বিদ্যুত্ উত্পাদন বাড়াতে বাড়তি তেল গ্যাস চায় পিডিবি। চাহিদামতো বিপিসি তেল দিতে পারলেও গ্যাস দিতে পারবে না পেট্রোবাংলা। আবার বিপিসির তেল সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।
এই পরিস্থিতিতে শুরু হয়েছে কৃষি সেচ মৌসুম। প্রতিবারের মত এবারে সার কারখানা বন্ধ, শহরে লোডশেডিং করে কৃষিতে সরবরাহ, লোড ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্নভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে বিদ্যুতের লোডশেডিং শুরু হয়েছে। চাহিদা বাড়ার সাথে সাথে ঘাটতি বাড়বে। গ্যাস না থাকার কারণে এখনই প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন কম হচ্ছে। আগামী মাস থেকে বিদ্যুত্ উত্পাদনে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হবে। তখন গ্যাসচালিত বিদ্যুত্ কেন্দ্র থেকে উত্পাদন বাড়লেও পুরোপুরি হবে না। পিডিবি বলছে, এক হাজার ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পেলে প্রায় সব কেন্দ্র চালু রাখা সম্ভব। কিন্তু পেট্রোবাংলা বলছে, সর্বোচ্চ এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এতে করে গ্যাসের জন্য গড়ে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন কম হবে।
বাড়তি বিদ্যুত্ উত্পাদনের জন্য চলতি মাসে প্রতিদিন ৮৩ কোটি এবং মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত প্রতিদিন এক হাজার ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস চেয়েছে পিডিবি। কিন্তু পেট্রোবাংলার পক্ষে এই পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে না বলে জানানো হয়েছে। পেট্রোবাংলা সর্বোচ্চ এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করতে পারে বলে জানিয়েছে।
ভাড়ায় আনা ছোট ছোট বিদ্যুত্ কেন্দ্রগুলো চালাতে জ্বালানি তেলের চাহিদা বেড়েছে। এজন্য তেল আমদানি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। লোডশেডিং কমাতে তেলচালিত সব কেন্দ্র চালু রাখতে হবে। তাই সেচ মৌসুমে জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে বিদ্যুতের জন্য ১১৫ মিলিয়ন লিটার ডিজেল এবং ৯৪৭ মিলিয়ন মিটার ফার্নেস অয়েল লাগবে। গত বছর এই সময় বিদ্যুত্ উত্পাদনে ডিজেল ব্যবহার হয়েছে ৯৮ মিলিয়ন লিটার আর ফার্নেস ৪৪৫ মিলিয়ন লিটার। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, এবার গতবার থেকে বিদ্যুত্ উত্পাদনের জন্য প্রায় দ্বিগুণ তেলের চাহিদা দেয়া হয়েছে। এই চাহিদামতো তেল সরবরাহ সম্ভব। প্রয়োজনীয় তেল মজুদ আছে। কিন্তু তেল পরিবহনই এখন মূল সমস্যা। সরবরাহে সমস্যা না থাকলে তেলের কোন ঘাটতি হবে না।
এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. হোসেন মনসুর বলেন, সব সার কারখানা বন্ধ করে দেয়া হলেও এক হাজার ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব নয়। গত বছর সার কারখানা বন্ধ করে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট করে সরবরাহ করা হয়েছিল। এ বছরও সরকার সেই পদক্ষেপ নিলে হয়তো এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত সরবরাহ বাড়ানো যাবে। বর্তমানে বিদ্যুত্ খাতে প্রতিদিন ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।
কৃষিসেচের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়তে শুরু করেছে। মার্চ, এপ্রিল, মে মাসে এ চাহিদা থাকবে প্রায় আট হাজার মেগাওয়াট। আর ঘাটতি থাকবে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট। ফলে প্রতিবছরের মতো এবারও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের শিকার হবে গ্রাহক। এমনই আশঙ্কা করছেন বিদ্যুত্ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে বিদ্যুত্ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে কৃষিসেচ ব্যবস্থায় বিদ্যুত্ জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কীভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হবে তা আলোচনা করা হয়েছে। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, বিদ্যুত্ প্রতিমন্ত্রী মোহম্মদ এনামুল হক, বিদ্যুত্ সচিব মনোয়ার ইসলামসহ বিতরণ কোম্পানির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
চলতি বছর বোরো চাষে বিদ্যুত্চালিত সেচযন্ত্র চলবে তিন লাখ ৩৬ হাজার ৫৩৭টি। এজন্য প্রতিদিন বিদ্যুতের স্বাভাবিক চাহিদার সঙ্গে বাড়তি প্রায় এক হাজার ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা যোগ হবে। বিদ্যুত্ বিভাগের হিসেব অনুযায়ী চলতি ফেব্রুয়ারি মাসে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা হবে সাত হাজার ৭১ মেগাওয়াট। আগামী মাসে অর্থাত্ মার্চে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা থাকবে সাত হাজার ৬৫৫ এবং এপ্রিল মাসে সাত হাজার ৮৭৪ মেগাওয়াট।
পিডিবির হিসেবে বর্তমানে স্থাপিত বিদ্যুত্ কেন্দ্রগুলোর মোট উত্পাদন ক্ষমতা সাড়ে আট হাজার মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু প্রকৃত উত্পাদন ক্ষমতা সাত হাজার মেগাওয়াটের কম। এখন পর্যন্ত দেশে সর্বোচ্চ ছয় হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন হচ্ছে।
চট্টগ্রামের ৩৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রাউজান বিদ্যুত্ কেন্দ্রের দুই ইউনিট, শিকলবাহা ১৫০ মেগাওয়াট এবং শিকলবাহা ৫০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের জন্য বাড়তি এ গ্যাস চেয়েছে পিডিবি। পিডিবি সব মিলিয়ে প্রায় ৯৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের যোগান চাইছে। যা বর্তমানে ৭১৫ মিলিয়ন ঘনফুট।
এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বর্তমানে প্রতিদিন দুই হাজার ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্পাদন হচ্ছে। ঘাটতি থাকছে প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। নতুন করে গ্যাস পাওয়া না গেলে পুরানো কূপগুলো থেকে সর্বোচ্চ ১৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্পাদন বাড়ানো সম্ভব।
সেচ মৌসুমে বিদ্যুত্ সরবরাহ সহনীয় পর্যায়ে রাখতে রাত ১১টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত সেচযন্ত্র চালানো, রাত আটটার পর বিপণী বিতান বন্ধ করাসহ কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
