ক্ষোভের আগুন সারাদেশে

আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:৪৩
‘ফাঁসি, ফাঁসি, ফাঁসি চাই। কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই।’ রাজধানীর শাহবাগের সড়ক অবরোধ কর্মসূচী থেকে ধ্বনিত এ স্লোগান এখন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে সারা বাংলাদেশে। সব শ্রেণী-পেশা-বয়সের মানুষ কাদের মোল্লাসহ চিহ্নিত সকল যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দাবি করছেন। ফাঁসির দাবিতে আন্দোলনরতদের সংখ্যা বাড়ছে। দাবি আদায়ে আরো সোচ্চার হয়েছেন দেশের শিক্ষার্থী-তরুণরা। তাদের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে দাবিকে আরো জোরালো করেছেন মুক্তিযোদ্ধা, কবি, সাহিত্যিক, রাজনীতিক, সংস্কৃতিকর্মীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে টানা তিন দিনের মত গতকাল বৃহস্পতিবারও সারা দিন এবং সারা রাত শাহবাগে সড়ক অবরোধ ও অবস্থান কর্মসূচী অব্যাহত রেখেছেন আন্দোলনরতরা। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তার ঘরে ফিরে যাবেন না বলেও ঘোষণা দিয়েছেন। শাহবাগে অবস্থানরত জনসমুদ্রে এসে মিলেছে রাজধানীর সকল পথ। শাহবাগ ও এর পার্শ্ববর্তী সড়ক পরিণত হয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতার স্রোতে। সকাল থেকে দিন যত গড়িয়েছে আন্দোলনরতদের সংখ্যাও বেড়েছে। তীব্র গরমেও পিছপা হয়নি তারুণ্য। বরং স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত ছিল সারা দিন-রাত। আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও ব্লগাররা দৃপ্তকণ্ঠে আওয়াজ তুলেছেন, “কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি। কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় নিয়েই ফিরব।” গত মঙ্গলবার দুপুরে ট্রাইব্যুনাল-২ কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের শাস্তি ঘোষণা করলে ক্ষোভে ফুঁসে উঠে দেশের সকল স্তরের জনগণ। রাজধানীসহ বিভিন্নস্থানে তরুণদের মধ্যে এ নিয়ে বেশী ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় রায় পুনর্বিবেচনার দাবিতে দুপুরেই বিক্ষোভ-মিছিল-সমাবেশ করে ছাত্রলীগ, জাসদ ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র মৈত্রীসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন। বিকাল তিনটায় ব্লগার এন্ড অনলাইন একটিভিস্ট নেটওয়ার্কের উদ্যোগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশের পর এ সংগঠনের উদ্যোগে শাহবাগ মোড়ে অবস্থান কর্মসূচী শুরু হয়। তাদের সাথে যোগ দিতে শুরু করেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার তরুণরা। কর্মসূচীর সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেন আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা। মঙ্গলবার সন্ধ্যায়ই অবস্থান কর্মসূচী পরিণত হয় সড়ক অবরোধে। বুধবার গড়িয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত সড়ক অবরোধ ও অবস্থান কর্মসূচী চলছিল। হাজারো মানুষ একই দাবিতে শাহবাগে জড়ো হন। আজ শুক্রবারও সড়ক অবরোধ অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনরতরা। একইসাথে শাহবাগ মোড়ে অনুষ্ঠিত হবে মহাসমাবেশ। তবে এ সমাবেশে গত তিন দিনের মতো রাজনীতিকরা কোনো বক্তব্য রাখবেন না, শুধু ব্লগার, অনলাইন কর্মী, সাংস্কৃতিক কর্মী, যুবনেতারা বক্তব্য রাখবেন। জনস্রোত থেকে জনসমুদ্র :মঙ্গলবার দুপুরে কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায়ে আশাহত হয় দেশের তরুণসহ নানা বয়স ও পেশার মানুষ। তাত্ক্ষণিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানান অনেকেই। খণ্ড খণ্ড মিছিল হয় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। মঙ্গলবার বিকালে ব্লগার এন্ড অনলাইন একটিভিস্ট নেটওয়ার্কের