১৬ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশের রাজধানী বসবাসযোগ্য শহরের তালিকায় বিশ্বের ২০৩তম নগরী। অবকাঠামোর বিচারে আমাদের রাজধানীর স্থান ২০৫তম। এশিয়ার বড় নগরীগুলোর মধ্যে ঢাকার অবস্থান সবচেয়ে বাজে। নির্মাণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান মার্সার বিশ্বের ২২১টি নগরীর ওপর গবেষণা চালিয়ে এ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। রিপোর্ট অনুসারে বিশ্বের বসবাসযোগ্য ২৫টি নগরীর ১৫টিই ইউরোপে। তালিকার সর্বনিম্ন ২০টি নগরীর সবকটিই আফ্রিকায়। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য নগরীগুলোর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাব্যবস্থা, অপরাধ প্রবণতা, বিনোদন ও যাতায়াতব্যবস্থাসহ ৩৯টি সূচকের ভিত্তিতে মার্সার যে তালিকা প্রণয়ন করেছে তাতে বাংলাদেশের রাজধানীর নাজুক অবস্থাই ফুটে উঠেছে। রাজধানী ঢাকার জনসংখ্যা এখন দেড় কোটির ওপরে। গত দুই দশকে দেশের অর্থনীতি দ্রুতগতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতি অর্জন করছে গর্ব করার মতো সাফল্য। তারপরও রাজধানীর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ঘটেনি কোনো অগ্রগতি। ঢাকার বাড়িভাড়া স্পুটনিক গতিতে বাড়ছে। ইতোমধ্যে এটি পরিচিতি লাভ করেছে যানজটের নগরী হিসেবে। বিদেশিরা যে কারণে ঢাকাকে এড়াতে চায় যানজট তার অন্যতম কারণ। বিশ্বের ২২১টি নগরীর মধ্যে বাসযোগ্য বিবেচনায় ২০৩ নম্বর স্থান লাভের মধ্যে সান্ত্বনা এতটুকু যে, আমাদের এই গ্রহে ঢাকার চেয়েও খারাপ মানের শহর রয়েছে অন্তত ১৮টি। এর আগে নগরবিষয়ক এক গবেষণায় ঢাকাকে জিম্বাবুয়ের রাজধানী হারারের পর সবচেয়ে বাজে নগরী হিসেবে অভিহিত করা হয়েছিল। দেউলিয়া হয়ে পড়া জিম্বাবুয়ের রাজধানীও ঢাকার ওপর নিঃশ্বাস ফেলছে, এটি ১৬ কোটি মানুষের জন্য নিঃসন্দেহে লজ্জার ঘটনা। ঢাকার এ দুরবস্থার জন্য অনির্বাচিত সিটি করপোরেশনের দায়-দায়িত্বহীন ভূমিকা অনেকাংশে দায়ী। দায়ী জবাবদিহিতার অভাব। ঢাকাকে মানুষের বাসযোগ্য শহরের তালিকায় নিতে হলে এ অকাম্য অবস্থার অবসান ঘটাতে হবে।
ঢাকার পাবলিক পরিবহনব্যবস্থা নিম্নমানের এবং চলাচলে শৃঙ্খলা নেই। ফলে জনগণ এসব পাবলিক পরিবহনব্যবস্থা ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। একই রাস্তায় বিভিন্ন গতির গাড়ি চলাচল করায় তাদের গতি হয় বাধাগ্রস্ত ও নিয়ন্ত্রিত। ফুটপাতগুলো ভাঙাচোরা, অনেক স্থানে তাও নেই। যেখানে ফুটপাত আছে তাও হকারদের দখলে। বৃষ্টি হলেই রাস্তাগুলো জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা অপ্রতুল। ঢাকায় জনসংখ্যার ঘনত্ব নিউইয়র্ক শহরের চেয়েও প্রায় ১৭গুণ বেশি। জনসংখ্যার চাপ এবং যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলার অভাব যানজটের ওপর প্রভাব ফেলে। ঢাকা নগরীর ড্রেনেজ, স্যুয়ারেজ, বিদ্যুত্, পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সক্ষম কিনা তা হয়তো বিবেচনায় না নিয়েই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আবাসিক এলাকাগুলোতে বিভিন্ন সময়ে প্রথমে দোতলা, পরে ছয়তলা, এখন আবার চৌদ্দতলা ভবন নির্মাণ করার অনুমতি দিয়ে জনসংখ্যার ঘনত্ব বৃদ্ধির ব্যবস্থা করেছে।
