ঝুলে গেছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়ন

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:৩৮
বাংলাদেশ ব্যাংক ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল বাস্তবায়ন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। স্বতন্ত্র বেতনক্রম নিয়ে দু’টি পক্ষ সৃষ্টি হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত বেতন স্কেল জাতীয় বেতনক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়নি বলে তা সচিব কমিটি অনুমোদন করেনি। এখন প্রস্তাবটি কার্যত ঝুলে গেছে। যদিও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত সরকার গঠনের পর থেকেই বলে আসছিলেন ব্যাংক কর্মচারীদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল দেয়া হবে। কিন্তু গত চার বছরেও সে কাজটি বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে ব্যাংক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে যেমন ক্ষোভের সৃষ্টি হচ্ছে তেমনি প্রস্তাবিত স্কেল প্রজাতন্ত্রের শীর্ষ কর্মকর্তাদের তুলনায় বেশি হওয়ায় তারাও তা মানতে পারছেন না। প্রথম দফায় প্রস্তাবিত বেতন স্কেলের প্রথম ধাপে ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা মহাব্যবস্থাপকের মূল বেতন ধরা হয়েছিল ৫২ হাজার টাকা। এখন অবশ্য এর পরিমাণ কমিয়ে ৪৫ হাজার টাকায় নির্ধারণ করে নতুন প্রস্তাব করা হচ্ছে। সচিবদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের বেতন ৪৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া যে বিভাগের অধীন ব্যাংকগুলো সেই ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সচিবের বেতন ৪০ হাজার টাকা। অবশ্য নতুন সৃষ্ট সিনিয়র সচিবের বেতন ৪২ হাজার টাকা। প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত সর্বোচ্চ কর্মকর্তা মূখ্য সচিবের বেতন ৪৫ হাজার ৫০০ টাকা। তবে ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত ব্যক্তিদের কর্মের ধরন এবং কর্মঘণ্টা ব্যাংকের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা ঠিক হবে না। ব্যাংকের কার্যক্রম বেশিরভাগই বিশেষায়িত এবং কর্মঘণ্টা অনেক বেশি। সে বিবেচনায় ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রস্তাবিত বেতনক্রম আদৌ অগ্রহণযোগ্য নয়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরির মানসিকতা থেকে এর বিরোধিতা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমদ ইত্তেফাককে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারের মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর জন্য আলাদা বেতন কাঠামোতে সচিব কমিটির অতীত আপত্তি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক এ গভর্নর বলেন, ‘সচিবরা চিন্তা করেন, তাদের চেয়ে অন্যরা কেন বেশি টাকা বেতন পাবেন। তাদের এ আপত্তি যুক্তিযুক্ত নয়। বিশ্বের অনেক দেশেই ব্যাংক কর্মকর্তাদের বেতন অন্য কর্মকর্তাদের চেয়ে বেশি। আর আমাদের সরকারি কর্মকর্তারা অনেক সুবিধা পান, যা ব্যাংকাররা পান না। সরকারি কর্মকর্তারা পেনশন পান, প্লট বা ফ্ল্যাটও পান। ব্যাংক কর্মকর্তাদের এ সুবিধা নেই।’ জাতীয় বেতন স্কেল নির্ধারণ কমিটির সভাপতি ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররফ হোসেইন ভুঁইয়া ইত্তেফাককে বলেন, তার আগের সচিব একটি প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর নতুন কোনো প্রস্তাব তিনি পাননি। জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আব্দুস সোবহান সিকদার ইত্তেফাককে বলেন, ব্যাংক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের স্বতন্ত্র বেতনক্রমের বিষয়টি সচিব কমিটি চূড়ান্ত করবে। তবে এ কমিটিতে এখনো কোনো প্রস্তাব আসেনি। অপরদিকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ড. এম আসলাম আলম ইত্তেফাককে বলেন, সংশোধিত আকারে নতুন করে প্রস্তাব জাতীয় বেতন স্কেল নির্ধারণ কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। জানা গেছে, স্বতন্ত্র বেতনক্রম নিয়ে কিছুটা গোপনীয়তার আশ্রয় নেয়া হচ্ছে। সচিব কমিটির একাধিক সদস্য গতকাল ইত্তেফাককে বলেছেন, স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর কোনো প্রস্তাবই কমিটিতে উত্থাপন হয়নি-তাই ফেরত পাঠানোর কিছু নেই। অথচ অর্থমন্ত্রী কর্তৃক প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো সার-সংক্ষেপে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক ও চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের জন্য গঠিত একটি কমিটি থেকে স্বতন্ত্র সুপারিশ দু’টি যে সচিব কমিটি জাতীয় বেতন স্কেল বিবেচনা করেছে তাদের কাছে পাঠানো হয়-তারা বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের জন্য যে সুপারিশ করেছে তা গ্রহণযোগ্য মনে করেনি। পরিবর্তে তারা অন্য একটি বেতন স্কেল সুপারিশ করেছে যা সরকারি বেতন স্কেলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট’। প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো অনুযায়ী মহাব্যবস্থাপকদের (জিএম) প্রারম্ভিক মূল বেতন প্রস্তাব করা হয়েছে ৫২ হাজার টাকা। এ ছাড়া উপমহাব্যবস্থাপকদের (ডিজিএম) ৪২ হাজার টাকা, সহকারী মহাব্যবস্থাপকদের (এজিএম) ৩৪ হাজার, সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসারদের (এসপিও) ২৬ হাজার, সিনিয়র অফিসারদের ১৬ হাজার, অফিসারদের ১৩ হাজার, জুনিয়র অফিসারদের (শিক্ষানবিশ) ১০ হাজার, সহায়ক কর্মচারী (গ্রেড-১) ৮ হাজার, সহায়ক কর্মচারী ( গ্রেড-২) ৬ হাজার ৫০০ এবং সাধারণ কর্মচারীদের পাঁচ হাজার টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া মূল বেতনের সঙ্গে থাকবে ৬৫ শতাংশ বাসস্থান ও রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা এবং ১০ শতাংশ আপ্যায়ন ভাতা। জিএম থেকে পিও পর্যন্ত চিকিত্সা ভাতা তিন হাজার টাকা, বাকিদের দেড় হাজার টাকা। এছাড়া শিশু ভাতাও রয়েছে সবার ক্ষেত্রে। যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী ব্যাংকের গাড়ি ব্যবহার করেন না, তাদের জন্য যাতায়াত ভাতা প্রস্তাব করা হয়েছে মূল বেতনের ১০ শতাংশ। দু’টি উত্সব ভাতাসহ বছরে ১৪টি বেতন দেয়া হয় বর্তমানে। নতুন প্রস্তাবে তার কোনো পরিবর্তন হবে না। তবে শুধু মুনাফা করলেই বোনাস দেয়ার প্রস্তাব রয়েছে।