উদ্যোগে শুরু হয় শাহবাগে বিক্ষোভ সমাবেশ ও অবস্থান কর্মসূচী। সেই কর্মসূচী গতকাল রাত পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। আজ শুক্রবারও সড়ক অবরোধ চলবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনরতরা। মঙ্গলবার রাত থেকেই শাহবাগ মোড়ে জড়ো হতে শুরু করেন শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পেশার তরুণরা। তরুণদের সেই জনস্রোতে এখন জড়ো হয়েছেন সকল বয়স ও পেশার মানুষ। শাহবাগের জনসমুদ্র অবিরত গর্জে উঠছে কাদের মোল্লাসহ সকল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে। বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে ঐ দিনের মতো কর্মসূচি শেষ করে বৃহস্পতিবার সকাল আটটায় আবার অবস্থান কর্মসূচী শুরু করার ঘোষণা দেন অনলাইন এক্টিভিস্ট উদ্যোক্তারা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ বিরাটসংখ্যক মানুষ শাহবাগ মোড়েই অবস্থান করে বিক্ষোভ অব্যাহত রাখেন। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত স্লোগানে ও বিক্ষোভ কর্মসূচিতে উত্তাল ছিল শাহবাগ এলাকা। দিন যত গড়াতে থাকে আন্দোলনরতদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। সন্ধ্যার পর উপস্থিতি আরো বাড়তে থাকে। বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয় ‘শাহবাগ স্কয়ার’। সব শ্রেণী-পেশার মানুষের মিলন বুধবার পর্যন্ত শাহবাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থী, ব্লগার ও সংস্কৃতিকর্মীদের উপস্থিতিই ছিল বেশী। আন্দোলনে মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর থেকেই সমবেত অবস্থান নেয় ছাত্রলীগ। গতকাল বৃহস্পতিবার এ অবস্থান-সড়ক অবরোধে সরব অংশ নেয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজ, আইডিয়াল কলেজ, সিটি কলেজসহ বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে সরব অংশ নেয়। নাটিকা, আলপনা অঙ্কনে ও কুশপুত্তলিকা পুড়িয়ে ঘৃণা গতকাল সকাল সোয়া নয়টার দিকে শাহবাগে পথনাটক মঞ্চস্থ করেন তীরন্দাজ নাট্যদলের কর্মীরা। প্রতিবাদে ঐ নাটকে কাদের মোল্লাসহ চিহিত যুদ্ধাপরাধীদের প্রতীকী ফাঁসির রায় ও তা বাস্তবায়ন করা হয়। দিনে আরো কয়েকবার এ নাটক মঞ্চস্থ হয়। দুপুর সাড়ে ১১টার দিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কুশপুত্তলিকায় জুতাপেটা ও পরে তাতে আগুন ধরিয়ে দেন আন্দোলনরতরা। দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত তরুণদের বিভিন্ন অংশ এরকম কুশপুত্তলিকায় জুতা মারেন ও পুড়িয়ে দেন। শাহবাগ মোড় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি পর্যন্ত সড়কে প্রতিবাদী চিত্র অংকন করেন চারুকলার শিক্ষার্থীরা। সন্ধ্যায় গত দুই দিনের ধারাবাহিকতায় মোমবাতি প্রজ্বলন, মিছিল ও মশাল মিছিল করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাসহ আন্দোলনরতরা। সব মিছিলে আন্দোলনরতরা স্লোগান দেয়- ‘এক দফা এক দাবি, কাদের মোল্লার ফাঁসি দিবি’, ‘অন্য কোনো রায় নয়, কাদের মোল্লার ফাঁসি কেন নয়’, ‘ফাঁসি, ফাঁসি, ফাঁসি চাই, কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই’, ‘আর কোনো দাবি নাই, কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই’, ‘রাজাকারের আস্তানা, ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’, ‘এই রক্ত কোনো দিন পরাজয় মানে না’, ‘আঁতাত নয় ন্যায় বিচার চাই’, ‘একাত্তরের হাতিয়ার গর্জে উঠুক আরেকবার’। ‘তুই রাজাকার’ গতকাল দিনভর শাহবাগে অবস্থানরতরা যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে নানা ধরনের স্লোগান দেন আন্দোলনরতরা। এর মধ্যে জনপ্রিয় ছিল ‘ক তে কাদের মোল্লা- তুই রাজাকার, তুই রাজাকার। জ তে জামায়াত- তুই রাজাকার, তুই রাজাকার’, ন তে নিজামী- তুই রাজাকার, তুই রাজাকার,’ ম