মহাসমাবেশ শুরু হওয়ার কথা ছিল বিকাল তিনটায়। কিন্তু তার অনেক আগেই শাহবাগ এলাকা মানুষে মানুষে সয়লাব। লাখো মুষ্টিবদ্ধ হাত মুহুমুর্হু ঝলসে উঠছিল অপরাহ্নের সোনালি রোদে। কণ্ঠে কণ্ঠে এক আওয়াজ ‘রাজাকারের ফাঁসি চাই।’ শাহবাগ চত্বরে তারুণ্যের দ্বীপ জ্বালানো হয়েছিল গত মঙ্গলবার। গতকাল শুক্রবার সেই আলোর প্লাবনেই ভেসে গেল গোটা ঢাকা নগরী। মাত্র চার দিনের ব্যবধানে পাল্টে গেল রাজধানী, পাল্টে গেল সারাদেশ। যেন আচমকা ঘুম ভেঙ্গে জেগে ওটা একাত্তরের বাংলা। কণ্ঠে কণ্ঠে সেই বজ্র নির্ঘোষ ‘জয় বাংলা’। নতুন করে আত্মপরিচয় ঘোষণা ‘তোমার আমার ঠিকানা- পদ্মা মেঘনা যমুনা’। রাজাকারের ফাঁসির দাবির অছিলায় যেন বাংলা মায়ের কাছে সন্তানের ফিরে আসা। বায়ান্নতে, ঊনসত্তরে, একাত্তরে, দুই হাজার তেরোতে- এভাবে মায়ের কাছে বারবার। যতবারই বাঙ্গালি তার আপন ঠিকানায় ফিরতে চেয়েছে ততবারই সে ফিরেছে বিজয়ীর বেশে। এবারও উদ্দীপ্ত তারুণ্যের দৃপ্ত অঙ্গীকার প্রতিধ্বনিত হয়েছে শাহবাগ চত্বরে ‘দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরব না।’
মুখে স্লোগান, চোখে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দেয়ার পর দেশের তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনার যে আগুন জ্বেলেছে সে আগুন ছড়িয়ে গেছে সবখানে।
শাহবাগে গতকাল শুক্রবার দেশের তরুণ প্রজন্ম লাখো মানুষ নিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার শপথ নিলেন। অঙ্গীকার করলেন, ঐক্যবদ্ধ হয়ে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার। নতুনরা যে চেতনার কেতন উড়ালেন, তা উড়ছে সারা বাংলাদেশে। আর তরুণদের এ অঙ্গীকারে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ বিনির্মাণে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন মুক্তিযোদ্ধাসহ দেশের বিশিষ্টজনেরা। কাদের মোল্লাসহ সকল যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি এবং জামায়াত-শিবিরসহ সব ধরনের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি আন্দোলনরত তরুণদের। ট্রাইব্যুনালের আইন সংশোধন করে রায়ের বিষয়ে বাদী-বিবাদী উভয়পক্ষের আপিলের সমসুযোগ রাখার দাবি জানিয়েছেন তারা। তারা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত গণজাগরণ মঞ্চে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন।
টানা চতুর্থ দিনের মতো গতকালও সারাদিন ও রাতে শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত রাখে আন্দোলনরত তরুণরা। পূর্ব নির্ধারিত ঘোষণা অনুযায়ী গতকাল বিকাল তিনটায় শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চে শুরু হয় মহাসমাবেশ। শাহবাগ মোড়ে একটি ছোট ট্রাকে মূলমঞ্চ তৈরি করা হয়। অবস্থান কর্মসূচি ও সমাবেশে যোগ দিতে সকাল থেকেই শাহবাগে জড়ো হতে শুরু করেন নানা পেশা ও বয়সের মানুষ। ‘চরমপত্র’ পাঠের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মহাসমাবেশ। ‘চরমপত্র’ পাঠ করেন ব্লগার শহীদুল ইসলাম রাজু। এরপর সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীতে অংশ নেন উপস্থিত লাখো মানুষ। কিছুক্ষণের মধ্যে শাহবাগ থেকে দোয়েল চত্বর, বাংলামোটর, কাঁটাবন ও মত্স্যভবন পর্যন্ত বিস্তৃত হয় সমাবেশ এলাকা। এর বাইরেও পার্শ্ববর্তী এলাকায় দাঁড়িয়ে সমাবেশে একাত্মতা জানান হাজার হাজার মানুষ। মূলমঞ্চে মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর সহযোগিতায় সমাবেশে উপস্থাপনা করেন ব্লগার অঞ্জন রায়। অবস্থান কর্মসূচিতে এবং সমাবেশে নিয়মিত বিরতিতে লাখো কণ্ঠ স্লোগান তুলেন- ‘মুক্তিযোদ্ধাদের বাংলায়, রাজাকারের ঠাঁই নাই,’ ফাঁসি, ফাঁসি, ফাঁসি চাই, কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই’, ‘জামায়াত শিবিরের রাজনীতি’ আইন করে নিষিদ্ধ কর’। সমাবেশের মূল মঞ্চে এবং খণ্ড খণ্ড হয়ে তরুণরা সারাদিনমান স্লোগান দেন ‘তুই রাজাকার, তুই রাজাকার’। গণস্বাক্ষর, মোমবাতি প্রজ্বলন, মশাল মিছিল, বাদ্য বাজিয়ে আন্দোলন সারাদিন-রাত জাগিয়ে রাখেন তরুণরা।
