মাইক্রোসফট ওয়ার্ডকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। ২২ বছর ধরে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বহুল ব্যবহূত সফটওয়্যার হিসেবে এটি স্থান দখল করে রেখেছে। সেই সময় থেকে এখনও পর্যন্ত এর বিকল্প খুঁজে পাওয়া ভার। সম্প্রতি তারা সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে নিয়ে এসেছে তাদের নতুন সংস্করণ অফিস ২০১৩। ক্লাউড, টাচ প্রভৃতি প্রযুক্তির এই সময়ে অফিসেও যুক্ত হয়েছে এসব সুবিধা। এই লেখায় জানাচ্ছেন
তরিকুর রহমান সজীব
বিশ্বব্যাপী যে কয়েকটি সফটওয়্যার অ্যাপ্লিকেশন সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত হয়, তার মধ্যে অন্যতম টেক জায়ান্ট মাইক্রোসফটের অফিস প্যাকজটি। ১৯৯০ সালে উইন্ডোজ পিসির জন্য প্রথম অবমুক্ত করা হয় সফটওয়্যারটি। এরও আগে ১৯৮৯ সালে অ্যাপল’র ম্যাকিনটোশ সিস্টেমের জন্য অফিস স্যুটটি বাজারে ছাড়া হয়। বাজারে আসার পর থেকেই সব ধরনের ব্যবহারকারীর কাছে তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করে এই প্যাকেজটি। ওয়ার্ড প্রসেসিংয়ের জন্য মাইক্রোসফট ওয়ার্ড, হিসাব-নিকাশের কাজে স্প্রেডশিট অ্যাপ্লিকেশন হিসেবে মাইক্রোসফট এক্সেল, প্রেজেন্টশন অ্যাপ্লিকেশন হিসেবে পাওয়ার পয়েন্টসহ পাবলিশার, অ্যাকসেস, আউটলুক, ওয়ান নোট, ভিজিও, পিকচার ম্যানেজার প্রভৃতি নানা ধরনের সফটওয়্যারের এক সমাহার অফিস স্যুট। ব্যক্তিগত ব্যবহার থেকে শুরু করে অফিস-আদালতে এবং প্রফেশনাল কাজেও এই প্যাকেজ সফটওয়্যারটির বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি কোনো সফটওয়্যার।
শুরু থেকে এখন পর্যন্ত নিয়মিত বিরতিতে মাইক্রোসফট অফিস প্যাকেজের নতুন নতুন সংস্করণ অবমুক্ত করে এসেছে। আর প্রতিটি সংস্করণের সাথে সাথেই যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন ফিচার। এই ধারাবাহিকতায় ২০১০ সালে এসে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে মাইক্রোসফট অফিস ২০১০ প্যাকেজে। তবে শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এবং ফিচার নিয়ে যে অফিস সংস্করণটি অবমুক্ত হয়েছে, তা হলো সদ্য অবমুক্ত হওয়া ‘মাইক্রোসফট অফিস ২০১৩’ অফিসের এই সংস্করণটিকে বলা যায় বৈপ্লবিক এক পরিবর্তন। সময়ের সাথে সাথে প্রযুক্তি বিশ্বে গত কয়েক বছরে যে পরিবর্তনগুলো এসেছে, তার সাথে সমন্বয় করেই তৈরি করা হয়েছে এই সংস্করণটি। এই লেখাতে অফিস ২০১৩-এর আকর্ষণীয় কয়েকটি ফিচার তুলে ধরা হলো।
