পাকিস্তানি ইসলামি উত্তেজনায় বেশ কিছুসংখ্যক বাঙালি মুসলমান কতটা দিকহারা হয়ে ওঠেন তা ভাবতে অবাক লাগে। লাগে যখন দেখা যায় পাকিস্তান শিক্ষা উপদেশ বোর্ডও প্রাদেশিক ভাষা, বিশেষ করে বাংলা আরবি হরফে লেখার জন্য সুপারিশ করেছে যা শিক্ষিত
বিশ্বের অদ্ভুততম ঘটনা হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। এদের যুক্তি, তাতে প্রদেশগুলোর মধ্যে সাংস্কৃতিক ঐক্য গড়ে তোলা সহজ হবে। আসলে এ যুক্তি ধোপে টেকে না। কারণ এতে ঐক্য হবে লিপির, ভাষার নয়।
তাছাড়া আরবি বর্ণমালা বাংলার সব ধ্বনি প্রকাশ করতে পারবে না, এমনকি ফার্সি যতটা পারে আরবি তাও পারে না। যে জন্য পাকিস্তান আরবিতে বাকিস্তান হয়ে যায়। আসলে ঐক্যের দোহাইটাও ছিল রাজনৈতিক চালাকি। উদ্দেশ্য আরবি হরফ চালু করে বাংলাকে তার সাহিত্য-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করা। যুক্ত বাংলা নিয়ে তাদের মনে উদ্ভট এক ভয় সর্বদা কাজ করেছে, বাস্তবে যার কোনো ভিত্তি ছিল না। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে বিচ্ছিন্ন বঙ্গীয় মুসলমান তখনো যুক্তবাংলার পক্ষে ছিল না।
তবু শিক্ষিত বাঙালি মুসলমানের একাংশে, বিশেষ করে ধর্মীয় রক্ষণশীল অংশে আরবি-উর্দু প্রীতি অবিশ্বাস্য মনে হলেও অসত্য ছিল না। এর আগে মওলানা রাগিব আহসানের বাংলা বিরোধিতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তার মতে পাকিস্তানের ভিত্তি হচ্ছে দ্বিজাতিতত্ত্ব- যারা এর বিরোধিতা করে তারা ইসলামের শত্রু, পাকিস্তানের শত্রু। তার প্রাদেশিকতার নামে বিভাজন সৃষ্টি করে পাকিস্তান ধ্বংস করতে চায়।
এতেও সন্তুষ্ট না হয়ে রাগিব আহসান বায়ান্নর ফেব্রুয়ারিতেই সরদার আবদুর রব নিশ্তারকে এই মর্মে চিঠি লেখেন যে, ‘পূর্ব পাকিস্তানে জাতি এবং ভাষিক জাতীয়তার নামে যাকিছু হচ্ছে তার উদ্দেশ্য পাকিস্তানকে ভেঙে ফেলা। কিন্তু দেশের জনগোষ্ঠী পাকিস্তানের প্রতি বিশ্বস্ত। তারা কায়েদে আজমের নীতি-এক জাতি, এক রাষ্ট্র ও এক জাতীয় ভাষায় বিশ্বাসী। সে ভাষা হচ্ছে উর্দু।’ তাছাড়া তিনি বলেন যে, তিনি শয়তানের মন্ত্রিসভাকেও সমর্থন করতে রাজি যদি তা ইসলামি কেন্দ্রের প্রতি বিশ্বস্ত থাকে এবং পাকিস্তানের সংহতির জন্য কাজ করে। কী ভয়াবহ অন্ধতা!
