ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের যে ক’জন মন্ত্রী সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন তাঁদের মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় নিঃসন্দেহে সবচেয়ে প্রশংসার দাবিদার। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে তাঁর প্রচেষ্টার কমতি নেই। যুগোপযোগী ও বিজ্ঞানভিত্তিক একটি আধুনিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন তাঁর সরকারের একটি বড় সফলতা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি নতুন নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তকরণ ও জাতীয়করণ, নতুন বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেয়া, নির্ধারিত সময়মতো পরীক্ষা গ্রহণ ও ফলাফল প্রকাশ করা, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী, জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষা পদ্ধতির প্রবর্তন করা—এসবই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সফলতার অংশ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সফলতার পাল্লা ভারী হলেও ব্যর্থতা যে একেবারেই নেই তা বলা যাবে না। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত। যেমন প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা স্তর। উচ্চশিক্ষার সঙ্গে জড়িত দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বর্তমান সরকারের শুরু থেকেই নানা কারণে ছিল ব্যাপক আলোচিত-সমালোচিত। উপাচার্য ও শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি ও দলীয়করণ, নিয়ম বহির্ভূত পদোন্নতি ও ভর্তি বাণিজ্যসহ বিভিন্ন কারণে বেশ কয়েকবার খবরের শিরোনাম হয়েছে। ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময় ছাত্রসংগঠনগুলোর মাঝে ব্যাপক সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনা সংবাদের শিরোনাম ছিল। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি এতটাই অস্থিতিশীল ছিল যে, কর্তৃপক্ষ তা সামাল দিতে না পেরে দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন। বিশেষ করে বুয়েট ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে সরকারকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সময় মারাত্মক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ঢাকা কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, তিতুমীর কলেজ ও সিলেট এম সি কলেজসহ বড় বড় কলেজে ঘটেছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। এসব ঘটনায় আমরা অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী হারিয়েছি। খালি হয়েছে অনেক অসহায় মায়ের বুক। আমাদের বাবা-মায়েরা সব সময় এক অজানা আতঙ্কে ভোগেন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে তাঁরা যেন একটু স্বস্তিতে ঘুমাতেও পারেন না।
সর্বশেষ জগন্নাথ ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া দুটো ঘটনা গোটা জাতির বিবেককে নাড়া দিয়ে গেছে। ইডেন কলেজ ছাত্রীর ওপর অ্যাসিড নিক্ষেপের বিষয়টি কারো অজানা নয়। এসব কারণে অনেক বাবা-মা তাদের সন্তানকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর পরিবর্তে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোই বেশি নিরাপদ মনে করেন। কিন্তু আমরা যারা মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান আমাদের উচ্চশিক্ষার শেষ ঠিকানা হলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। অনেক স্বপ্ন নিয়ে বাবা-মা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠান। উচ্চশিক্ষা শেষে আমরা ভালো মানুষ হবো, জ্ঞান-বিজ্ঞানের ধারক ও বাহক হয়ে দেশ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করবো, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবো, এ দেশকে একটি সুখী, সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলবো—এধরনের কত স্বপ্ন থাকে তাদের। কিন্তু কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চশিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকায় তাদের অনেকের স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়।
তাই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ও অচলাবস্থার নিরসন করে উচ্চশিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালনার ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে কেবল দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে ব্যক্তির সততা, যোগ্যতা ও দক্ষতাকে প্রাধান্য দিন। শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতাকে গুরুত্ব দিন। ছাত্র সংসদগুলো কার্যকর করে নিয়মিত নির্বাচনের ব্যবস্থা করুন। ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টিকারী যেই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করুন। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তিতে সম্পূর্ণরূপে মেধাক্রম অনুসরণ করুন এবং ভর্তি বাণিজ্য বন্ধ করুন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
