জামায়াতের কারণে আন্দোলনের সিডিউল পাচ্ছে না বিএনপি

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:৩৬
জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালসহ বিভিন্ন দাবিতে চলমান আন্দোলনের কর্মসূচি পালনের সিডিউল বা সুযোগ পাচ্ছে না বিএনপি। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনাল ভেঙ্গে দেয়া এবং বিচারকাজ বন্ধের দাবিতে ১৮ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াত একের পর এক হরতালসহ বিভিন্ন কর্মসূচি দেয়ায় বিএনপি একরকম বিপাকে পড়েছে। এছাড়া ট্রাইব্যুনালের রায় আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসায় বিরোধী দলের মূল দাবি নির্দলীয় সরকারের বিষয়টিও আন্দোলনের প্রধান ফোকাস থেকে আপাতত ছিটকে পড়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, জামায়াত একটি পৃথক রাজনৈতিক দল, তাই তাদের নিজস্ব কর্মসূচি থাকতেই পারে। জোটে থাকার কারণে তারা নিজস্ব কর্মসূচি দিতে পারবে না, এমন কোনো কথা নেই। তবে জামায়াতের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কেন্দ্রিক আন্দোলনের কারণে বিরোধী দলের প্রধান দাবি তত্ত্বাবধায়ক ইস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হবে কিংবা এর গুরুত্ব হ্রাস পাবে বলে মনে করি না। নির্দলীয় সরকারের দাবির পরিবর্তে এখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইস্যু আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসলে আমাদের কিছু করার নেই। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার ট্রাইব্যুনাল ঘোষিত রায়ের বিরুদ্ধে জামায়াত দেশব্যাপী হরতাল ডাকায় গতকাল বুধবার পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচিও স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে বিএনপি। ১৮ দলীয় জোটের নেতা-কর্মীদের নামে ‘মিথ্যা’ মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে গতকাল সব জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও এবং স্মারকলিপি প্রদানের কর্মসূচি ছিল। তবে জামায়াত হরতাল ডাকায় এই কর্মসূচি স্থগিত করে বিএনপি। চলতি ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপী ১৮ দল ঘোষিত অন্যান্য কর্মসূচিও পালন করতে পারা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে বিরোধী দল। অন্যদিকে, যেখানে এসএসসি পরীক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে চলতি মাসে বড় কোনো কর্মসূচি দেয়নি বিএনপি, সেখানে সেই বিবেচনা উপেক্ষা করে জামায়াত হরতালসহ বিভিন্ন কর্মসূচি দেয়ার কারণেও প্রশ্ন উঠেছে জোটে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, একথা ঠিক যে, জামায়াতের কারণে আমাদের আজকের (বুধবার) কর্মসূচি বিঘ্নিত হল। কিন্তু আমি একথাও বলতে চাই যে, জামায়াতের নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন রয়েছে। সেক্ষেত্রে তাদের বিবেচনায় ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ইস্যুতে তারা পৃথক কর্মসূচি দিতে পারে। এর সঙ্গে বিএনপি বা জোটের অন্য শরিকদের গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। এক প্রশ্নের জবাবে মাহবুব বলেন, বিরোধী দলের প্রধান দাবি নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা। এটা অনস্বীকার্য। জনগণের দাবিতে পরিণত হওয়ায় এই দাবি এখন এমন উচ্চতায় অবস্থান করছে যে, অন্য কারও কর্মসূচির কারণে তা ম্লান হবার সুযোগ নেই। বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের চলমান আন্দোলনের অংশ হিসাবে ফ্রেব্রুয়ারি মাসব্যাপী ঘোষিত অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমসহ সব ধরনের গুম, খুন ও অপহরণের প্রতিবাদে ১১ ফেব্রুয়ারি জেলা-উপজেলায় কালো পতাকা মিছিল, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে ১৮ ফেব্রুয়ারি সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় ঘেরাও ও স্মারকলিপি পেশ, মহাজোট সরকারের দুর্নীতির প্রতিবাদে ২৩, ২৫ ও ২৭ ফেব্রুয়ারি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সমাবেশ। এছাড়াও বিএনপির দুটি নিজস্ব কর্মসূচি রয়েছে এ মাসে। বিএনপির কাউন্সিল উপলক্ষে ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি