‘তিনি ফিটফাট ভদ্রলোক’

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:৪০
নামটি তার মোহাম্মদ আলম। বয়স তিরিশের কোঠায়। গায়ের রংটি শ্যামলা। সবসময় থাকেন পরিপাটি। কথাবার্তা— তাও গোচ্ছালো। প্রথম দর্শনেই মনে হবে তিনি কোন অফিসের কর্মকর্তা অথবা ভাল একজন ব্যবসায়ি। সব মিলে তিনি একজন ফিটফাট ভদ্রলোক। কিন্তু এটি তার আসল রূপ নয়। তিনি ট্রেন যাত্রীদের কাছে ত্রাস। মানুষরূপী দানব। তার কথার অবাধ্য হলে যে কাউকেই ট্রেন থেকে ফেলে দিতে তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেন না। শুধু ট্রেনেই নয়। বিমানবন্দর রেলস্টেশন এলাকার ফুটপাতের দোকানদাররাও তার কাছে জিম্মি। কথাগুলো বিমানবন্দর ট্রেন স্টেশনের একজন দোকানদারের। তিনি বিমানবন্দর স্টেশনের দোকানদারী করছেন প্রায় এক যুগ ধরে। আলমকে বিমানবন্দর এলাকা থেকে গতকাল বুধবার গ্রেফতার করে রেলওয়ে পুলিশ। পুলিশ জানায়, গত পাঁচ মাসে কমলাপুর-জয়দেবপুর রুটে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দিয়ে পকেটমার ও ছিনতাইকারীরা হত্যা করে ৪০ জন যাত্রীকে। এদের অধিকাংশ ঘটনার সঙ্গে আলম ও তার সহযোগীরা জড়িত রয়েছে। সূত্র জানায়, টঙ্গীর মুদাফা ফকির মার্কেট এলাকার নূর মোহাম্মদের ছেলে মোঃ আলম। ২০০৫ সালের দিকে এলাকায় চুরির অভিযোগে গণপিটুনির শিকার হন। এরপর এলাকা ছাড়েন। আশ্রয় নেন রাজধানীর বিমানবন্দর সংলগ্ন আশকোনায়। পরিচয় হয় র্যাব-১ এর এক সদস্যের সঙ্গে। এরপর থেকে ঐ এলাকায় তার পরিচিতি র্যাবের সোর্স হিসেবে। আর এ পরিচয়কে পুঁজি করে গড়ে তোলে অপরাধী চক্র। যাদের প্রধান কাজ ট্রেন যাত্রীদের পকেট কাটা ও ছিনতাই করা। বিমানবন্দর এলাকায় তিনি আলম ওরফে থাপ্পা আলম নামে পরিচিত। তবে দীর্ঘদিন অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকলেও ধরা পড়তে হয়নি পুলিশের হাতে। অভিযোগ রয়েছে, বিমানবন্দর রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ি (জিআরপি) ও বিমানবন্দর ফাঁড়ির বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যদের সঙ্গেও তার রয়েছে ‘দারুণ সখ্যতা’। র্যাব-১ এর মেজর আহসান হাবিবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আলম নামে র্যাবের কোন সোর্স নেই। জিআরপি থানার সাব-ইন্সপেক্টর আলমগীর হোসেন বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গতকাল সকাল ১১টার দিকে আলমকে বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে গ্রেফতার করা হয়। আলমের অধীনের রয়েছে ৫/৬টি পকেটমার ও ছিনতাইকারী চক্র। এরা কমলাপুর থেকে ছেড়ে যাওয়া রাতের ট্রেনগুলোতে সুযোগ বুঝে যাত্রীদের কাছ থেকে মালামাল কেড়ে নেয়। এদের হাতে বহু রেলযাত্রী প্রাণ হারিয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আলম বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। তার দলের অপর সদস্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। তিনি আরো বলেন, আলম বিমানবন্দর রেলস্টেশনের আশাপাশ এলাকায় অবস্থান করে তার গ্রুপগুলো পরিচালনা করে থাকে। রেলওয়ে পুলিশের কমলাপুর থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল মজিদ বলেন, কিছু দিন আগে শাহনাজ বেগম সানু নামে এক মহিলা যাত্রীর ব্যাগ ছিনতাই করে আলম। এ ঘটনায় আলম প্রধান আসামী। এ মামলায় আলম ওয়ারেন্টভুক্ত। তাছাড়াও আলমের বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ রয়েছে। বিমানবন্দর এলাকা থেকে গ্রেফতারের পরপরই আলমকে কমলাপুর নিয়ে আসা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার তাকে রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে আদালতে পাঠানো হবে। সম্প্রতি সময় ট্রেন থেকে যেসব যাত্রীকে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হয়েছে তার সঙ্গে আলম জড়িত রয়েছে বলে তথ্য রয়েছে। তার অপর সহযোগীদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছেন। তিনি আরো বলেন, তিনি জিআরপি কমলাপুর থানায় যোগাদান করেছেন ১০/১২ দিন আগে। যোগদানের পর থেকেই তিনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ট্রেনে যারা নানা অপকর্মের সঙ্গে জড়িত রয়েছে তাদেরকে সনাক্ত ও গ্রেফতার করার। বিমানবন্দর এলাকার ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন জানান, আলমকে আটক করার পর এলাকার মিষ্টি বিতরণ করে সাধারণ ব্যবসায়ীরা। তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ ছিলো ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা। আলমকে গ্রেফতারের পর তাকে ছাড়িয়ে নিতে ফাঁড়ির কয়েকজন পুলিশ সদস্য তদবির করে। শেষটায় ওসির হস্তক্ষেপে তাদের সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়।