তবে সবাই সে অন্ধতার অংশীদার ছিলেন না তাই রক্ষা। যেমন ছিলেন না শিক্ষাবিদ ড. মোহাম্মদ কুদরতে খুদা। রাগিব আহসান গ্রুপ যতই চীত্কার করুন যে, কেন্দ্রে উর্দু এবং পূর্ব পাকিস্তানে আরবি হরফে ‘পাক বাংলা’ যে কোনো মূল্যে চালু করতে হবে (যে পাক বাংলা আমলা মিজানুর রহমানের ভাষায় ‘পাকিস্তানি ভাষা’) ছাত্র সমাজ চড়া সুরে এর বিরোধিতা করেছে। এমনকি ড. কুদরতে খুদাও যুক্তি সহকারে বলেছেন যে, মাতৃভাষা বাংলা শিক্ষার মাধ্যম হওয়া উচিত, কোনো বিজাতীয় ভাষা নয়। বলেছেন আরো কেউ কেউ। বলেছেন, আরো কয়েক পা এগিয়ে।
কিন্তু কবি গোলাম মোস্তফা বা মওলানা রাগিব আহসান বা আমলা মিজানুর রহমানদের চিন্তার অনুসারীদের বিশ্বাস ছিল যে, ভাষা-আন্দোলন ভাষা ও জাতীয়তাবাদের সূত্র ধরে পাকিস্তান ভাঙতে চায়, পূর্ববঙ্গকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়। যুক্ত করতে চায় ভারতীয় পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে। এর পেছনে রয়েছে কম্যুনিস্ট ও হিন্দুদের কারসাজি এবং ভারতীয় প্ররোচনা এ সবকিছুই বাঙালিয়ানার নামে।
এ ধারণা শুধু উল্লিখিত বাঙালি রক্ষণশীলদেরই নয়, বিশেষভাবেই ছিল জিন্না-লিয়াকত-নিশতার থেকে নাজিমউদ্দিন-নুরুল আমিন পর্যন্ত মুসলিম নেতা ও পাকিস্তানপন্থি বাঙালি কবি, লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীদের একাংশে। পরিস্থিতি এতটা একদেশদর্শী ছিল যে, বিপন্ন হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার জন্য গণপরিষদের অধিবেশনে ১৩ মার্চ ১৯৪৮ বিরোধী দলীয় নেতা শ্রীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে বলতে হয় যে, বাঙালি-অবাঙালি বিরোধে হিন্দুরা সংশ্লিষ্ট নন। ঢাকা প্রকাশ খবরটা ‘আন্দোলনে হিন্দুরা নাই’। এই শিরোনামে প্রকাশ করে।
অবশ্য ভয়ের কারণও ছিল। শুধু রাজনীতিকগণই নন, কোনো কোনো সংবাদপত্র এ বিষয়ে অপপ্রচারে কুখ্যাতি অর্জন করে। যেমন ঢাকায় তেমনি করাচিতে। তাই দেখা গেছে খাজা সাহেবদের কাগজ মর্নিং নিউজ এর লাগাতার সাম্প্রদায়িক প্রচারণা এবং তা ভাষা আন্দোলনকেও কেন্দ্র করে । এমনকি একুশেতে পৌঁছে তাদের কাগজে বড় শিরোনাম—‘ঢোটিস রোমিং ঢাকা স্ট্রিটস’, রীতিমত উস্কানিমূলক সাম্প্রদায়িক সংবাদ পরিবেশন। কিন্তু পঞ্চাশে সুবিধা করতে পারলেও বাহান্নতে পৌঁছে তেমন সুবিধা অপেক্ষাকৃত কমে যায়।
আশংকা কমে গিয়েছিল, কিন্তু শেষ হয়নি। তেমনি শেষ হয়নি ভাষা বিরোধিতা এবং হরফ-ষড়যন্ত্রের পাটও। তাই একুশের সফল আন্দোলনের পরও মুসলিম লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতা মালিক ফিরোজ খান নুন লাহোরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলতে পেরেছিলেন যে, বাঙালিরা যদি আরবি হরফে বাংলা লিখতে রাজি থাকে তাহলে বাংলা রাষ্ট্রভাষা হলেও তার তাতে আপত্তি নেই। কী চতুর খেলা।
হরফ-ষড়যন্ত্র নিয়ে, পাকবাংলা নিয়ে, জাতীয়তা নিয়ে, অগ্রপশ্চাত্ কিছু তথ্য পরিবেশনের তাত্পর্য হল পাকিস্তান নেতাদের বাংলা বিরূপতার বিষয়টি বুঝে নেওয়া। শিক্ষিত বাঙালি মুসলমান সবাই তা না বুঝলেও বাহান্ন’র ফেব্রুয়ারির শুরুতেই ছাত্রসমাজ তা ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিল। তাই দলমত নির্বিশেষে তাদের এক কথাঃ ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। আর সে চাওয়াকে বাস্তবায়িত করতে ৪ঠা ফেব্রুয়ারির পর থেকে প্রতিটি দিন তারা এ লক্ষ্যে কাজ করে গেছে। তাত্ক্ষণিক লক্ষ্য অবশ্য ২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসূিচ সফলভাবে পালন।
