‘ভাংচুর-অগ্নিসংযোগের সংস্কৃতি’ থেকে মুক্তি পেতে হলে রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:০৯
২০০২ সালের কথা। আমি তখন একটি জাতীয় দৈনিকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি। জহুরুল হক হলের সামনে একটি গাড়ির সামান্য ধাক্কায় রিকশারোহী এক ছাত্রী রাস্তায় পড়ে গিয়ে হাতে সামান্য আঘাত পায়। ব্যস, আর যায় কোথায়? হলের কতিপয় ছাত্র এমনভাবে এগিয়ে এলো যেন সিনেমার নায়িকাকে উদ্ধারের মতো বীরত্বপূর্ণ কাহিনী মঞ্চস্থ হবে। মহা উত্সাহে তারা তখনকার মূল্যে প্রায় ১৬-১৭ লাখ টাকার নতুন গাড়িটি প্রথমে ভাংচুর ও পরে আগুন ধরিয়ে দিল। ঘটনাস্থলে থাকা কতর্ব্যরত পুলিশের সহকারী কমিশনার (রমনা) ও পরিদর্শক দু’জনই বহু অনুরোধ করে ধ্বংসের হাত থেকে ছাত্রদের নিবৃত্ত করতে পারলেন না; বরং বাধা দিলে পুলিশের গাড়ি ও মোটরসাইকেল জ্বালিয়ে দেয়া হবে—এমন হুমকি দিল ছাত্ররা। ‘স্পর্শকাতর এলাকা’— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কৌশলগত কারণে পুলিশ কর্মকর্তারা ছাত্রদের ওপর বল প্রয়োগ করতে পারলেন না; বরং অসহায়ের মতো একটি মূল্যবান গাড়ি ভস্মীভূত হওয়ার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করলেন। তুচ্ছ কারণে ছাত্রদের এত বড় প্রতিক্রিয়াসহ আরও কিছু কারণে ওই পুলিশ কর্মকর্তারা ক্যাম্পাসে দায়িত্ব পালনের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বদলি হয়ে যান। আমাদের দেশে গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত যান ভাংচুরের ঘটনা এখন এতটাই ‘গা সহা’ হয়ে গেছে যে, বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি—হরতাল, অবরোধ, বিক্ষোভের সঙ্গে গাড়ি ভাংচুর-অগ্নিসংযোগ না হলে কর্মসূচিটাই কেমন যেন ‘ফ্লপ’ করে, সাদামাটা বা মরা মরা লাগে! ২০০০ সালে একটি ছাত্র সংগঠনের মিছিলে পুলিশ বাধা দিলে নেতাকর্মীরা কয়েকটি (বড়জোর ৮/১০টি) গাড়ি ভাংচুর করে। পরে দেখলাম ওই ছাত্র সংগঠনের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা মূল দলের একজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে ফোন করে জানালেন, তার নেতাকর্মীরা শতাধিক গাড়ি ভাংচুর করেছে। চূর্ণ-জ্বলন-বিনাশের সংস্কৃতি এমন পর্যায়ে এসেছে, যত গাড়ি ভাংচুর করা যাবে, ততই একটি কর্মসূচি সফলতার দাবিদার হবে, হাইকমান্ডের কাছে সংগঠনটির কৃতিত্বের পাল্লা তত ভারী হবে। একযুগ পরও কি এ পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়েছে? গত মাসের কয়েকটি চিত্র হচ্ছে: সমাবেশের অনুমতি না পাওয়ায় ৩১ জানুয়ারি ডাকা হরতালের দিন সারাদেশে ৬৭টি যান ভাংচুর ও ১৩টিতে অগ্নিসংযোগ করে জায়ামাত ও শিবিরের কর্মীরা। ২৯ তারিখ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ-ছাত্রদল সংঘর্ষের ঘটনায় বাস-ট্রাকসহ ১০টি যান ভাংচুর করা হয়। এর আগে ২৮ জানুয়ারি রাজধানীতে দুই শতাধিক গাড়ি ভাংচুর করেছে জামায়াত-শিবির কর্মীরা; আগুন ধরিয়ে দিয়েছে কয়েকটি গাড়িতে। ৯ ডিসেম্বর বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের অবরোধ চলাকালে সারাদেশে কয়েকশ যানবাহন ভাংচুর ও শতাধিক গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। আবার রাজনৈতিক কর্মসূচি ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনার কারণেও সমানতালে চলে গাড়ি ভাঙার মচ্ছব। আশুলিয়ার ঘোষবাগ এলাকায় ৭ জানুয়ারি একটি বাসের ধাক্কায় এক গার্মেন্টস শ্রমিক আহত হলে কমপক্ষে ৩০টি গাড়ি ভাংচুর ও একটি ট্রাকে আগুন দেয়া হয়। ২০১১ সালের ৫ মার্চ মতিঝিল এলাকায় বাস শ্রমিকদের