বাংলা বানানের নিয়ম-কানুন

আপডেট : ০৩ মে ২০১৯, ১৯:২১

বাংলা

মো. মিজানুর রহমান,সহকারী  শিক্ষক

গাইবান্ধা সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয়

গাইবান্ধা সদর, গাইবান্ধা।

 

শিক্ষার্থী বন্ধুরা, প্রতি সপ্তাহের ধারাবাহিকতায় আমাদের আজকের আলোচ্য বিষয় - ভাষার মৌলিক সংগঠন বা ব্যাকরণের আলোচ্য বিষয় ।

বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই ভালো আছ। পড়াশোনা করতে আমাদের ভালই লাগে। কিন্তু সবসময় পড়ার কথা শুনতে আমাদের ভালো লাগে না। তাই আজ কোনো পড়ালেখা নয়। শুধুই গল্প বলা। কি গল্প বলবো বল!

আচ্ছা আজ আমরা ছোটবেলার গল্পে ফিরে যাই। একদম মায়ের কোলে। আমি তোমাদের শোনাব ‘মাম’ এর গল্প। আমাদের মুখে যখন আধো আধো বোল ফুটতো তখনকার গল্প বলি। সে সময় আমরা কিছু আওয়াজ করতে পারতাম। যেমন- দা,বু,ও, য় ,এহ, এ, ও , হ , হু ইত্যাদি। আসলে এ ধরনের আওয়াজ এর মাধ্যমে আমরা কিছু ধ্বনি উচ্চারণ করতাম । এভাবে বিভিন্ন ধ্বনি উচ্চারণের মধ্য দিয়ে আমরা বাবা, মা, বড় ভাই-বোনদের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করতাম। সে সময়ে আমরা এটা ওটা চাইতাম কিন্তু কোনটার নাম ভালোভাবে বলতে পারতাম না।

এর পরবর্তী পর্যায়ে আমরা ধীরে ধীরে চেষ্টা করেছি একটি দুটি ধ্বনিকে একত্রে উচ্চারণ করতে। এমনই একটা বিষয়ের কথা আজ তোমাদের মনে করিয়ে দিতে চাই। আমাদের যখন পিপাসা লাগতো তখন আমরা শুধুই একটি শব্দ উচ্চারণ করতে পারতাম; আর তা হলো সবার প্রিয় শব্দ ‘মাম’। এই যে ‘মাম’ শব্দটি আমরা বললাম। এখানে কয়টি ধ্বনি আছে তা তোমাদের সবারই জানা। এখানে ম+অ+আ+ম+অ = মাম, মোট ৫ টি ধ্বনি রয়েছে। বন্ধুরা, তাহলে ভাষাকে যদি মানব দেহের সঙ্গে তুলনা করা হয় তবে তার প্রথম অঙ্গকে আমরা বলতে পারি ধ্বনি।

পাঁচটি ধ্বনির সমন্বয়ে ‘মাম’ নামক যে শব্দটি তৈরি হলো; এই একটি শব্দতেই আমরা থেমে থাকিনি। এরপরে আমরা আবার চেষ্টা করেছি একাধিক শব্দকে পাশাপাশি বসিয়ে উচ্চারণ করার। এক্ষেত্রে শুধু ‘মাম’ বলে যখন কাজ হতো না, তখন আমরা বলার চেষ্টা করেছি “মাম খাব।” এ পর্যায়ে কাজ হলেও আমরা বাক্যের পরিধি প্রসারিত করতে সব সময় সচেষ্ট থেকেছি। এরপরে বলেছি “আমি মাম খাব”। এভাবে আমরা যখন পরিপূর্ণ বাক্য বলতে সক্ষম হয়েছিলাম তখন কিন্তু ‘মাম’ শব্দটি বলা ছেড়ে দিয়েছি। এতদিনে পরিবারের সদস্যরা বলতো - “এই বোকা তুই তো বড় হয়েছিস; তো এখন ‘মাম’ বলিস কেন ‘মাম’- কে পানি বলতে পারিস না।” তখন আমরা বলতাম এভাবে - “আমি পানি খাবো।” বন্ধুরা আমার গল্প কিন্তু শেষ।