ক্লাউড সংযুক্তি
অফিস ২০১৩ প্যাকেজের সবচেয়ে উদ্ভাবনী ফিচারটির কথা যদি বলতে হয়, সেটা হলো ক্লাউডের সাথে এর সংযুক্তি। ক্লাউড সংযুক্তির অর্থ হলো বিভিন্ন ডক্যুমেন্টকে মাইক্রোসফটের ক্লাউড স্টোরেজ স্কাইড্রাইভের সাথে সিনক্রোনাইজেশনের সুবিধা। সাধারণভাবে যেকোনো ডক্যুমেন্টকে পিসির হার্ডডিস্কে যেমন সংরক্ষণ করা হয় সেইভাবে ডক্যুমেন্টগুলোকে সরাসরি স্কাইড্রাইভেও করা যাবে এখন থেকে। অফিসের যেকোনো ডক্যুমেন্টে এখন ‘save as’ কমান্ড দিলেই সরাসরি স্কাইড্রাইভে সংরক্ষণ করার অপশনটি চলে আসবে। অফিস প্যাকেজের সব ধরনের অ্যাপ্লিকেশনের ডক্যুমেন্টের জন্যই এই সুবিধাটি কার্যকরী হবে। এর ফলে অফিসের ডক্যুমেন্টগুলো আরও বেশি নিরাপদ এবং সুরক্ষিত থাকবে। হার্ডডিস্কে বা লোকাল স্টোরেজের কোনো সমস্যা হলেও ডক্যুমেন্টগুলো অক্ষত থাকবে ক্লাউড স্টোরেজ সার্ভিসে।
যেকোনো স্থানে ব্যবহার
অফিস প্যাকেজের সাথে ক্লাউড সংযুক্তির ফলে যে বাড়তি সুবিধাটি পাওয়া যাচ্ছে তা হলো অফিস ডক্যুমেন্টগুলোকে যেকোনো স্থান এবং যেকোনো ডিভাইস থেকেই অ্যাকসেস করা যাবে। স্কাইড্রাইভে যেসব ডক্যুমেন্ট সংরক্ষিত থাকবে সেগুলোকে সব ধরনের ডিভাইস থেকেই ব্যবহার করা যাবে। যেমন, আপনার ডেস্কটপে কোনো ওয়ার্ড ফাইল তৈরি করে ক্লাউডে সংরক্ষণ করলে পরে ল্যাপটপ, ট্যাবলেট বা অন্য কোনো ডিভাইস থেকেই স্কাইড্রাইভে প্রবেশ করে সেই ডক্যুমেন্টটি পাওয়া যাবে। অফিস ২০১৩’তে প্রতিটি অ্যাপ্লিকেশনেই ক্লাউড থেকে তথ্য পেতে রয়েছে বিশেষ বাটন। স্কাইড্রাইভ অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করা যাবে সেখান থেকে।
নতুন ইন্টারফেস
উইন্ডোজ ৮ বাজারে আসার আগে যখন এর প্রিভিউ রিলিজ ছাড়া হয়, এর নতুন ইন্টারফেসটির নাম দেওয়া হয় মেট্রো ইন্টারফেস। পরবর্তীতে অবশ্য একে ‘মডার্ন ইন্টারফেস’ নাম দেওয়া হয়। উইন্ডোজ ৮-এর পাশাপাশি অফিস ২০১৩ প্যাকেজেও ব্যবহার করা হয়েছে সম্পূর্ণ নতুন ইন্টারফেস এবং এই ইন্টারফেসটির নামও রাখা হয়েছে ‘মডার্ন ইন্টারফেস’ (পূর্বেকার মেট্রো ইন্টারফেস)। নতুন এই ইন্টারফেসটি খুবই চমত্কার এবং পরিচ্ছন্ন বলে স্বীকৃতি পেয়েছে ব্যবহারকারী এবং সমালোচকদের কাছে। ইন্টারফেসটিতে খুব অল্প স্থান ব্যবহার করে ফিচারগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে করে খুব সহজেই সব অপশন খুঁজে পাওয়া যায়। পাশাপাশি উইন্ডোজ ৮, উইন্ডোজ আরটি এবং উইন্ডোজ ফোনের সর্বশেষ সংস্করণের সাথে মিল থাকায় এর ব্যবহার আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