সঙ্গে সংঘর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র নিহত হলে পরদিন ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় শতাধিক গাড়ি ভাংচুর ও একটি বাস জ্বালিয়ে দেয় সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের ছাত্ররা। ২০১০ সালের ২৫ নভেম্বর ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের এক কর্মী প্রাইভেট কারের ধাক্কায় আহত হওয়ার জের ধরে ছাত্রলীগ কর্মীরা শুধু গাড়িটি পুড়িয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, ২৫টি গাড়ি ভাংচুর করে ও আরো একটি প্রাইভেট কার পুড়িয়ে দেয়। ২০০৪ সালের ৪ জুন আওয়ামী লীগের ডাকা হরতালের আগের রাতে শাহবাগে বিআরটিসির দোতলা বাসে আগুন জ্বালিয়ে ৯ জন জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ হওয়ার নির্মম ঘটনা মানুষ কি ভুলতে পেরেছে? এছাড়া বিচিত্র সব কারণেও হরদম ভাংচুর আর অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে আমাদের দেশে। গত ৬ ডিসেম্বর পুলিশের বড় কর্তার (ডিআইজি) আগমন আগে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা কমপক্ষে ১০টি সিএনজি ও গাড়ি ভাংচুর করে পুলিশ। ২০১০ সালের জুলাই মাসে আর্জেন্টিনার কাছে ব্রাজিল হেরে যাওয়ায় পল্লবীতে যানবাহন ভাংচুর করেছে ব্রাজিল সমর্থকরা। কি বিচিত্র আমরা! কিছু একটা হলেই কেন ধ্বংসলীলায় মেতে ওঠে দেশের মানুষ? জোট সরকারের আমলে সারাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থানের সময় ‘সেন্টার ফর ডেমোক্রেসি’ আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় সুশীল সমাজ ও রাজনীতিবিদরা যুবকদের জঙ্গিবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার পেছনে ধনী-গরিব বৈষম্যকে একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। ঠিক তেমনি হরতাল-অবরোধ ছাড়াও কারণে-অকারণে যানবাহন ভাংচুর আর দহনের বিনাশী মহোত্সবে মেতে ওঠার পেছনে শ্রেণি বৈষম্যের কারণে বিত্তবানদের প্রতি সৃষ্ট বিদ্বেষপ্রসূত ঘৃণা ও অসহিষ্ণুতা মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে। গরিবের রক্ত চুষে ও কালোবাজারি করে সমাজের একটি অংশ সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলছে এটা ঠিক; পাশাপাশি এটাও মনে রাখতে হবে, অনেকেই মেধা-শ্রমের বিনিময়ে উপার্জিত অর্থ দিয়েই একটি গাড়ি কিনে। অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার রেন্ট-এ-কার কিংবা গণপরিবহন খাতে বিনিয়োগ করে জীবিকা নির্বাহ করে। ড্রাইভিং পেশায় জড়িত আছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। তাই একশ্রেণির মানুষের রুদ্ররোষ আর ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ আসলে অনেক নিরীহ নাগরিকের সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে। এছাড়া, আমাদের কারো কারো মধ্যে কেন জানি ধ্বংস কিংবা বিনষ্ট করার স্বভাবজাত প্রবণতা বিদ্যমান। ‘জ্বালো জ্বালো আগুন জ্বালো’— আজো দেশের রাজনীতিতে একটি জনপ্রিয় শ্লোগান। ধ্বংসাত্মক কাজ কেউ একজন শুরু করলে তার পেছনে শত শত মানুষ জড়ো হতে সময় লাগে না; কিন্তু বাধা দেয়ার জন্য দু’একজনও পাওয়া যায় না! এই তো ১৯ জানুয়ারি গাজীপুরে ছেলেধরা সন্দেহে একজন বুদ্ধি প্রতিবন্ধী নারীকে পুলিশের সামনে গণপিটুনিতে হত্যা করা হলো। এর দু’দিন পর আবার নিছক গুজবের ভিত্তিতে ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে দুই ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করেছে জনতা। এমনকি তারা একজনের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়! আমিনবাজারে ছয় ছাত্র হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা কেউ কি সহজে ভুলতে পারবে? তাই ‘ভাংচুর-অগ্নিসংযোগের সংস্কৃতি’ থেকে মুক্তি পেতে হলে, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দিতে হলে দেশের রাজনীতিবিদদের নতুন করে ভাবতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্বাধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রামের সূতিকাগার। