যশোর জেলার সীমান্তবর্তী জনপদ চৌগাছা। জেলা শহর থেকে ২৫ কি.মি. পশ্চিমে অবস্থিত সীমান্তবর্তী এ উপজেলার অধিকাংশ মানুষই জীবিকার তাগিদে চোরাচালান ও সুদ ব্যবসার সাথে ছিল জড়িত। অনুন্নত এ উপজেলার প্রায় গ্রামের নিম্নবিত্ত লোকজন ছিলো সুদখোর মহাজনদের হাতে বন্দি। সমপ্রতি সুদের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে সপরিবারে ভিটেমাটি ছেড়ে রাতের আঁধারে চলে গেছেন মুক্তদাহ গ্রামের কফিল। মহাজনের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন সিংহঝুলীর সন্তোষ ঋষি, যাত্রাপুর গ্রামের ইসহাক আলী। এ সবই এখন অতীত। এখানকার লোকজন এখন অতিত পেশা ছেড়ে দিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে কৃষি ঋণ নিয়ে সবজি চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। চৌগাছা এখন সবজি উত্পাদন জোনে পরিণত হয়েছে।
উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের মাঠে মাঠে এখন শীতকালীন শাক-সবজির সমারোহ। ফুলকপি, বাধাকপি, সিম, লাউ, টমেটো, মূলা, আলু, বেগুন, শশা, বরবটি, চিচিঙ্গা, লালশাক, পুইশাক, মিষ্টিকুমড়া, করলা, পালংশাকসহ নানা রকমের শাক-সবজিতে ভরে গেছে মাঠ। যতদূর চোখ যায়, চোখে পড়ে সবজি ক্ষেত। যেন সবুজের বিপ্লব বইছে। সবজি চাষের জন্য খ্যাত এ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের কৃষকরা এখন সবজি চাষ ও পরিচর্যায় ব্যস্ত। তীব্র শৈত্য প্রবাহের কারণে সবজির কিছুটা ক্ষতি হলেও শীতের ঝলমলে রোদে সবজি ক্ষেতগুলো অপূর্ব শোভা ধারণ করছে। প্রতি বছরের মত এবারও শাক-সবজির বাম্পার ফলন হয়েছে এ উপজেলায়। কৃষকরা বলছেন, প্রত্যাশার চাইতে বেশী দামে সবজি বিক্রি হচ্ছে। বর্তমান দ্বিতীয় দফায় সবজি বাজারে আসতে শুরু করেছে। উপজেলার চাঁদপাড়া গ্রামের সবজি চাষি শুকুর আলী জানান, সবজি একটি পচনশীল কৃষিজ পণ্য হওয়ায় দামের তারতম্য হয়। তিনি বলেন একই সবজি কখনো ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয় আবার কখনো ২০ টাকা মণ দরে বিক্রি করতে হয়। সবজি সংরক্ষণে যদি চৌগাছায় সরকারি হিমাগার থাকতো তাহলে আমাদের কষ্টে অর্জিত সবজি পচে নষ্ট হতো না।
বর্গা নেয়া জমিতে সবজি চাষে ব্যস্ত বাটিকামারি গ্রামের কৃষক সামসুল ইসলাম জানান এখানে দু’দফা শীতের সবজি চাষ হয়। যারা আগাম চাষ করেছেন তারা সবজির দামও বেশী পেয়েছেন। আবার কেউ কেউ প্রথম সবজির জমি খালি করে দ্বিতীয় মেয়াদে সবজি চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সাদীপুর গ্রামের বর্গাচাষী মহিউদ্দীন জানান অভাবের তাড়নায় যখন তিনি চোখে অন্ধকার দেখছিলেন, তখনই কৃষি অফিসের সহযোগিতায় ব্যাংক থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে সীম, লাউ, উচ্ছেসহ নানা প্রকার সবজি চাষ শুরু করেন তিনি। তিনি বলেন, আমি সবজি চাষ করে প্রথম বছরেই ঋণের ২০ হাজার টাকা পরিশোধ করেও ১৫ হাজার টাকা লাভ করি। বর্তমানে মহিউদ্দীন ৮ বিঘা জমির মালিক। এছাড়াও জমি কিনে বাড়ী করেছেন। তার জমিতে এখন ১৫/২০ জন শ্রমিক কামলা খাটেন। একই গ্রামের আশরাফ বিশ্বাসও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সবজি চাষ করে এখন সাবলম্বী। ন্যাশনাল ব্যাংক চৌগাছা শাখার ম্যানেজার ফিরোজ আহমেদ জানান ঋণ গ্রহীতা চাষীরা কোন সময়ই ঋণ খেলাপি হন না। আর এই ব্যাংক থেকে এই ঋণ পাওয়ায় এই এলাকায় সুদ ব্যবসার দাপট কমে গেছে। সুদখোর মহাজনরাও এখন টাকা দাদন না দিয়ে সবজি খামার করতে শুরু করেছেন। পাল্টে যাচ্ছে চৌগাছার কৃষকদের জীবনচিত্র।
সরেজমিন উপজেলার স্বরূপদাহ, ইছাপুর, মুক্তদাহ, পাঁচনমনা, সাদীপুর, জামিরা, চাঁদপাড়া, হাজরাখানা, জগদীশপুর, মাড়ুয়া, কাদবিলা, মাংগিরপাড়া, গুয়াতলী, বড়খানপুর, বাদেখানপুর, পেটভরা মাঠে গিয়ে দেখা গেছে মাঠে যেন সবজির সবুজ বিপ্লব বইছে। উপজেলা কৃষি অফিসার জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছেন, উপজেলার কৃষকরা সবজি থেকে বছরে প্রায় ২ কোটি টাকা আয় করছে। চলতি রবি মৌসুমে ২ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে সবজি চাষের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও চাষ হয়েছে ৩ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে।
