ছন গ্রামবাংলার ঐতিহ্য। গ্রামীণ এলাকার গরীব-মধ্যবিত্তর বাড়িঘরের ছাউনি ছন। সেকালে ছন মাটি কিংবা বেড়ার ঘরে ছাউনি হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে। চট্টগ্রামের গ্রামীণ এলাকার সাধারণ মানুষ প্রতিবছর জানুয়ারি-মার্চ মাস পর্যন্ত বাড়িঘরে পুরাতন ছন সরিয়ে নতুন ছন ব্যবহার করে। এ সময়ে গ্রামবাংলার মানুষ ব্যস্ত থাকে ঘর ছাউনিতে। অর্থাভাবে টিনের পরিবর্তে ছনকে তারা ছাউনি হিসেবে ব্যবহার করে। অক্টোবর-ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত পাহাড়ে ছন কাটা উত্সব চলে। কিছুদিন শুকানোর পর তা বিক্রির জন্য হাটে নিয়ে যাওয়া হয়। এক সময় পাহাড়গুলো এলাকাভিত্তিক ছনখোলা হিসেবে বেশ পরিচিত ছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই দৃশ্য এখন আর তেমন চোখে পড়ে না। হারিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ি এলাকার ছন। আধুনিক সভ্যতায় মানুষ এখন পাকা-আধাপাকা বাড়ি তৈরিতে ব্যস্ত। ছাউনি হিসেবে ব্যবহার করছে টিনকে। ফলে গ্রামবাংলা থেকে ছনের ব্যবহার ক্রমশ বিলুপ্তির পথে।
চট্টগ্রামের উপজেলাসমূহের হাট-বাজারে এখন ছন খুব কমই দেখা যায়। সাধারণ গ্রামীণ মানুষ ঘরবাড়িতে ছাউনি হিসাবে আগের মত ছনের ব্যবহার তেমন করতে পারছে না। ১০/১৫ বছর আগেও চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় প্রচুর ছন উত্পন্ন হত। ক্রেতারা ক্রয় করে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যেত। পাহাড়ের ঢালু কিংবা উপরি ভাগে ফলমূলের চাষাবাদ, পাহাড় ন্যাড়া করা, পাহাড় কাটা ও পাহাড়ে আগুন লাগিয়ে জঙ্গল পরিষ্কারসহ বিভিন্নভাবে পাহাড় ধ্বংসের কারণে ছন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। জানা যায়, চট্টগ্রাম জেলার বনভূমির আয়তন ১,৩৯,২৭৪ হেক্টর। এককালে চট্টগ্রামের এ সব বনভূমিতে বনায়নের পাশাপাশি প্রচুর ছন উত্পন্ন হয়েছে। চট্টগ্রামে সবক’টি উপজেলার পাহাড়ি এলাকায় কম-বেশি ছন উত্পন্ন হয়েছে। বেশি ছন উত্পন্ন হয়েছে চন্দনাইশ, বাঁশখালী, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ায়। দেশের অর্ধেকের চেয়ে বেশি ছন চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে উত্পন্ন হত। এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, শুধু চট্টগ্রামে উত্পন্ন হয়েছে ১০ লাখ ভার (স্থানীয় নাম) ছন। বর্তমানে দুই থেকে চার হাত এবং আট থেকে দশ হাত লম্বা এক ভার ছনের দাম ৪০০-৫০০ টাকা। পাঁচ বছর আগে এক ভার ছনের দাম ছিল ৮০-১২০ টাকা। চট্টগ্রামের স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ছন দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যেত। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি ছন থেকে উন্নতমানের সুতা ও দড়ি উত্পন্ন হয়। উপজেলার হাট-বাজারে সপ্তাহে দুই দিন ছনের হাট বসত। প্রতি হাটে শত শত ভার ছন উঠতো।
জানুয়ারি মাস থেকে হাট-বাজারে ছন আসা শুরু হয়। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে গ্রামীণ এলাকার ঘরবাড়িতে ছাউনি হিসাবে ছনের ব্যবহারে ধুম পড়ে যায়। প্রায় পরিবার ছনের উপর নির্ভরশীল। বছর গত হলে ঘরের ছাউনিতে ছনের প্রয়োজন হয়। গ্রামীণ এলাকার লোকেরা জ্বালানি এবং গরু-মহিষের খাদ্য হিসাবে ছন ব্যবহার করেছে। কিন্তু কালক্রমে গরীবের ছাউনি সেই ছন হারিয়ে যেতে বসেছে। চট্টগ্রামের ৩০-৪০ হাজার হেক্টর এলাকায় ছন উত্পন্ন হয়েছে। পাহাড়ের জঙ্গল পরিষ্কার করে মাটিকে হালকা খুঁড়ে দিলে ভাল ছন হয়। একই পাহাড়ে ফলদ ও বনজ গাছের পাশাপাশি ছনও হয়। বিভিন্ন কারণে পাহাড় ধ্বংসের কারণে এবং রীতিমত পাহাড় পরিষ্কার না করার কারণে পাহাড়ের ছন বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে। পর পর দু’বার ছন না কাটলে সেই পাহাড়ে আর ছন হয় না। ফি বছর ছন কাটলে এবং আগাছা পরিষ্কার করে দিলে ভাল ছন হয়।
