রেজিস্ট্রেশন কার্ড ও প্রবেশপত্র জালিয়াতি করে ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের ছয়টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে চলতি এসএসসি পরীক্ষায় প্রায় দেড় শতাধিক পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের কয়েকটি জেলার এসব শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ বিদ্যালয়ের টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এসএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগের দিনে অর্থাত্ শনিবার অনেক পরীক্ষার্থী মোটা অংকের টাকা দিয়ে ও অনেকে আগে থেকে টাকা দিয়ে প্রবেশপত্র নিয়ে ওই ছয়টি স্কুল থেকে পরীক্ষায় অংশ নেয়। আবার এই বিদ্যালয়গুলোর প্রধান শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতারণার কারণে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি একশ’ শিক্ষার্থী।
এই বিদ্যালয় ছয়টি হচ্ছ রৌহা উচ্চ বিদ্যালয়, দরগাবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়, পাঁচুয়া বেগম রাবেয়া উচ্চ বিদ্যালয়, পুখুরিয়া ফজলুর রহমান উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, মুখী মোমজান উচ্চ বিদ্যালয় ও পাগলা সাহেব আলী একাডেমি।
জানা গেছে, শনিবার সন্ধ্যা থেকেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মাইক্রোবাস, বাস, প্রাইভেটকার রিজার্ভ করে হাজির হতে থাকে প্রায় দেড়শতাধিক পরীক্ষার্থী। তারা গাড়ি থামিয়ে খোঁজ করছিল রৌহা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মারুফ আহম্মেদের গ্রামের বাড়ির ও চরআলগী দরগাবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বেলাল উদ্দিনের পৌর শহরের বাসার ঠিকানা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রৌহা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মারুফ আহম্মেদ ও দরগাবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বেলাল উদ্দিনের নেতৃত্বে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড কেন্দি ক একটি সিন্ডিকেট প্রায় অর্ধ কোটি টাকার চুক্তিতে দেড়শতাধিক বহিরাগত ও অবৈধ পরীক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন কার্ড ও প্রবেশপত্র ঢাকা শিক্ষা বোর্ড থেকে ‘বের করে’ এনেছে। উপজেলার এই ৬টি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে তাদের গফরগাঁও কেন্দ থেকে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছে।
খিলগাঁও আইডিয়াল স্কুলের ছাত্র সুজন, তুহিন, জয়, ননী গোপাল সরকার জানান, দরগাবাড়ি স্কুলের প্রধান শিক্ষক বেলাল উদ্দিনকে প্রায় ৩০ হাজার টাকা করে দিলেও তারা পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছেন না। প্রধান শিক্ষক বেলাল উদ্দিন তাদের প্রত্যেকের কাছে আরও ২৫ হাজার টাকা করে দাবি করে।
এদিকে শনিবার রাতে পৌরশহরের হাসপাতাল রোড, মহিলা কলেজ রোড এলাকার বেশ কয়েকটি বাসায় ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক শেখ মোহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান স্বাক্ষরিত খালি প্রবেশপত্র বেশ চড়া দামে বিক্রি হয়েছে বলে জানা গেছে।
নতুন প্রবেশপত্রধারীরা কেউই স্থানীয় বাসিন্দা নন। এমনকি আশপাশের এলাকারও কেউ নয়। তারা এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীও নয়। নানা কারণে রাজধানীর নিজ বিদ্যালয় থেকে যারা পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি তাদের একটি অংশ মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছে। টাকার বিনিময়ে পাওয়া প্রবেশপত্রধারীদের অনেকের প্রবেশপত্রের সঙ্গে রেজিস্ট্রেশন ফরমের মিল নেই, ছবির মিল নেই, তাদের নামের মিল নেই এমনকি তাদের বাবা-মা’র নামেও মিল নেই।
ঢাকার বাড্ডা এলাকার বাসিন্দা আমির হোসেন জানান, তার মেয়ে সুমাইয়া আক্তার বেরাইদ মুসলিম হাই স্কুলের ছাত্রী। সে টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়নি। প্রায় ২৭ হাজার টাকার চুক্তিতে তার মেয়ে গফরগাঁও কেন্দ থেকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছে। তার রেজিস্ট্রেশন কার্ডের ছবির সঙ্গে তার চেহারার মিল নেই।
রৌহা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে অংশ নেয়া পরীক্ষার্থী সজীব বিশ্বাস (রোল-৯০১৬৬৯) জানান, সে সারা বছর হিন্দু ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা করেছে প্রবেশপত্রে তার ইসলাম ধর্ম বিষয় এসেছে। একই বিদ্যালয়ের পরীক্ষার্থী সারোয়ার (রোল-৯০১৬৭১) জানান, সে বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র হলেও প্রবেশপত্রে বিভাগ এসেছে ব্যবসায় শিক্ষা। অধিকাংশ ছাত্র তাদের বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ব্যতীত কোন শিক্ষকের নাম জানে না।
