বাবার সামনেই দুর্বৃৃত্তদের দেয়া আগুনে পুড়ে মরলো ছেলে

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:২৯
‘আমার চোখের সামনেই আগুনে পুড়ে মরলো ছেলেটি। তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেও পারিনি। সাহায্যের জন্যও কেউ এগিয়ে আসেনি। বাবারে, আমি মরে গিয়েও যদি ছেলেটিকে রক্ষা করতে পারতাম তাহলে মরেও শান্তি পেতাম। এখন ছেলে হারানোর শোক সইবো কীভাবে?’ উত্তরা আজমপুর বাসস্ট্যান্ডে হরতালের আগে গত সোমবার রাতে জেএম পরিবহনের একটি বাসে দুর্বৃত্তদের দেয়া আগুনে পুড়ে মারা যান আরব বাংলাদেশ ব্যাংক লিমিটেডের (এবি ব্যাংক) কর্মকর্তা রাসেল মাহমুদ (২৮)। গতকাল মঙ্গলবার এ প্রতিবেদকের কাছে এভাবেই সন্তান হারানোর অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেন রাসেলের বাবা সাইফুল ইসলাম। তিনি নিজেও অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা। রাসেলের উত্তরা দক্ষিণখান থানার নর্দা মোল্লাবাড়ি এলাকার ৩৮৬ নম্বর বাসায় এখন শোকের মাতম। রাসেলের বাবা-মা ও ভাইকে সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না কেউ। স্ত্রী তন্নির কোলে দেড়মাস বয়সী শিশুপুত্র রাফি। স্বামীকে হারিয়ে তন্নি নির্বাক। গতকাল তাদের বাসায় গিয়ে দেখা যায় এলাকাবাসী, রাসেলের বন্ধু ও সহকর্মী, রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ জড়ো হয়েছেন পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা জানাতে। এর আগে গত বছরের ২১ এপ্রিল খিলগাঁও কমিউনিটি সেন্টারের সামনে ঈগল পরিবহনের বাসে হরতালকারীরা আগুন ধরিয়ে দিলে পুড়ে ছাই হন ঘুমন্ত চালক বদর উদ্দিন। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কয়েকজন গ্রেফতার হলেও প্রকৃত খুনিরা গ্রেফতার হয়নি। বাস চালকের পরিবার এখন অর্ধাহারে-অনাহারে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। গত সোমবার ব্যাংক ছুটির পর সন্ধ্যা ৬টায় এবি ব্যাংকের কাকরাইল শাখা থেকে বের হন রাসেল মাহমুদ। বাবার সঙ্গে আগেই কথা হয়েছিল রাসেলের। বিমানবন্দর এলাকায় তিনি রাসেলের জন্য অপেক্ষা করবেন, রাসেলকে চিকিত্সকের কাছে নিয়ে যাবেন। কিছুদিন ধরে মাথাব্যাথায় ভুগছিলেন রাসেল। বাবা-ছেলে একত্রে যান উত্তরা মেডিনোভা ক্লিনিকে। পরে উত্তরা হাউজ বিল্ডিং এলাকা থেকে বাসায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে জেএম পরিবহনের ওই (সিটিং সার্ভিসের এই বাসটি টঙ্গী থেকে যাত্রাবাড়ী রুটে চলে) বাসে উঠেন তারা। বাবা ও ছেলে পেছনের দিকে ডান পাশের একটি আসনে বসেন। তখন রাত ৯টা। বাসে উঠার কয়েক মিনিট পর অর্থাত্ আজমপুর বাসস্ট্যান্ডের কাছে বাসটি আসলে পিছন থেকে আগুনের স্ফুলিঙ্গ দেখতে পান বাবা ছেলেসহ অন্য যাত্রীরা। আতংকে কে কার আগে বাস থেকে নামবে শুরু হয় ধাক্কা-ধাক্কি ও হুড়োহুড়ি। সাইফুল ইসলাম ছেলের হাত ধরে গেটের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় পেছন ও সামনে থেকে যাত্রীদের প্রচণ্ড চাপাচাপি ও ছোটাছুটি। কালো ধোঁয়ায় কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। এক হাতে ছেলেকে ধরে অন্য হাতে জানালার কাঁচে আঘাত করেন সাইফুল ইসলাম বের হওয়ার পথ করার জন্য। ধাক্কাধাক্কি ও চাপাচাপিতে সাইফুল ইসলামের হাত থেকে ছুটে যান রাসেল। সাইফুল ইসলাম জানালা গলে বেরুতে পারলেও রাসেল আটকা পড়ে বাসে। মুহূর্তে