তরুণ প্রজন্মের মুক্তিযুদ্ধে অগ্রজদের সালাম ও সংহতি
বিকালে মহাসমাবেশে বক্তব্য রাখেন মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্ত্রী-সন্তান, শিক্ষাবিদসহ দেশের বিশিষ্টজনেরা। যুদ্ধাপরাধের বিচার দাবিতে তরুণদের আন্দোলনে অভিভূত ও আনন্দিত অগ্রজ-বিশিষ্টজনরা বলেন, এ আন্দোলন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা শক্তিশালী অবস্থান প্রমাণ করে। তরুণদের শক্তি প্রমাণ করে। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ হয়ে উঠেছে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বাংলাদেশ গড়ার বাতিঘরে।
সমাবেশে সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের সভাপতি কে এম শফিউল্লাহ বীরউত্তম বলেন, তরুণদের এ আন্দোলন আমাদের নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের নতুন রূপ দেখলাম আজ। মুক্তিযোদ্ধাদের বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে আর কেউ রুধতে পারবে না।
তিনি বলেন, জামায়াতের যে নেতারা দেশে গৃহযুদ্ধের হুমকি দিয়েছে, তাদের নাকে খত দিয়ে ক্ষমা চাইতে হবে। নইলে পাকিস্তানে চলে যেতে হবে।
কে এম শফিউল্লাহ বলেন, দুর্বল সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করার কারণে নাকি কাদের মোল্লার সব অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা যায়নি। এটি কিভাবে হয়? মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গেরিলা শহিদুল হক মামা কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন কাদেরের কুকীর্তি। সাক্ষ্য দিয়েছেন, শত শত খুন করেছে কাদের মোল্লা। তিনি প্রশ্ন রাখেন, আর কত খুন করলে ফাঁসির রায় দেয়া যায়?
লেখক ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল তরুণদের উদ্দেশে বলেন, শাহবাগে আন্দোলনরতরা তরুণ প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধা। ৩০ লাখ মুক্তিযোদ্ধা আকাশ থেকে তোমাদের দিকে তাকিয়ে আনন্দে হাসছেন। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তোমাদের দিকে তাকিয়ে হাসছেন। তাঁদের আত্মা আজ শান্তি পেয়েছে। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের যে অসমাপ্ত কাজ তাঁরা রেখে গিয়েছিলেন, তোমরা তরুণরা সেই কাজ সমাপ্ত করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছো। আমি নিশ্চিত, এ দায়িত্ব তোমরা পালন করবে। তোমাদের রুখে দেয়ার সাধ্য কারো নাই।
জাফর ইকবাল বলেন, আমি শুধু জানতাম এই প্রজন্মের তরুণেরা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়া ও তাতে লাইক দেয়ার কাজটাই জানে। আমার সেই ভুল ভেঙে গেছে। তারা প্রয়োজনে মাঠেও নামতে পারে। যখন সারা দেশে কেউ রাজাকারের শব্দটিও মুখে আনতে পারত না, তখন হুমায়ূন আহমেদ টিয়া পাখির মুখ দিয়ে বলিয়েছিলেন ‘তুই রাজাকার’। সেই রাজাকারের ফাঁসির দাবিতে তোমরা মাঠে নেমেছ, আন্দোলন করছ। তোমাদের এই লড়াই দেখে প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদও আকাশ থেকে হাসছেন।
তিনি তরুণদের সাথে নিয়ে স্লোগান তোলেন, ‘ক তে কাদের মোল্লা- তুই রাজাকার, তুই রাজাকার’, ‘ন তে নিজামী- তুই রাজাকার, তুই রাজাকার’, গ তে গোলাম আযম- তুই রাজাকার, তুই রাজাকার’।