ট্যাবলেট ও মোবাইল সংস্করণ
এই প্রথমবারের মতো অফিস প্যাকেজের পূর্ণাঙ্গ এবং উইন্ডোজ ফোন ৮ অপারেটিং সিস্টেম দিয়ে যে ট্যাবলেট পিসি এবং স্মার্টফোনগুলো বাজারে আসবে, তাতে পূর্ণাঙ্গ ফিচারের অফিস সফটওয়্যারগুলো ব্যবহার করা যাবে। এই সংস্করণ বিশেষায়িত হওয়ায় ঠিক ডেস্কটপের মতো সুবিধা নিয়েই ট্যাবলেট ও মোবাইলে ব্যবহার করা যাবে এই অ্যাপ্লিকেশনে।
স্টার্ট স্ক্রিন
এই প্রথমবারের মতো মাইক্রোসফট অফিস প্যাকেজের প্রতিটি সফটওয়ারের জন্য তৈরি করা হয়েছে বিশেষ স্টার্ট স্ক্রিন। এমএস ওয়ার্ড, এমএস এক্সেল, পাওয়ার পয়েন্ট, পাবলিশার, ওয়াননোট, আউটলুকসহ প্রতিটি অ্যাপ্লিকেশনের জন্য রয়েছে পৃথক পৃথক স্টার্ট স্ক্রিন এবং এদের প্রত্যেকেরটিতে ব্যবহার করা হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন রং। যেমন, এমএস ওয়ার্ডের স্টার্ট স্ক্রিনের রং নীল, এক্সেলের রং সবুজ এবং পাওয়ার পয়েন্টের স্টার্ট স্ক্রিনের রং কমলা। এই স্টার্ট স্ক্রিনে অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবহার করা ডক্যুমেন্টের তালিকাও প্রদর্শন করা হয়। সবমিলিয়ে দেখতেও খুব চমত্কার এই স্ক্রিন।
পিডিএফ সম্পাদনা
ডক্যুমেন্ট ফাইল হিসেবে বহুল ব্যবহূত একটি ফাইল ফরম্যাটের নাম পিডিএফ। অফিসের আগের সংস্করণগুলোতেও পিডিএফ নিয়ে কাজ করার সুবিধা ছিল। তবে সেগুলোতে অফিস ডক্যুমেন্টকে পিডিএফ-এ রূপান্তর করা যেত। পিডিএফ ফাইলকে অফিস ফাইলে রূপান্তর বা পিডিএফ ফাইল সম্পাদনার সুযোগ ছিল না। এই সংস্করণে পিডিএফ ফাইলকে ওয়ার্ড ফাইলে রূপান্তর করে সম্পাদনার সুযোগ মিলবে। সরাসরি পিডিএফ সম্পাদনা করে পিডিএফ ফরম্যাটের পাশাপাশি ডকএক্স ফরম্যাটেও সংরক্ষণ করা যাবে। তবে পিডিএফ সম্পাদনা করলেও এর আকৃতিগত কোনো পরিবর্তন হবে না।
স্পর্শকাতর পর্দায় অফিস
ট্যাবলেট পিসি আর স্মার্টফোনের কল্যাণে স্পর্শকাতর পর্দা বা টাচস্ক্রিন এখন বহুল ব্যবহূত প্রযুক্তি। অল-ইন-ওয়ান বা ল্যাপটপের ডিসপ্লেতেও ব্যবহূত হচ্ছে টাচস্ক্রিন। তাই মাইক্রোসফট অফিস ২০১৩’কেও বিশেষভাবে টাচস্ক্রিনের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। টাচ এনাবল ডিভাইসে আঙুলের স্পর্শেই যাতে অফিস প্যাকেজের সব কাজ করা যায়, তা নিশ্চিতে করা হয়েছে এই সংস্করণে। ফাইল খোলা, সম্পাদনা করা, সংরক্ষণ করাসহ সব কাজই করা যাবে এর মাধ্যমে।