আগুন সমস্ত বাসে ছড়িয়ে পড়ে। সাইফুল ইসলাম ছেলেকে বাঁচানোর জন্য চিত্কার শুরু করেন। কেউ সাইফুল ইসলামের বুকফাটা কান্না শুনেও এগিয়ে আসেনি। ১০ মিনিট পর ফায়ার সার্ভিস আগুন নিভাতে ঘটনাস্থলে আসে ততক্ষণে রাসেল পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায়। আগুন নিভানোর পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা রাসেলের অংগার হওয়া মৃতদেহ উদ্ধার করেন। তার মুখমণ্ডল ও চেহারা পুড়ে এমন অবস্থা হয়েছে তাকে শনাক্ত করার উপায় নেই। ছেলের এ অবস্থা দেখে সাইফুল ইসলাম জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। লোকজন তাকে চিকিত্সার জন্য স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান। বাস থেকে লাফিয়ে পড়ে সাইফুল ইসলামের বাম পা ভেঙ্গে যায়। আগুনে কপালের কিছু অংশ ঝলসে যায়। সাইফুল ইসলাম বলেন, তার কলিজার টুকরা রাসেলের দেড় মাস বয়সী একটি ছেলে আছে। পরিবারের সদস্যরা তার নাম রেখেছে ‘রাফি।’ অবুঝ এই নাতীটি তার বাবাকে হারালো। বাবার আদর যত্ন থেকে বঞ্চিত হলো রাফি। গতকাল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে রাসেলের ময়না তদন্ত শেষে বাক্সবন্দি করে মৃতদেহ তাদের দক্ষিণখানের বাসায় আনা হয়। কফিন জড়িয়ে রাসেলের বাবা-মা, ভাই-বোন ও সন্তান কোলে নিয়ে তন্নি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। ময়না তদন্তকালে চিকিত্সক রাসেলের দেহাবশেষ থেকে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করেন। লাশটি শনাক্ত করার জন্য তার পিতার ডিএনএর সঙ্গে মেলানো হবে। মর্গে রাসেলের বড় ভাই রাশেদ মাহমুদসহ ব্যাংকের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। কাকরাইল এবি ব্যাংক শাখার ম্যানেজার ইত্তেফাককে বলেন, রাসেল ছিলেন ভদ্র ও নম্র প্রকৃতির। তার মৃত্যু মেনে নেয়া যায় না। গতকাল বাদ জোহর দক্ষিণখান মোল্লাবাড়ি জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে রাসেলের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। কয়েক হাজার লোক জানাজায় অংশগ্রহণ করেন। জানাজায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু, স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, রাজনৈতিক নেতা, ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বিভিন্ন পেশার লোকজন উপস্থিত ছিলেন। জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে রাসেলকে দাফন করা হয়। তার দাদার বাড়ি জামালপুর জেলার ইসলাম উপজেলার বেলগাছা গ্রামে। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন রাসেলদের দক্ষিণখানের বাসায় যান। মন্ত্রী শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। বাসে আগুন লাগিয়ে যাত্রী পুড়িয়ে হত্যা করার ঘটনায় উত্তরা (পূর্ব) থানার এসআই জাকির হোসেন বাদী হয়ে সোমবার রাতে একটি মামলা দায়ের করেছেন। এজাহারে জামায়াত শিবিরের ৭৮ জন এবং অজ্ঞাত আরও দেড়শ জনকে আসামি করা হয়েছে। ওসি জানান, বাসের পেছন দিকে আগুন লাগানো হয়েছে। এ অবস্থায় চালক বাসটি প্রায় তিন মিনিট চালিয়ে আজমপুর এলাকায় এনে যাত্রীদের নামানোর ব্যবস্থা করেন। গান পাউডার দিয়ে আগুন লাগানো হতে পারে। বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় কাউকে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়নি বলে তিনি জানান।