এবার তোমরা বলো-গল্পটি থেকে কী কী শিখলে। তোমরা নিশ্চয়ই বলবে- প্রথমে আমরা আওয়াজ করতে শিখেছি। অর্থাত্ বিভিন্ন ধ্বনি উচ্চারণ করতে শিখেছি। যেমন- ও, বু, বা,দি, দা ইত্যাদি। এভাবেই চলতে থাকে ভাষা বলার প্রক্রিয়া। আর ভাষাকে বিশ্লেষণ করতে গিয়েই ভাষাবিজ্ঞানীগণ এই বিষয়টির নাম দিয়েছেন ধ্বনিতত্ত্ব।

এরপর আমরা একাধিক ধ্বনিকে একত্রে উচ্চারণ করতে চেষ্টা করি। যেমন বাবা, মা, মাম, দাদা ইত্যাদি। এই যে একাধিক ধ্বনি মিলে তৈরি হলো শব্দ। শব্দকে ভাষার দ্বিতীয় অঙ্গ বলা যেতে পারে। তাই ভাষা বিজ্ঞানীগণ শব্দ সংক্রান্ত বিশ্লেষণী আলাপ আলোচনার এই প্রক্রিয়াটির নাম দিয়েছেন শব্দ তত্ত্ব।

বন্ধুরা, আমরা কিন্তু এখানেই থেমে থাকিনি। আমরা একাধিক শব্দকে পাশাপাশি বসিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছি। যেমন- মাম খাব। দাদি যাব। বাবা যাব। মা, মাম দাও ইত্যাদি। এই যে শব্দের পর শব্দ বসিয়ে যে অবস্থা তৈরি হলো তাকেই আমরা বলছি বাক্য। তাই বাক্যকে ভাষার তৃতীয় অঙ্গ বলা যেতে পারে। আর ভাষা বিজ্ঞানীগণ এর নাম দিয়েছেন বাক্যতত্ত্ব। তাহলে আমরা বলতে পারি ভাষার মৌলিক অঙ্গ বা সংগঠন চারটি। যথা: ধ্বনি, শব্দ, বাক্য, অর্থ। আর এগুলোর তত্ত্বগত আলোচনাই হচ্ছে ব্যাকরণের আলোচ্য বিষয়। আর এজন্যই বলা হয়ে থাকে ব্যাকরণের আলোচ্য বিষয়ই চারটি। যথা: ধ্বনিতত্ত্ব, শব্দতত্ত্ব/রূপতত্ত্ব, বাক্যতত্ত্ব ও অর্থতত্ত্ব।

এছাড়াও প্রতিটি বাক্যের আবার রয়েছে নিজস্ব অর্থ। এই অর্থকে কেন্দ্র করে যে তত্ত্ব ভাষাবিজ্ঞানীগণ ব্যাখ্যা করেছেন তার নাম দিয়েছেন বাগর্থ তত্ত্ব। আবার বাক্য তৈরির ক্ষেত্রে বিশেষভাবে দৃষ্টি রাখতে হয় ছন্দ ও অলংকার এর দিকে। ছন্দ ও অলংকার- এর এই বিশ্লেষণী দিকটিকে বলা হয় ছন্দ ও অলংকার তত্ত্ব। এছাড়া শব্দের উত্পত্তি, উচ্চারণ ও বানান সংক্রান্ত বিষয়টির চূড়ান্ত সমাধানের জন্য রয়েছে অভিধান। আর এ জন্যই অভিধান তত্ত্ব নামে আরেকটি তত্ত্বকে ভাষা বিজ্ঞানীগণ বিশেষভাবে স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন।

( সূত্র: বাংলা ভাষার ব্যাকরণ , নবম/দশম শ্রেণি ও বাংলা ভাষা পরিক্রমা- এস এম জাকির হুসাইন)

আরও জানতে চোখ রাখো ফেইসবুক পেইজে “বাংলা বানানের নিয়ম-কানুন” গ্রুপে এবং দৈনিক ইত্তেফাক-এর অনুশীলন পাতায়। আমরা আছি তোমাদের সাথে নতুন নতুন বানান নিয়ে।