মহাসমাবেশে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশকে ফিরিয়ে আনার নতুন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের যে অপরাধ, তাতে তাদের ফাঁসি দিলেও কম হয়ে যায়। কিন্তু ফাঁসি যেহেতু সর্বোচ্চ শাস্তি তাই এটাই দিতে হবে। তাদের সাথে আপস করে যারা রাজনীতি করে, যুদ্ধাপরাধীদের যারা রক্ষা করতে চায়, তাদের তিনি সেই অবস্থান থেকে বের হয়ে আসার আহ্বান জানান। কেননা যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলে তিনি ঘোষণা দেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, সারাদেশে জামায়াত-শিবির যে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে তার ছবি আছে। সেই ছবিগুলো দেখে দেখে তাদের গ্রেফতার করতে হবে। ফাঁসির রায় দিতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রয়োজনে নতুন আইন করে আপিলের সুযোগ দিয়ে তাদের ফাঁসি বাস্তবায়ন করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আআমস আরেফিন সিদ্দিক বলেন, আমি আজ এখানে বক্তব্য দিতে আসিনি। এসেছি ছাত্র ও যুবসমাজের সাথে সংহতি প্রকাশ করতে। এসেছি যুদ্ধাপরাধী ও রাজাকারদের বিচারের দাবি নিয়ে। যুদ্ধাপরাধীমুক্ত দেশ গড়ার সময় এসেছ। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, এই দাবি এখন ১৬ কোটি মানুষের। যে রায় ঘোষণা করা হয়েছে তাতে গোটা জাতি ক্ষুব্ধ। রায়টি পুনর্বিবেচনা করা হোক।
সাংবাদিক কামাল লোহানী বলেন, এখন যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে আন্দোলন কেবল শাহবাগ স্কয়ারেই সীমিত নেই। গণজাগরণ মঞ্চ জাগিয়ে দিয়েছে সারা বাংলাদেশকে। এই আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। আবার ’৭১ এসেছে। সেই ’৭১ এর সাথে এই ’৭১-এর পার্থক্য হলো- এবার আমরা নবীনদের সাথে পেয়েছি।
ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা হাসান ইমাম বলেন, আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি। দেশকে এগিয়ে নিয়ে গেছি। এখন তরুণদের দায়িত্ব। তিনি উপস্থিত ছাত্র ও যুবসমাজকে উদ্দেশ করে বলেন, আমরা এতো দিন দায়িত্ব পালন করেছি। আজ তোমাদের হাতে দায়িত্ব তুলে দিলাম।
তিনি বলেন, রাজাকাররা আমাদের কেউ নয়, তারা এই দেশের কেউ নয়। কারণ তাদের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেই রায় হয়ে গেছে।
লেখক আনিসুল হক বলেন, ৫২তে তরুণরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করলে আজকে আমরা বাংলা ভাষা পেতাম না। ট্রাইব্যুনালের এ রায়ের বিরুদ্ধে তরুণরা মাঠে না নামলে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে আজ সারা দেশ জেগে উঠত না।
সমাবেশে সংহতি জানিয়ে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ক্যাপ্টেন এবি তাজুল ইসলাম এমপি, মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম, সেক্টর কমান্ডার আবু ওসমান চৌধুরী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্ত, তারানা হালিম এমপি, তেল-গ্যাস, বিদ্যুত্ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, শিরিন আখতার, অভিনেত্রী বিপাশা হায়াত, কর্মজীবী নারীর নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া রফিক বেবী, নাট্যজন ঝুনা চৌধুরী।
যুদ্ধাপরাধীমুক্ত দেশ গড়ার আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার শপথ
মহাসমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ব্লগার এন্ড অনলাইন এক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কের আহবায়ক ডা. ইমরান এইচ সরকার। এ সময় তিনি বলেন, জামায়াত-শিবির ও তাদের তাঁবেদার ও সহযোগীদের আইন করে নিষিদ্ধ করতে হবে। আইন পরিবর্তন করে সকল যুদ্ধাপরাধীকে ফাঁসি দিতে হবে। রাজাকার-আলবদরদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িকভাবে বয়কট করতে হবে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে যেসব ঘৃণ্য অপরাধী হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও জঘন্য অপরাধ করেছে, তাদের ফাঁসির রায় না হওয়া পর্যন্ত টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবো।
