যাত্রীদের কাছে ট্রেন একটি নিরাপদ বাহন। বিশেষ করে যাত্রাপথে টয়লেট ব্যবহার, ওজু-নামাজের ব্যবস্থা ও খাবারের সুযোগ থাকায় নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধদের কাছে বাসের চেয়ে টেন ভ্রমণ অনেকটা আনন্দদায়ক। দীর্ঘ যাত্রায় একসঙ্গে পরিবার-পরিজন নিয়ে ট্রেন ভ্রমণ চমকপ্রদ। তাই ধীরে-ধীরে রেলযাত্রীর সংখ্যা যেমন বাড়ছে তেমনি রেললাইনের সম্প্রসারণও হচ্ছে। রেলওয়ের জন্য আলাদা পুলিশব্যবস্থা ও চলন্ত ট্রেনে পুলিশের পাহারা থাকায় অনেকেই রেলকে নিরাপদ বাহন হিসেবে বেছে নিচ্ছে। কিন্তু সরকারি পরিবহন রেল এখন যাত্রীদের মরণ বাহনে পরিণত হয়েছে। নিরাপত্তার এ বাহনটি এখন চরম আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রেলযাত্রীরা জান ও মাল নিয়ে সাংঘাতিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
বাংলাদেশ রেলে চোর, ডাকাত, ছিনতাইকারী ও হত্যাকারীদের আনাগোনা বেড়েছে। এক সময় বলা হতো, চোরাচালানিদের নিরাপদ বাহন হচ্ছে ট্রেন। আর এখন হয়েছে খুনি-ডাকাত-ছিনতাইকারীদের নিরাপদ বাহন। প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত ৫ মাসে রেলওয়ের বিভিন্ন রুটে ডাকাত-ছিনতাইকারীদের হাতে নিহত হয়েছেন ৪৪ জন যাত্রী। এদেরকে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হয়। রয়েছে ছিনতাইকারী, পকেটমার ও অজ্ঞান পার্টির সীমাহীন দৌরাত্ম্য। সব শেষ গত ৩১ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ভোরে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ডাকাত দল চলন্ত ট্রেন থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে ৪ যাত্রীকে হত্যা করেছে। ডাকাতরা যাত্রীবেশে ঢাকাগামী তিতাস কমিউটারে উঠে নির্বিচারে তাণ্ডব চালাতে থাকে। এসময় কিছু যাত্রী প্রতিবাদ করলে ৪ জনকে ট্রেন থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় তাত্ক্ষণিকভাবে ট্রেনটিতে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ৩ পুলিশ সদস্যকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করতে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে চট্টগ্রাম রেলওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে।
দেশের সকল সড়ক-মহাসড়কের যাত্রীদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। হাইওয়ে পুলিশ ছাড়াও বিভিন্ন থানার টহল পুলিশ সড়কে পাহারা দেয়। এর পরও প্রায়ই বাস-মিনিবাসে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। কিন্তু বাস ডাকাতির ক্ষেত্রে যাত্রীদের হত্যা করার ঘটনা তুলনামূলক কম ঘটে থাকে। দেশের সকল সড়কপথে সার্বক্ষণিক পুলিশি পাহারা দেওয়া সম্ভব হয় না। এ কারণে ডাকাত দল ফাঁকা রোডে বাসে হানা দেয়। লুটে নেয় যাত্রীদের সর্বস্ব। কিন্তু ট্রেন সরকারি সম্পত্তি। রেলওয়ের জন্য আলাদা পুলিশ বাহিনী রয়েছে। তবে পুলিশ সদস্য সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়। খাতা-কলমে যা আছে তার সবাই কর্মরত থাকেন না। নেই আধুনিক সরঞ্জামাদি। প্রাপ্ত তথ্য মতে, বাংলাদেশ রেলওয়েতে কর্মরত পুলিশের সংখ্যা ১৩৭৬ জন। পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চলে প্রতিদিন চলাচলকারী ২৮৮টি ট্রেনের প্রায় আড়াই লাখ যাত্রীর নিরাপত্তা দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয় বলে স্বীকার করেছেন রেলওয়ে পুলিশের একজন কর্মকর্তা। পূর্বাঞ্চল রেলে ১৭৫টি ট্রেনের লক্ষাধিক যাত্রীর নিরাপত্তায় রয়েছে ৬৯৮ জন পুলিশ। আর পশ্চিমাঞ্চল রেলে ১১৩টি ট্রেনের প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার যাত্রীর নিরাপত্তায় রয়েছে ৬৭৮ জন পুলিশ। একটি আন্তঃনগর ট্রেনের প্রায় ৯০০ যাত্রীর নিরাপত্তায় থাকে মাত্র ৪ জন পুলিশ সদস্য। এই যখন বাস্তব অবস্থা তখন অপরাধীরা তো সুযোগ নেবেই। নিচ্ছেও তাই। দীর্ঘ দিন রেলওয়েতে এধরনের অপরাধ ঘটে চললেও সরকার বা প্রশাসনের টনক নড়ছে না।
এমনিতেই ট্রেন নানা কারণে লোকসান গুনে থাকে। লোকসানের হাত থেকে রক্ষা পেতে যাত্রীসেবা না বাড়িয়ে রেলের যাত্রীভাড়া বাড়ানো হয়েছে। তার ওপর যাত্রীদের জান-মালের নিরাপত্তা না থাকলে রেলযাত্রীর সংখ্যা কমতে থাকবে। আতঙ্কগ্রস্ত যাত্রীরা ট্রেন পরিহার করবে। এতে ট্রেন আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই ট্রেনযাত্রীদের নিরাপদ-নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ রুট ও ট্রেনের প্রতিটি বগিতে কমপক্ষে দু’জন সশস্ত্র সদস্য নিয়োগ করতে হবে। এজন্য পুলিশ সদস্যদের আধুনিক অস্ত্র, ওয়ারলেস সেট ও লাইফজ্যাকেট সরবরাহ করতে হবে। বাড়াতে হবে পুলিশের সদস্য সংখ্যা। আপাতত পুলিশের সংকট থাকলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আনসার সদস্য ও র্যাব, বিডিআর থেকে জনবল আনা যেতে পারে। প্রতিটি বগিতে দু’জন করে সশস্ত্র পুলিশ থাকলে অপরাধীরা কিছুটা আতঙ্কিত থাকবে। তাছাড়া কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ওয়ারলেসের মাধ্যমে সংবাদ পেয়ে অন্যান্য বগির পুলিশ সদস্যরাও আক্রান্ত বগিতে পৌঁছাতে পারবে। তাছাড়া ওয়ারলেসের মাধ্যমে ট্রেনচালককে বিষয়টি অবহিত করলে দ্রুত ট্রেনের গতিরোধ করা যেতে পারে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় চলন্ত রেলে কোনো নিয়মকানুন মানা হয় না। ট্রেনের পরিচালক থেকে শুরু করে অ্যাটেন্ডেন্ট পর্যন্ত কেউ চলন্ত ট্রেনের নীতিমালা মানতে চান না বলে যাত্রীদের অভিযোগ আছে। বিশেষ করে বগিতে ওঠা-নামার দরজা বন্ধ রাখা হয় না। দরজা বন্ধ রাখলে যাত্রীদের ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়া কিছুটা কষ্টসাধ্য হয়। এসব বিষয় কঠোরভাবে মেনে চললে দুর্ঘটনা কমে আসবে।
খুলনা