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই বহুলাংশে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। এদের হাতে মানুষের সম্পদের ক্ষতিসাধন কতটা শোভা পায়? ক্যাম্পাসে সড়ক দুর্ঘটনায় কোনো শিক্ষার্থী মারা গেলে হয়তো শিক্ষার্থীরা আবেগতাড়িত হয়ে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যায়; কিন্তু তুচ্ছ বিষয়ে ধ্বংসলীলায় মেতে ওঠে কেন নিজেদের গায়ে কালিমা লেপন করবে জাতির ভবিষ্যত্ কাণ্ডারীরা? আরেকটি বিষয় হলো, সাংবাদিকতার একাডেমিক আলোচনায় একটি কথা বলা হয়: খারাপ সংবাদই হচ্ছে ভালো সংবাদ। রাজনৈতিক দলের কোনো কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হলে তা গণমাধ্যমে যেভাবে প্রচার করা হয়, ভাংচুর-অগ্নিসংযোগ করা হলে তাতে নতুন নতুন সংবাদ উপাদান যোগ হওয়ায় তা আরো ফলাও করে, ভালো ট্রিটমেন্ট দিয়ে প্রচার করা হয়। এ কারণে গণমাধ্যমে স্থান পাওয়ার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো স্বপ্রণোদিত হয়ে ‘ভাঙো-জ্বালাও’ নামে নৈরাজ্যের জঘন্য খেলায় মেতে ওঠে। এক সময় দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষা পেছানোর আন্দোলন একটি নিয়মে পরিণত হয়েছিল। পরবর্তীতে কোনো কোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান পরীক্ষা পেছানোর আন্দোলনকে নিরুত্সাহিত করার জন্য অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করার সিদ্ধান্ত নেয়। যার ফলে পরীক্ষা পেছানোর অনেক আন্দোলই দানা বাঁধতে পারেনি। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব হিসেবে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা পেছানোর মানসিকতা বহুলাংশে লোপ পাওয়ার পেছনে গণমাধ্যমের এ ভূমিকা অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই চূর্ণ-বিচূর্ণ আর দহন-জ্বলনের মতো বিধ্বংসী ঘটনা রোধ করতে এ সংক্রান্ত সংবাদকে গুরুত্বসহকারে প্রচার না করার সিদ্ধান্ত গণমাধ্যম ব্যবস্থাপকরা ভেবে দেখবেন— এ প্রত্যাশা করি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলো তাদের দাবি-দাওয়া পূরণে হরতাল-অবরোধ-বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করতে পারে; কিন্তু ভাংচুর-অগ্নিসংযোগের নামে সাধারণ নাগরিকদের সম্পদনাশের অধিকার কারো নেই। রাজনীতিতে একটি বহুল প্রচলিত কথা হচ্ছে: রাজনীতি হচ্ছে জনগণের জন্য। যে রাজনীতি জনগণের জানমালের ক্ষতি করে তা কখনো জনগণের জন্য হতে পারে না। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, দেশের রাজনীতিতে কোনো ইস্যুতে প্রধান দুই দল এক হতে পারে না। ঐকমত্যে আসা তো দূরে থাক, অভিন্ন বক্তব্যও পাওয়া যায় না। কোনো দল ডানদিকে গেলে আরেক দল ভুল হোক বা শুদ্ধ হোক বামদিকে হাঁটবে— এটাই যেন অনিবার্য সত্য। কিন্তু জনগণের কথা বলে যারা রাজনীতি করেন, তারা কি জনগণের জানমালের ক্ষতি হয়—অন্তত এ ধরনের ‘ভাংচুর-অগ্নিসংযোগের সংস্কৃতি’ থেকে বেরিয়ে আসার ব্যাপারে একমত হবেন— এতটুকু প্রত্যাশা কি আমরা করতে পারি না? ++লেখক : সহকারী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন