মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) বিশ্বজনীন শান্তির ভিত্তি স্থাপন করেছেন। এ সম্পর্কে কুরআনে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন:‘হে হাবীব (স.)! আপনাকে বিশ্বের সমগ্র সৃষ্টির জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি’ (সূরা আম্বিয়া: ১০৭)। স্বজনপ্রীতি মানুষের চিরন্তন স্বভাব, যার পরিণতি অত্যন্ত অশুভ। সামাজিক জীবনে পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ, দ্বন্দ-সংঘাত, অশান্তি প্রভৃতি স্বজনপ্রীতির বিষফল। আর এমনি আবহমানকালব্যাপী যখন মানবতা ধুঁকে ধুঁকে মরছিল, বুভুক্ষু মানবেতর জীবন যাপনকারীদের হাহাকার প্রকম্পিত হচ্ছিল, blood for blood-ই ছিল যাদের যুদ্ধের মূলনীতি। যখন গোত্রীয় মর্যাদা সমুন্নত রাখার মূলমন্ত্রের হীন চেতনায় প্ররোচিত হয়ে বছরের পর বছর অবলীলায় যুদ্ধ-সংঘাত চলছিল পরস্পরের মাঝে, ঠিক তখনই নির্যাতনের অবসান ঘটিয়ে মাস্য-মৈত্রী, ভ্রাতৃত্ব, সমপ্রীতি, সংহতি, ন্যায় ও সামপ্রদায়িক সসপ্রীতির সৌধের ওপর ইসলামী আদর্শ সমাজ-সংগঠন হয়ে আবির্ভূত হন গণতন্ত্রের মূর্ত প্রতীক ইসলামী সমাজ বিপ্লবের অবিসংবাদিত সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ সিপাহসালার হযরত মুহাম্মদ (স.)। তাঁর জীবনে সংকীর্ণ সামপ্রদায়িকতার লেশমাত্রও ছিল না। তাঁর জীবন পর্যালোচনা করলে হূদয়ঙ্গম করা যায় তিনি উদার ও একনিষ্ঠতার দ্বারা দ্বন্দ্ব-কলহ হতে চিরশান্তির নীড়ে মানব গোষ্ঠিকে আরোহণ করিয়েছেন। অন্ধকার হতে আলোর পথের দিশারী ছিলেন মুহাম্মদ (স.)। আরব ইসলাম দ্বারাই প্রথমে সঞ্জীবিত হয়ে উঠে। এ যুগের মানুষ আজ দিশেহারা, তার কাছে সুখ সামগ্রী রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে; কিন্তু শান্তি নেই এতটুকুও। এই শান্তি ও কল্যাণের পয়গামই বহন করে এনেছেন হযরত মুহাম্মদ (স.)। তত্কালীন আরবের তথা বিশ্বের নৈরাশ্যজনক অবস্থায় একজন ত্রাণকর্তার আবির্ভাবের প্রয়োজন অনুভূত হয়েছিল। এ সম্পর্কে ঐতিহাসিক আমীর আলী যথার্থভাবে মন্তব্য করেন, - Never in the history of the world was need so great, the time so ripe, for the appearance of a Deliverer,-“এর পূর্বে বিশ্বের ইতিহাসে কখনো একজন মহান ত্রাণকর্তার আর্বিভাবের সময় ও প্রয়োজন এত বেশি অনুভূত হয় নাই।’’ সামপ্রদায়িকতা ও রসূলুল্লাহ (স.)-র নীতি ঃ বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সমপ্রদায়ের সংজ্ঞায়নে বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করেছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জি ডি এইচ কোলের মতে, সমপ্রদায় হলো একটি সতত পরিবর্তনশীল জনসমষ্টি, যারা অভিন্ন রীতি ও আচার - অনুষ্ঠানের মধ্যে বাস করে এবং একই আদর্শে উদ্বুদ্ধ। কিংসলী ডেভিড বলেন, যা ক্ষুদ্র ভৌগলিক জনগোষ্ঠি তা-ই সমপ্রদায়। মারডেক বলেন, প্রত্যক্ষ মেলামেশার মাধ্যমে একত্রে বসবাসকারী ব্যক্তিবর্গের সর্ববৃহত্ গোষ্ঠিই সমপ্রদায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বার্জেস এর মত হচ্ছে, একটি ক্ষুদ্র অঞ্চলিক গোষ্ঠির নাম সম্প্রদায়, যাদের ভাষা, সামাজিক রীতিনীতি ও দৃষ্টিভঙ্গি এক ও অভিন্ন হয়। উল্লিখিত সংজ্ঞাসমূহ এবং বর্তমানের প্রেক্ষাপটের মাঝে প্রয়োগ এ দুটোর সমন্বয়ে চিন্তা করলে অনুধাবন করা যায়, “ কোন নিদিষ্ট জনমণ্ডলীর মাঝে স্বজাতি মোহ যখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে, যার প্রবণতা ও হিংস্রতা নির্দিষ্ট গণ্ডিবহির্ভূতদের ঘৃণার মনে করে এবং প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে, স্বগোত্রীয় কেউ অন্যায় আচরণ করলেও তা অন্যায় মনে না করে তখনই তাকে উগ্র সামপ্রদায়িকতা বলে। সোনালী ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে খচিত আছে প্রাক ইসলামী যুগে এ জিনিসটি আরবদের মাঝে অত্যন্ত প্রবল আকারে ছিল বলে মহানবী (স.) এ সামপ্রদায়িকতার মূলোচ্ছেদ করেন অত্যন্ত কঠোরভাবে। তাঁর অমূল্য বাণী এবং পবিত্র জীবন পর্যালোচনা করলে এ সত্য দিবালোকের ন্যায় উজ্জ্বলতা ধারণ করে। ধর্ম প্রচারক তথা সমপ্রীতি স্থাপনে রসূলুল্লাহ (স.)-র অবদান অনবদ্য। The Life of Mohammad (Sm) গ্রন্থে বার্মিংহাম বলেন, “ মূলত আরবরা ছিল উচ্ছৃংখল ও বিভেদপ্রিয়। মুহাম্মদ (স.) তাদের ঐক্যবন্ধ করেন।” এরই প্রেক্ষিতে Encyclopaedia Britannica -র রচিয়তা বলেন, “ of all the religious personalities of the world Mohammad (Sm) was the most successful. ” - পৃথিবীর ধর্ম নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাফল্য লাভ করেছেন হযরত মুহাম্মদ (স.)