ঢাকা শহরের বর্তমান অবকাঠামোগত যে সমস্যা, এখানে অনেক বেশি নতুন রাস্তা তৈরি করা সম্ভব হবে না। তাই সীমিত রাস্তাগুলোকে বিভিন্নভাবে সর্বোত্তম ব্যবহার করতে হবে। ঢাকা শহরের আশপাশ থেকে যাতায়াত করে অফিস-আদালতে কাজ করার সুবিধা অপ্রতুল। ফলে তাদের কষ্ট হলেও ঢাকাতেই বসবাস করতে হয়। পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন করা হলে বহু লোক নিকটবর্তী শহরগুলো থেকে প্রতিদিন আসা-যাওয়া করে অফিস ও ব্যবসা-বাণিজ্য করতে সক্ষম হবে। ফলে ঢাকার জনসংখ্যা অনেকাংশে কমে যাবে এবং ঢাকায় অভ্যন্তরীণ চলাচলও কমে আসবে। কলকাতার ও করাচির মতো ঢাকার প্রধান সড়ক থেকে রিকশা উঠিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগকারী ও পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে ঢাকার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে হবে ।
ঢাকায় আবাসিক এলাকাগুলোতে প্রয়োজনীয় কিন্ডারগার্টেন, স্কুল-কলেজ, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ইত্যাদি স্বয়ংসম্পূর্ণ করে পুনর্বিন্যাস করতে হবে, যেন এসব সেবা পেতে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যেতে না হয়। ক্লিনিক, হাসপাতালের নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থা থাকতে হবে। সব স্কুল-কলেজ কর্তৃপক্ষকে চালু করতে হবে স্কুল ও কলেজ বাস বা মাইক্রোবাস। রাস্তার ক্রসিংগুলোতে ফ্লাইওভারব্রিজ নির্মাণ করে গাড়ি চলাচলে স্থবিরতা দূর করতে হবে।
রাজধানীর জনসংখ্যা কমাতে গার্মেন্টসসহ শিল্প-কলকারখানা ঢাকার বাইরে স্থানান্তরের কথা ভাবতে হবে। পরিবেশ উন্নত করতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব বেসরকারি সংস্থার কাছে দেয়া দরকার। কেউ যেখানে সেখানে ময়লা ফেললে, রাস্তা নষ্ট করলে এমনকি নদী অথবা জলাশয়ে আবর্জনা ফেললে তারা সঙ্গে সঙ্গে জরিমানার ব্যবস্থা করতে পারবে।
রাজধানীতে একদিকে বাড়ছে জনসংখ্যার চাপ, অন্যদিকে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ। পরিবেশবান্ধব রাজধানী গড়ে তোলার স্বপ্ন আজ অবধি পূরণ হয়নি। কিন্তু এই রাজধানীকে আমরা তিলে তিলে তিলোত্তমা করে গড়ে তুলতে চাই। দিনে দিনে নগরীর পরিধি বাড়লেও পরিকল্পনার অভাব এখনো প্রকটভাবেই দৃশ্যমান। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও মানুষের লোভের আগুনে পুড়ছে রাজধানীবাসীর স্বপ্ন। কিন্তু এভাবে তো আর চলতে দেওয়া যায় না। রাজধানীকে বসবাসের উপযোগী করতে হবে। মানুষের জন্য নিরাপদ করতে হবে এই রাজধানীকে।
ঢাকা