সব জেলায় বর্ধিত সভা হবে। আর ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষেও রয়েছে বিএনপির নিজস্ব কর্মসূচি। এছাড়া চলতি মাসেই বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কয়েকটি জেলায় জনসভা করার কথা রয়েছে। জামায়াত যেভাবে একের পর এক হরতাল ও বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশ কর্মসূচি দিচ্ছে তাতে পূর্বঘোষিত এসব কর্মসূচি পালন করা সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন জোটের অন্য শীর্ষ নেতারা। বিএনপি ও জামায়াত ছাড়া কয়েকটি শরিক দলের শীর্ষ নেতারা ইত্তেফাককে বলেন, সামনে যে কোনদিন জামায়াতের নায়েবে আমীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিচারের রায় ঘোষণা হতে পারে। জামায়াত আগাম হুমকি দিয়ে রেখেছে যে, মৃত্যুদণ্ডসহ কোনো ‘অন্যায়’ রায় দেয়া হলে প্রয়োজনে লাগাতার হরতালের কর্মসূচি দেয়া হবে। এ কারণে বিএনপিসহ জোটের অন্য শরিক দলগুলো সামনের দিনগুলোতে নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থাসহ অন্যান্য দাবিতে সময়মতো কর্মসূচি পালন করতে পারা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখছেন। ১৮ দল শরিক ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) চেয়ারম্যান শেখ শওকত হোসেন নিলু ইত্তেফাককে বলেন, ‘চলতি মাসে ১৮ দলের সবচেয়ে বড় কর্মসূচি ছিল আজ (বুধবার)। সেখানে জামায়াতের হরতালের কারণে তা আমরা পালন করতে পারিনি। সামনের কর্মসূচিগুলোর ভাগ্যে কী আছে তা এখন বলা মুশকিল হয়ে উঠেছে।’ এদিকে, কয়েকটি কারণে জামায়াতকে নিয়ে এক ধরনের সন্দেহ-অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে বিএনপিসহ ১৮ দলীয় জোটে। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার-প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর গত প্রায় তিনবছর ধরেই জামায়াত-শিবিরকে রাজপথে, এমনকি ঘরোয়া ভাবেও কোনো কর্মসূচি পালন করতে দেয়া হয়নি। সেখানে সরকার হঠাত্ অবস্থান পরিবর্তন করে এখন তাদেরকে মিছিল-সমাবেশ করার অনুমতি দেয়ায় এই সন্দেহের সৃষ্টি হয়। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হওয়ায় জামায়াতকে নিয়ে এ সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয় বিএনপিসহ ১৮ দলে। আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এটা কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা কিনা, তা নিয়ে নানামুখী কথাবার্তা বলাবলি হচ্ছে বিএনপিতে। এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য জেনারেল মাহবুবুর রহমান বলেন, বাজারে এসব কথাবার্তা হচ্ছে। এর কিছু কারণও আছে। যেখানে প্রথম রায়ে আবুল কালাম আযাদকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে সেখানে অধিকতর গুরুতর অপরাধের অভিযোগে কাদের মোল্লাকে দেয়া হয়েছে যাবজ্জীবন। মানুষ এর কারণ খুঁজতে চায়। এছাড়া সবাই দেখলো ছাত্রশিবির পুলিশকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে, পুলিশ কড়া নিরাপত্তা দিয়ে জামায়াত-শিবিরকে মিছিল-সমাবেশ করতে দিয়েছে। মূলত এসব কারণেই জোটের অভ্যন্তরে এক ধরনের পারস্পরিক অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে, একথা সত্যি। এর চাইতেও বড় কথা, মানুষের পারসেপশন, মানুষ যেটি ধারণা করছে সেটিও রাজনীতির জন্য বড় ফ্যাক্টর, তাদের এই পারসেপশনের দৃশ্যমান যৌক্তিক কারণও রয়েছে। অবশ্য সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতার কথা নাকচ করে দিয়েছে জামায়াত। দলটির একজন কেন্দ্রীয় নেতা গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, এসব অপপ্রচার। বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের দূরত্ব তৈরির জন্যই এসব কথা বলা হচ্ছে। জামায়াতের এই বক্তব্যের সঙ্গে বিএনপির অনেকেও একমত। বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্যের মতে, আগামী নির্বাচন সামনে রেখেই এসব খেলাধুলা হচ্ছে। জোটে ভাঙ্গন ধরিয়ে জামায়াতকে বের করে আনতে এবং বিরোধী দলের প্রধান দাবি-তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুকে গৌন করে তোলার পরিকল্পনা থেকে সরকারই এই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে।