নামকরণে শিল্পবোধ

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:৫১
‘নামে কী-ই বা আসে যায়, গুণেই তোমার পরিচয়।’ অথবা ‘বৃক্ষ তোর নাম কী—ফলে পরিচয়।’ ছেলেবেলা থেকেই এ জাতীয় কথা আমরা গুরুজনদের মুখে শুনতে শুনতে বড় হয়ে উঠি। আর তাই কানা ছেলের নাম পদ্মলোচনই হোক আর সুদর্শনই হোক, তাতে আমরা কোনোদিনই মাথা ঘামাইনি। আমরা দেখে এসেছি, কোনো একটা স্থান বা ব্যক্তির নাম বস্তুগত কারণেই সবার মুখে মুখে সুপরিচিত হয়ে ওঠে। একটা সময়ে ব্যক্তি বা বস্তু বা স্থানবিশেষের মূল নাম হারিয়ে পারিপার্শ্বিক কারণে বা মানুষের প্রয়োজনগত কারণে পরিবর্তিত নামই বেশি আলোচিত হয়ে ওঠে। অর্থাত্ প্রয়োজনের কারণে মানুষের মন থেকে উত্থিত নামটাই অধিক গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। এখানে ‘প্রয়োজন’ শব্দটির একটু ব্যাখ্যা করার দরকার আছে বলে আমি মনে করি। ‘প্রয়োজন’ শব্দটি আপেক্ষিক ব্যাপার। মানুষ যখন নিজের ভোগের জন্য কোনো কিছুর দরকার মনে করে তখন সে বলে থাকে, ঐ বস্তুটা তার প্রয়োজন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রয়োজন বদলায়। মানুষের প্রথম প্রয়োজন তার মৌলিক চাহিদা যেমন অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ইত্যাদি। তারপর প্রয়োজন হয় শিক্ষা, ব্যক্তি স্বাধীনতা, ভোগ-বিলাসিতা ইত্যাদি। তাহলে দেখা যাচ্ছে, মৌলিক চাহিদা পূরণের সঙ্গে সঙ্গেই মানুষের প্রয়োজনের ধরন পালটে যাচ্ছে। মানুষ যেহেতু সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব, সেহেতু শুধু ক্ষুধা মিটলেই তার প্রয়োজন শেষ হয়ে যায় না। বরং বলা যেতে পারে তার প্রয়োজনের শুরু। অন্যান্য প্রাণীর ক্ষুধা মিটলেই তার আর চাওয়া-পাওয়ার কিছু থাকে না। মানুষের সঙ্গে সকল জীবের এখানেই তফাত। অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের চাহিদা মেটানোর পর মানুষ ভোগ-বিলাসিতা ও শিল্প-সৌন্দর্যের দিকে নজর দেয়া শুরু করে। সে ভালোমন্দের পার্থক্য বুঝতে চেষ্টা করে। তার মধ্যে মানবিকতা ও মূল্যবোধ জাগ্রত হয়। তার অন্তর্চক্ষু উন্মীলিত হয়। বলা হয়ে থাকে, ‘পুষ্পের পক্ষে পুষ্পত্ব যতটা সহজ, মানুষের পক্ষে মনুষ্যত্ব অর্জন ততটা সহজ নয়।’ মনুষ্যত্ব অর্জনের জন্য সাধনার প্রয়োজন। মৌলিক চাহিদা মেটানোর পর মানুষকে এই সাধনা করে যেতে হয় নিরন্তর। তাহলে দেখা যাচ্ছে, ক্ষুধার প্রয়োজনীয়তা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ হিসেবে সৌন্দর্যবোধের প্রয়োজনীয়তার গুরুত্বও কম নয়। বরং বলা যেতে পারে, অপেক্ষাকৃত বেশি। কারণ মানুষের মধ্যে রুচিবোধ ও মনুষ্যত্ববোধের বিকাশ না ঘটলে তার সঙ্গে অন্য কোনো জীবের পার্থক্য থাকে না। শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে এটা ভাবাটাও লজ্জার। ‘ডেমরা চৌরাস্তা’ নামে ঢাকায় একটা জায়গা আছে। আমি ঐ এলাকায় দীর্ঘদিন ছিলাম। অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করেছি, সেখানে রাস্তা আছে তিনটি। চতুর্থ রাস্তার কোনো অস্তিত্ব নেই। ‘তেরাস্তা’ নামটি শ্রুতিমধুর নয় বলেই হয়তো সেখানকার মানুষ ‘চৌরাস্তা’ নামটি মনেপ্রাণে গ্রহণ করেছে। ফলে ‘ডেমরা চৌরাস্তা’ নামটিই বহাল হয়ে গেছে। ঢাকার ‘সাতরাস্তা’ বাসস্টেশনটির নাম কে না জানে? কিন্তু আমি সেখানে সাত রাস্তার সন্ধান কোনোদিন পাইনি। পাঁচ রাস্তা বা ছয় রাস্তার নাম শোনার চেয়ে সাত রাস্তার নাম শুনতেই বেশি ভালো লাগে। এখানে বাস্তবতাকে ডিঙিয়ে শ্রুতিমাধুর্যই অগ্রাধিকার পেয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগরের একটি গ্রামের নাম ছিল ‘কুলিকুণ্ডা’। গ্রামের সুশিক্ষিত সচেতন মানুষেরা গ্রামটির নাম বদলে বর্তমান শ্রুতিমধুর ও অর্থবহ নাম রেখেছে ‘কুলিনকুণ্ডা’। ‘কুলিন’ শব্দের অর্থ ‘অভিজাত’; ‘সত্ বংশে জন্ম’ ইত্যাদি। কাজেই যারা প্রাজ্ঞ, শিক্ষিত, সজ্জন তাঁরা পূর্বের নামটির পরিবর্তে ‘কুলিনকুণ্ডা’ নামটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করবে— এটাই স্বাভাবিক। ‘কুলিনকুণ্ডা’ গ্রামের প্রাগ্রসর সজ্জন মানুষদের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। ঢাকার প্রাচীন নাম জাহাঙ্গীরনগর। মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামানুসারে এই নামকরণ করা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মোঘলদের রাজত্বও একসময়ে শেষ হয়ে যায়। এই শহরের মানুষ মন থেকে ‘জাহাঙ্গীরনগর’ নামটি মেনে নিতে পারেনি। সবুজে শ্যামলে ঢাকা এই শহরটিকে তারা ‘ঢাকা’ নামেই গ্রহণ করেছে। অর্থাত্ এখানেও বস্তুগত প্রয়োজন অপেক্ষা মানুষের নান্দনিক শিল্পসৌন্দর্যের প্রতি গভীর মমত্ববোধের পরিচয়ই মুখ্য হয়ে উঠেছে। শুদ্ধ উচ্চারণ ও সৌন্দর্যবোধের কারণে বিশ্বের অনেক স্থান ও দেশের নাম পরিবর্তনের উদাহরণও কম নয়। যেমন বার্মার আধুনিক নাম ‘মিয়ানমার’ ; বোম্বাইয়ের পরিবর্তিত নাম ‘মুম্বাই’ ; কোলকাতার পরিবর্তিত নাম ‘কলকাতা’ ইত্যাদি। আমরা লক্ষ্য করেছি যে, এইসব স্থানের মানুষ পরিবর্তিত নামগুলোকে বেশ সাদরেই গ্রহণ করেছে। সাহিত্যে নামকরণ আলাদা তাত্পর্য বহন করে। ক্যাভেন্ডিস বলেছেন, “A beautifull name is better than a lot of wealth.” অর্থাত্ একটি সুন্দর শিরোনাম অনেক ধন-সম্পদের চেয়েও উত্তম। সঠিক নামকরণের মধ্য দিয়েই প্রকটিত হয় গল্প বা উপন্যাস বা নাটকের মূল সুর বা তাত্পর্য । তাই বলা হয়ে থাকে, একটি রচনা যদি হয় পুষ্প তাহলে তার শিরোনাম হবে সেই পুষ্পের কুঁড়ি স্বরূপ। সাধারণত তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে একজন সাহিত্যিক তাঁর রচনার নামকরণ করে থাকেন। যেমন— ক.রচনার বিষয়বস্তু; খ.রচনার কেন্দ্রীয় চরিত্র; গ.