পরীক্ষার্থী সাদিয়া আক্তার জানান, তারা একসাথে যে কয়জন পরীক্ষার্থী ঢাকা থেকে এসেছে, তারা কোনদিন গফরগাঁওয়ের কোন বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেনি। এমনকি টেস্ট পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেননি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রৌহা উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০১০ সালে জেএসসি পরীক্ষায় একজনও পাস করেনি। ২০১০ সালের নবম শ্রেণীর রেজিস্ট্রেশন জালিয়াতি করার অভিযোগে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ২০১১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণীর পাঠদানের অনুমতি বাতিল করে। পরে হাইকোর্টের নির্দেশে পুনরায় ঢাকা শিক্ষা বোর্ড পাঠদানের অনুমতি প্রদান করে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশে এ স্কুল থেকে ৯৪ জন পরীক্ষা দিচ্ছে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোস্তফা কামাল জানান, চলতি বছর যারা এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে অর্থাত্ তাদের ২০১১ সালে নবম শ্রেণীতে পড়ার কথা। অথচ রৌহা উচ্চ বিদ্যালয়ে সে সময় নবম শ্রেণীতে কোন ছাত্রই ছিল না তাই বিনামূল্যের সরকারি পাঠ্য বই সরবরাহ করা হয়নি। রৌহা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে আগের ৫৫ জন ও নতুন ৯৪ জনসহ ১৪৯জন পরীক্ষার্থী কোথা থেকে আসল তা আমার জানা নেই।
চরআলগী দরগাবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে চলতি এসএসসি পরীক্ষায় বহিরাগত ৭০ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে দশম শ্রেণীর জন্য কোন শ্রেণী কক্ষ নেই। নবম শ্রেণীর শ্রেণী কক্ষে মাত্র ২টি বেঞ্চ রয়েছে। চরআলগী গ্রামের জীবন মিয়া বলেন, দরগাবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে অংশ নেয়া পরীক্ষার্থীদের সবাই এলাকায় অপরিচিত ও বহিরাগত। আমরা তাদের কখনো দেখিনি। বাকি চারটি স্কুল থেকে ২৫ জনের বেশি বহিরাগত পরিক্ষার্থী অংশ নেয়।
এদিকে হাইকোর্টের নির্দেশে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ পরীক্ষার আগের দিন শনিবার সরকারি ছুটির দিনে সারা রাত অফিস খোলা রেখে রৌহা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯৪জন নতুন পরীক্ষার্থীর নামে রেজিস্ট্রেশন কার্ড ও প্রবেশপত্র ইস্যু করে। পরীক্ষার্থীরা কেন্দে গেলেও তাদের জন্য নতুন করে খাতা ও প্রশ্নপত্র বরাদ্দ না করায় বেকায়দায় পড়ে কেন্দ কর্তৃপক্ষ। কেন্দ সূত্রে জানা যায়, এই কেন্দে র সকল পরীক্ষার্থীর জন্য গত মাসের ১৭ জানুয়ারি খাতা, ২৩ জানুয়ারি প্রবেশপত্র, ৩০ জানুয়ারি প্রশ্নপত্র পাঠানো হয়।
কেন্দ সচিব নুরুল ইসলাম সিকদার বলেন, গত মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে এই কেন্দে র অধীন সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের পরীক্ষার্থীদের বিপরীতে বোর্ড নির্দেশনা অনুযায়ী ২৫০ টাকা করে কেন্দ ফি পরিশোধ করলেও রৌহা উচ্চ বিদ্যালয়ের নতুন ৯৪ জন পরীক্ষার্থী তাদের কেন্দ ফি পরিশোধ করেনি। নতুন পরীক্ষার্থীদের ছবি রেজিস্ট্রেশন কার্ডে নিয়ম বহির্ভূতভাবে ষ্টেপলার দিয়ে লাগানো এবং রেজিস্ট্রেশন কার্ডে বিদ্যালয় পরিদর্শকের কোন স্বাক্ষর নেই।
এ ব্যাপারে রৌহা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মারুফ আহম্মেদ এ অভিযোগ স্বীকার করে বলেন, আমার বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর পাঠদানের অনুমতি বাতিল হয়ে ছিল। নির্দিষ্ট সময়ে আমি ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করতে পারিনি। বোর্ড কর্তৃপক্ষ এসব পরীক্ষার্থী আমার বিদ্যালয়সহ উপজেলার অন্যান্য বিদ্যালয়ের নামে চাপিয়ে দিয়েছে। তারা বোর্ডের ভিআইপি পরীক্ষার্থী, তাদের না নিয়েও উপায় নেই।
এ ব্যাপারে বিদ্যালয় পরিদর্শক মো. সাহেদুল খবির চৌধুরী জানান, ২/৩ ঘন্টার নোটিসে প্রবেশপত্র ও রেজিস্ট্রেশন কার্ড তৈরি করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এগুলোতে স্বাক্ষর দেয়া হবে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক শেখ মোহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান জানান, হাইকোর্টের নির্দেশে রৌহা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৯৪জন পরীক্ষার্থীকে শেষ মুহূর্তে রেজিষ্ট্রেশন কার্ড ও প্রবেশপত্র দেয়া হয়েছে। বাকী দেড় শতাধিক রেজিস্ট্রেশন কার্ড ও প্রবেশপত্র গলাকাটা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পরীক্ষা কেন্দে র সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