মুজাহিদী- তুই রাজাকার, তুই রাজাকার’। শিক্ষার্থীরা আওয়াজ তুলেন-‘মুক্তিযোদ্ধাদের বাংলায়, রাজাকারের ঠাঁই নাই’। আন্দোলনরত তরুণদের দাবির সাথে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিক, সংস্কৃতিকর্মীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ। দুপুরে প্রবীণ রাজনীতিক হায়দার আকবর খান রনো বলেন, নতুন করে আইন প্রণয়ন করে হলেও কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধে গেরিলা মামা বাহিনীর নেতা শহিদুল হক মামা তরুণদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা রাজপথ ছাড়বেন না। আমরা আইনের শাসনের প্রতি বিশ্বাসী ছিলাম। আস্থা রেখেছিলাম। কিন্তু হতাশ হয়েছি। বিচারপতিদের এ রায় আমরা মানি না।’ তিনি স্লোগান তুলেন- ‘সারা বাংলাদেশ ঘেরাও করো, জামায়াত-শিবির খতম কর।’ দুপুর তিনটার দিকে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করে বলেন, রক্তের দামে কেনা এই বাংলাদেশ। কিন্তু কেন যেন বার বার আমরা এর মূল্য বুঝে উঠতে পারি না। তাই হতাশ হলাম। আজ এ তরুণদের দেখে মনে হচ্ছে, নতুন বাংলাদেশকে দেখছি। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার এ পথচলা কেউ রুখতে পারবে না। জামায়াত-শিবির হারিয়ে যাবে। নিশ্চিহ্ন হবে। আন্দোলনে সংহতি জানান- মন্ত্রী সাহারা খাতুন এমপি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আইভী রহমান, প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই এলাহী, সাবেক ফুটবলার আরিফ খান জয়। তবে সাহারা খাতুন সমাবেশস্থলে উপস্থিত হলে আন্দোলনরতরা স্লোগান দেন ‘মিষ্টি কথায় ভুলি না, আঁঁতাতকারীদের সাথে আপষ না।’ এরপর তিনি সমাবেশস্থল ত্যাগ করেন। মহাসমাবেশের মঞ্চ রাজনীতিকদের নয় পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী আজ শুক্রবার বিকেল তিনটায় শাহবাগে মহাসমাবেশ শুরু হবে। মহাসমাবেশ মঞ্চে ব্লগার ও ফেসবুক এক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও যুব সংগঠনের নেতারা বক্তব্য রাখবেন। কোনো রাজনৈতিক নেতা বক্তব্য দিতে পারবেন না। রাজনৈতিক দল বা অঙ্গসংগঠনকে কোনো ব্যানার নিয়ে না আসার জন্যও অনুরোধ জানানো হয়েছে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে। এক পতাকাতলে গতকাল দুপুরে শাহবাগে সমাবেশস্থলে বিশালাকৃতির এক পতাকা নিয়ে আসেন জয়ধ্বনি সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীরা। ৪০ ফুট দীর্ঘ ও ২৮ ফুট প্রস্থের ঐ পতাকা নিয়ে শাহবাগ এলাকায় মিছিল করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও আন্দোলনরতরা। এ সময় শ্লোগান ওঠে ‘ষড়যন্ত্র রুখবোই, পতাকার মান রাখবোই’। যানবাহন চলাচলে বাধা, যানজট মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকেই শাহবাগে সড়ক অবরোধ করে রাখেন আন্দোলনকারীরা। বুধবার দুপুরে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা কিছুটা কমলে বেলা আড়াইটা থেকে বিকাল সাড়ে চারটা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের পাশ দিয়ে মাত্র একটি রাস্তায় যান চলাচল করে। বিকালের দিকে জনসমাগম বাড়লে আবারও বন্ধ হয়ে যায় যান চলাচল। পরে বুধবার রাতে চারুকলা ইনস্টিটিউটের সামনে, আজিজ সুপার মার্কেট, রূপসী বাংলা হোটেলের সামনে ও শিশুপার্কের সামনে কাঁটাতারের অস্থায়ী বেড়া তৈরি করে পুলিশ। গত রাত পর্যন্ত শাহবাগ মোড় দিয়ে যান চলাচল বন্ধ ছিল। এর কারণে শাহবাগ ও পার্শ্ববর্তী সড়কে যানজট তৈরি হয়। এ প্রসঙ্গে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল ইসলাম জানান, আন্দোলনকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সড়কে এ অস্থায়ী কাঁটাতারের বেড়া স্থাপন করা হয়েছে। শাহবাগ মোড় দিয়ে যান চলাচল না করতে তিনি রাজধানীবাসীর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।