রচনার নায়ক/নায়িকা। কোনো একটি রচনার নামকরণ কী হবে তা নির্ভর করে মূলত রচয়িতা কোন জিনিসটির ওপর অধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন তার ওপর। কথাটাকে এভাবেও বলা যায়, বিজ্ঞ পাঠকের অন্তরে তিনি যে জিনিসটি নাড়া দিতে চান সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েই তিনি নামকরণ নির্ধারণ করে থাকেন। ছোটগল্পের সার্থক স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথের অমর সৃষ্টি ‘ছুটি’ গল্পের দিকে এবার দৃষ্টি দেয়া যাক। গল্পের প্রধান চরিত্র কিশোর ফটিক গ্রামের স্বাধীন মুক্ত জীবন ত্যাগ করে শহরের বন্দী জীবনে প্রবেশ করে। কিন্তু স্নেহ-মমতাহীন নাগরিক পরিবেশে সে খাপ খাইয়ে চলতে পারেনি। কেবলই সে চেয়েছে মুক্তি। কার্তিক মাসে স্কুলে পুজার ছুটি। তাই নির্মম শহুরে পরিবেশ থেকে মুক্তির জন্যে তার অন্তর কেবলই আকুলি-বিকুলি করেছে সেই পরম আকাঙ্ক্ষিত ছুটির জন্য। কিন্তু ঘটনাক্রমে নির্মম নিয়তি তাকে দিয়েছে চিরকালের জন্য ‘ছুটি’। গল্পটির নাম ‘ফটিক’ বা ‘শহুরে কিশোর ফটিক’ বা ‘পরলোকে ফটিক’ ইত্যাদি দেয়া যেতো। কিন্তু তা ‘ছুটি’ নামটির মতো এতোটা অর্থবহ, হূদয়গ্রাহী ও তাত্পর্যপূর্ণ হতো কি? অপরাজেয় কথাশিল্পী শরত্চন্দ্রের ‘মহেশ’ গল্পে সমাজের উঁচু ও ধনিক শ্রেণির মানুষ কর্তৃক দরিদ্র ও নিচু শ্রেণির মানুষের নির্যাতিত হওয়ার জীবন্ত কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। মহেশ— দরিদ্র বর্গাচাষি গফুরের পালিত ষাঁড়, যে আটটি বছর গফুরকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেছে। কিন্তু পর পর দুই সন খরা ও অজন্মায় গফুর তাকে পেট পুরে খাওয়াতে না পেরে জমিদার শিবনারায়ণ বাবুর রোষানলে পতিত হয়। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত বিভ্রান্ত গফুর নিজের মেয়েকে আঘাত করার অপরাধে অসহায় অবলা জীব মহেশকে লাঙলের ফলা দিয়ে আঘাত করে। ফলে হতভাগ্য জীব মহেশের মৃত্যু ঘটে। সামান্য একটা বোবা প্রাণীও যে সাহিত্যের বিষয়বস্তু হয়ে পাঠককুলের মন কেড়ে নিতে পারে—তার প্রমাণ ‘মহেশ’ গল্পটি। আর তাই বিষয়বস্তু বিচারে গল্পটির ‘মহেশ’ নামকরণ শুধু প্রাসঙ্গিকই ছিল না, বরং বলা যেতে পারে, সেটা ছিল ‘অনিবার্য’ এবং ‘শিল্পসৌন্দর্যমণ্ডিত’। পরিশেষে বলা যেতে পারে, কোনো বিষয় বা বস্তুর নামকরণ জোর করে চাপিয়ে দেবার বিষয় নয়। জোর করে চাপিয়ে দেয়া নাম বেশিদিন টিকে থাকে না বা মানুষের অন্তরে গাঁথে না। প্রয়োজন বা সময়ের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে একটি নাম স্বাভাবিক নিয়মেই মানুষের অন্তরে গেঁথে যায়। মানুষ তার রুচিবোধ ও সৌন্দর্যবোধের কারণেই পুরনো নাম বদলে নতুন নাম গ্রহণ করে থাকে আর সৃজনশীল মানুষের কাছে সে নামটি ধীরে ধীরে ‘অনিবার্য’ হয়ে ওঠে। ঢাকা