসহ শাসকশ্রেণির মুখে কিছু কথা ও বক্তব্য জপমন্ত্রের মতো হয়ে দাঁড়ায়। যেমন—‘শিশুরাষ্ট্র পাকিস্তান’। অতএব, সে অন্যায় করলেও কিছু বলা যাবে না। তাকে বড় হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। একইভাবে ‘ইসলাম বিপন্ন’, ‘পাকিস্তান বিপন্ন’ কথাগুলো যে কোনো প্রকার যুক্তিসঙ্গত ও নিয়মতান্ত্রিক বিরোধিতা বা সমালোচনার মুখেও বলা হতো তাদের স্বৈরাচারী শাসন চালানোর অজুহাত হিসাবে।
তবে পূর্ববঙ্গ অর্থাত্ বাঙালি, বাংলা ভাষা ও জাতিসত্তা নিয়ে পাক শাসকশ্রেণির বিরূপতা ও বিরোধিতার কোনো শেষ ছিল না। অথচ পূর্ববঙ্গীয় বাঙালির ওই পর্যায়ে পাকিস্তান ধ্বংস করা বা ভাঙার কোনো প্রকার চিন্তাই মাথায় ছিল না। ছিল কিছু যুক্তিসঙ্গত অধিকার আদায়ের দাবি। যেমন—রাষ্ট্রভাষা বাংলা। তাতেই শাসকশ্রেণি প্রাদেশিকতার গন্ধ পেত। আর প্রাদেশিকতা তাদের চোখে ছিল বিচ্ছিন্নতার প্রতিরূপ।
এ অস্ত্রটি পাক শাসকগোষ্ঠী বরাবর ব্যবহার করেছেন। যেমন—মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালে মার্চে ঢাকা সফরে এসে বক্তৃতায়, তেমনি প্রায় চার বছর পর ১৯৫২ সালে জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকায় এসে। এর আগে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানকেও একই কথা বলতে শোনা গেছে যে, যারা প্রাদেশিকতাকে প্রশ্রয় দেয় তারা রাষ্ট্রদ্রোহী। নাজিমুদ্দিনের পল্টন-বক্তৃতার বিরোধিতা করায় ৫ ফেব্রুয়ারি (১৯৫২) ‘প্রাদেশিকতা’ শিরোনামে করাচির ইংরেজি ‘ডন’-এ সম্পাদকীয় নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। তাতে যা বলা হয় তার মর্মার্থ হলো—প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিনের রাষ্ট্রভাষা বিষয়ক বক্তব্য ‘কায়েদে আজমেরই’ কথা। তার অনুপস্থিতিতে পাকিস্তানের শত্রুদের প্রভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে। এটা জাতির পিতার প্রতি অবমাননা। প্রাদেশিকতার পক্ষে যারা কথা বলে তারা রাষ্ট্রের শত্রু, তারা রাষ্ট্রের বুনিয়াদ ধ্বংস করতে উদ্যত, তাদের কোনো প্রকার প্রশ্রয় দেওয়া অনুচিত।
অবশ্য তাদের ভুল ধারণা ভাংতে কিছুটা সময় লেগেছে। করাচির ডাকসাইটে সাংবাদিক জেডএ মুলোর ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারির শেষদিকে ঢাকায় এসে সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখে উপলব্ধি করেন, রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি বাঙালি ছাত্রসমাজের প্রাণের দাবি। এ দাবির পেছনে বাইরের অর্থাত্ ভারতের প্ররোচনা নেই। তার পত্রিকা ‘ইভনিতে টাইমস’-এ উপলব্ধির আলোকেই তাদের ভাষা বিষয়ক নীতি ঢেলে সাজায়। এরপর এক পর্যায়ে ‘ডন’ পত্রিকাও সুর বদলায়।
‘প্রাদেশিকতা’ বা ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ বা অনুরূপ কোনো হুমকি ছাত্রসমাজকে ভাষা বিষয়ক চিন্তা থেকে, তত্পরতা থেকে সরিয়ে আনতে পারেনি। একুশে ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি অর্থাত্ হরতাল, সভা, সমাবেশ, মিছিল ইত্যাদি যথাযথভাবে পালনের জন্য বিভিন্ন ছাত্র-যুব সংগঠন তাদের সাংগঠনিক তত্পরতা চালাতে থাকে। যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ একাধিক সংগঠন এ ব্যাপারে সক্রিয় হয়ে ওঠে। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদও নিষ্কিয় থাকেনি। তবে একুশের কর্মসূচি সফল করতে ছাত্রাবাসগুলো ছিল বিশেষভাবে তত্পর। নেতৃস্থানীয় ছাত্রদের দেখা গেছে বিভিন্ন ছাত্রাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে, যাতে একুশে তারিখে কলেজ ও স্কুলের ছাত্ররা কর্মসূচিতে ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করে। এই বিশেষ উদ্যোগে সংগঠন হিসাবে যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মী এবং ছাত্রাবাসের মধ্যে বিশেষভাবে উদ্যোগী হতে দেখা গেছে ফজলুল হক হল, ঢাকা হলের ছাত্রনেতা ও কর্মীদের এবং মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলের রাজনীতিমনস্ক ছাত্রদের। জগন্নাথ কলেজের ছাত্রদেরও ছিল অনুরূপ বিশেষ ভূমিকা। এ কলেজের ছাত্রদের মধ্যে মৃণাল বাড়ড়ি, আনিসুজ্জামান, আহমদ হোসেন প্রমুখ ছাত্রের তত্পরতা ছিল লক্ষণীয়। এদের কেউ যুবলীগ, কেউবা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। এছাড়াও তত্পর ছিলেন অন্যান্য সংগঠনের ছাত্রনেতা-কর্মী।
এক কথায় একুশে ফেব্রুয়ারি সামনে রেখে দিনটিকে কর্মতত্পরতায় সফল করে তুলতে ছাত্রকর্মীদের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি, রাজনৈতিক নেতাদের নয়। ছাত্র-যুব নেতাদের আলাদাভাবে নাম উল্লেখ করা সম্ভব নয়। তার প্রয়োজন পড়ে না এ কারণে যে, এটা ছিল সংঘবদ্ধ প্রয়াস। ফেব্রুয়ারির ৫ তারিখ এ হিসাবে বিচ্ছিন্ন কোনো দিন না। ওই লাগাতার কর্মতত্পরতার একটি দিন বা অংশমাত্র। দিনলিপিতে একটি কথাই লেখা ছিল—একুশেকে সফল করতে হবে। সে কথাটি ছিল কারো কারো লেখায়, তবে সবারই মনে। আর এ কারণেই একুশের ভাষা আন্দোলন সফল হতে পেরেছিল। পেরেছিল তার রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-সামাজিক প্রভাবের মধ্য দিয়েও।
লেখক:ভাষা সংগ্রামী ও প্রাবন্ধিক