।” যে কুরআন মহানবী (স.)-র জীবনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি সেখানে এ প্রসঙ্গে সুষ্পষ্ট নীতি ঘোষণা করা হয়েছে: “হে মানবমন্ডলী! নিশ্চয়ই তোমাদেরকে একই পুরুষ ও একই নারী হতে সৃজন করছি এবং বিভিন্ন গোত্র ও পরিবারে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো। নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিকতর সম্মানী, যিনি অধিক আল্লাহভীরু”(সূরা হুজরাতঃ ১৩)। “হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা ন্যায়পরায়ণতার সাথে আল্লাহর ওয়াস্তে সাক্ষী হয়ে যাও এবং কোন গোত্রের বাড়াবাড়ি যেন তোমাদিগকে ইনসাফ থেকে বিমূখ না করে। জেনে রাখবে, ন্যায়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত থাকাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী” (সূরা মায়িদাহ:৮)। সমপ্রীতির লক্ষ্যে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে:“সত্য নির্ভুল পন্থা ছাড়া অন্যায়ভাবে তোমরা কোন প্রাণ তথা মানুষকে হত্যা করবে না, যা আল্লাহ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন।” অন্যত্র ঘোষণা করা হেয়েছে:“যখন তোমরা মানুষের মাঝে বিচারকদের ভূমিকা পালন করবে, তখন ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচার করবে” (নিসা ঃ ৫৮)। সমপ্রদায়িকতার বিষজাল ছিন্ন করার নিমিত্তে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন ঃ “হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন, আর বিস্তার করেছেন তাদের দু’জন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী” (সূরা নিসা ঃ ১)। উল্লিখিত আয়াতের পরিপূর্ণতা বাস্তবের নিরিখে প্রতিষ্ঠিত করেছেন মাহানবী (স.)। মহানবী (স.)-র অমূল্য বাণী সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি, স্থাপনের যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে। বিদায় হজের ভাষণে তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন:“ এই (আরাফাতের ) দিন এই (যিল্হজ্জ) মাস এবং (মক্কা) এই নগরী তোমাদের নিকট যেরূপ পবিত্র তদ্রূপ তোমাদের মহাপ্রভূ (আল্লাহ্ তা’আলার) সমীপে উপনীত হওয়ার দিন পর্যন্ত তোমরা পরস্পর তোমাদের রক্ত ও অর্থ অলঙ্ঘনীয় মনে করবে।” সমপ্রীতি স্থাপনের বাধার দিকে উল্লেখ করে মহানবী (স.) ঘোষণা করেন ঃ “পূর্বেকার বহু সমপ্রদায় ন্যায়ের তুলাদণ্ডে মেপে বিচারকার্য সম্পাদন না করায় বিধ্বস্ত হয়েছে। কোন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি অপরাধ করলে তারা তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করত না; পক্ষান্তরে সাধারণ ব্যক্তি অপরাধ করলে তাকে কঠোর দণ্ডে দণ্ডিত করত। আল্লাহ্র শপথ! মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমা চুরি করলেও তার হস্ত কর্তন করা হতো।” তিনি পুনরায় সাম্য-সংহতির কথা ঘোষণা করে এবং জাতিভেদ ও শ্রেণীভেদের সকল বৈষম্য চূর্ণ করে ঘোষণা করেন:‘কোন অনারবের ওপর কোন আরবের প্রাধান্য নেই, সেরূপ কোন আরবের ওপর অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই।’ হযরত ওমর (রা.)- কে লক্ষ্য করে মহানবী (স.) একদা বলেছেন— “হে ওমর! আজ তুমি কি মানুষকে দাসে পরিণত করবে? অথচ মানুষের মাতৃকুল মানুষকে স্বাধীন করে জন্ম দিয়েছে।” অধিকন্তু সাম্প্রদায়িক সমপ্রীতি ও স্থাপতি হিসাবে মহানবী (স.)-র উপরোক্ত বিষয় নির্দেশ সম্বলিত অসংখ্য হাদীস রয়েছে। বিশ্বনবী (স.)-র জাতি গঠনের বিপ্লবকে অভূতপূর্ব সৌভাগ্যরূপে অভিহিত করে বসওয়ার্থ বলেন:“ইতিহাসের একটি সম্পূর্ণ অভূতপূর্ব সৌভাগ্য যে, মুহাম্মদ একাধারে তিনটির স্থপয়িতা-একটি জাতি, একটি সাম্রাজ্য এবং একটি ধর্ম। এ প্রসঙ্গে হিট্রি বলেন:“মরণশীল জীবনের অতি স্বল্প পরিসরে মুহাম্মদ (স.) বিশৃঙ্খল ও প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে এমন একটা ঐক্যবদ্ধ জাতি ও সুশৃঙ্খল রাষ্ট্র গঠন করেন-যা ইতিপূর্বে শুধু ভৌগোলিক সীমারেখায় আবদ্ধ ছিল না।” (P.K.Hitti, History of the Arabs, p.121-22)। (চলবে)
লেখক :অধ্যক্ষ, সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়া, ঢাকা
