সেদিন শুক্রবার। সকাল হয়েছে, হঠাত্ আমার ঘড়িটা টিক টিক শব্দ করে উঠলো। সে শব্দের আওয়াজে আমার ঘুম ভাঙলো। ঘুম থেকে জেগে উঠলাম, অনেক শীত করছে। উঠে গিয়ে জানালাটা খুলতেই একজন বৃদ্ধ লোক আমার চোখে পড়লো। দেখলাম সে একটা ছেঁড়া কাঁথা মুড়ি দিয়ে রাস্তার একপাশে শুয়ে আছে। তখন আমার কাছে মনে হলো এখনতো ঘরেই অনেক শীত করছে, বাইরে এই লোকটা কী করে একটা ছেঁড়া কাঁথা দিয়ে তার শীত নিবারণ করছে? লোকটাকে দেখে আমি খুব কষ্ট অনুভব করলাম। সারাদিন তার কষ্টের কথা আমার মনে পড়ছিলো। পরদিন স্কুলে যাবার সময় তাকে দেখলাম ঠিক একই জায়গায় বসে আছে। তার কাছে যেতেই দেখলাম প্রচণ্ড শীতে সে কাঁপছে। তখন আমার টিফিনের টাকা থেকে কিছু টাকা তাকে দিলাম। এরপর থেকে প্রতিদিনই আমি তাকে টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে কিছু টাকা তাকে দিতাম। লোকটা টাকা পেয়ে অনেক খুশি হয়ে আমার সম্মুখে প্রভুর নিকট প্রার্থনা করতো। লোকটা বলতো,‘মা,আল্লাহ তোমারে বহুদিন বাঁচাক। সেটা শুনে আমার অনেক ভালো লাগতো। এভাবে অনেক দিন কেটে গেলো। আমাদের স্কুল শীতকালীন বন্ধ দিয়েছিলো। আমি আমার পরিবারের সাথে মামার বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম। কিছুদিন ঐখানে থেকে ছিলাম। শুনলাম ৪৫ বছর পূর্বে নাকি এমন শীত এসেছিলো। এমন হাড় কাঁপানো শীত এখন আবার এসেছে। সেদিনই টিভির খবরে দেখলাম দেশের তাপমাত্রা সর্বনিম্ন। তখন হঠাত্ করে আমার মনে পড়লো ঐ বৃদ্ধ লোকটির কথা। এই হাড় কাঁপানো শীতে কীভাবে লোকটি একটা ছেঁড়া কাঁথা দিয়ে থাকছে। মায়ের কাছে গিয়ে বললাম-মা আমি বাড়িতে যাবো। কিন্তু মামা আমাদের এভাবে অনুরোধ করলো যে সেখানে আমাদের আরও দুদিন থাকতে হলো। পরদিন বাড়িতে আসার সময় ট্রেনে বসে ঐ বৃদ্ধ লোকটির জন্য আমার অনেক চিন্তা হচ্ছিলো। আসার সময় রাস্তায় দেখলাম লোকটি আর নেই। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলাম কিন্তু কোথাও তাকে দেখতে পেলাম না। তখন দেখলাম অনেক লোকেরা বলাবলি করছে ঐ দিনের শীতে নাকি রাস্তার পাশে বসে থাকা দরিদ্র বৃদ্ধ লোকটি মারা গেছে। এই কথা শোনার সাথে সাথে আমার দু’চোখ অশ্রু টলটল করছিলো। আর থাকতে না পেরে আমি কেঁদে উঠলাম। মা আমাকে জিজ্ঞাসা করায় আমি তাকে সব কথা খুলে বললাম। মা আমাকে অনেক সান্ত্বনা দিলো। তার জন্য প্রায় সময়ই আমার মন খারাপ থাকতো। এখনও শীত চলছে। আমার এই শীতের একটি ঘটনা আমি কখনও ভুলতে পারবো না। আমার কাছে মনে হয় এসব গরিব দুঃখীদের পাশে এসে সবাইকে দাঁড়ানো উচিত। তারা যেন শীতে আর কষ্ট না করে তার জন্য অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। যদি এমনটি কেউ না করে তাহলে এই দরিদ্র বৃদ্ধের মতো অনেক দরিদ্রই শীতে ও অনাহারে মারা যাবে।
সদস্য নম্বর: ৭৩৪
বাংলাদেশ রেলওয়ে উচ্চ বিদ্যালয়।