তিনি এ সময় তিনটি দাবি উল্লেখ করে বলেন, ট্রাইব্যুনালের আইন সংশোধন করে রায়ের বিষয়ে বাদী-বিবাদী উভয়পক্ষের আপিলের সমসুযোগ রাখতে হবে। জামায়াত-শিবিরসহ সকল ধরনের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। সকল যুদ্ধাপরাধীকে আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে। এ সময় তিনি উপস্থিত জনতাকে শপথ পাঠ করান। দুই হাত উপরে তুলে জনতাও শপথ গ্রহণ করেন।
আশায় বুক বেঁধেছেন শহীদদের স্বজনরা
সমাবেশে সংহতি জানাতে গতকাল এসেছিলেন মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্ত্রী, সন্তান ও আত্মীয়রা। তরুণদের এ আন্দোলন তাদের হতাশা দূর করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছে বলে তারা অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেছেন।
বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের স্ত্রী মিলি রহমান বলেন, আজ পুরো বাঙালি জাতি আবার জাগ্রত হয়েছে। তিনি তরুণদের উদ্দেশে বলেন, তোমরা ’৭১ দেখোনি। আমি বলছি, এখানে এসে দেখে নাও, এটা্ই ’৭১। আমরা ’৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে তোমাদের নতুন দেশ দিয়েছি। এবার তোমাদের দায়িত্ব। তোমরা এই দেশকে রাজাকারমুক্ত করবে।
শহীদ আলতাফ মাহমুদের মেয়ে শাওন বলেন, রাজাকারদের ফাঁসি হবেই। এ দেশের মাটিতে তাদের স্থান হবে না। তারুণ্যের জয়গান রাজাকার-আলবদরদের দেশ থেকে দূর করবেই।
নতুন দেশ গড়ার শপথ
মহাসমাবেশে দেশের বিভিন্ন যুব ও ছাত্র সংগঠনের নেতারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। আওয়ামী যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন করছি। কিন্তু এই বিচার করতে হবে রাষ্ট্র ও বিচারকদের। কাদের মোল্লাসহ সকল যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির ব্যবস্থা করতে হবে রাষ্ট্রকেই। শিবির নব্য রাজাকার। এদেরকে প্রতিহত করতে হবে।
যুব ইউনিয়নের সভাপতি কাজী রতন বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির জন্য ’৭১ সাল থেকে মানুষ অপেক্ষা করে আছে। কিন্তু কাদের মোল্লার ফাঁসির ঘোষণা না দিয়ে সেই আশা ভঙ্গ করা হয়েছে। তিনি বলেন, কেবল কয়েকজনকে যুদ্ধাপরাধী ঘোষণা করলে হবে না, জামায়াত-শিবিরকে আইন করে নিষিদ্ধ করতে হবে। ’৭২-এর সংবিধানের মাধ্যমে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বন্ধ করে দেয়া হয়েছিলো কিন্তু পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আবার তাদের বৈধতা দেয়া হয়। তিনি জামায়াতের সকল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে তা রাষ্ট্রায়ত্তকরণের দাবি জানান।
জাতীয় যুব ঐক্যের সহ-সভাপতি পুলক ঘটক বলেন, জামায়াত-শিবিরের সাথে কোন ধরনের আঁতাত মেনে নেয়া হবে না। জামায়াত মনে করেছে, পুলিশের ওপর চোরাগুপ্তা হামলা চালিয়ে শক্তি প্রদর্শন করবে। কিন্তু তা হবে না। যেখানেই তাদের পাওয়া যাবে সেখানেই তাদের প্রতিহত করা হবে।
ছাত্রলীগ সভাপতি এইচএম বদিউজ্জামান সোহাগ বলেন, আজ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে তৈরি হয়েছে বিশাল জনসমুদ্র। সকলেই এখানে কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে একাত্ম হয়েছি। ফাঁসির রায় নিয়েই আমরা ঘরে যাবো।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, আন্তর্জাতিক অনেক মিডিয়া এই আন্দোলন নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। বলা হচ্ছে এ আন্দোলন ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, আমরা পরিষ্কারভাবে বলে দিতে চাই আমাদের এই আন্দোলন আত্মত্যাগের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবো। তিনি জামায়াত-শিবিরকে সামাজিকভাবে বর্জনের জন্য গণজাগরণ সৃষ্টির আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ ছাত্রলীগের (জাসদ) সভাপতি হোসাইন আহমেদ তফছির বলেন, আমরা বাঙালি। আমাদের ঠিকানা এখন শাহবাগ স্কয়ার। কাদের মোল্লাসহ যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি না হওয়া পর্যন্ত আমরা ঘরে ফিরে যাবো না। তিনি বলেন, এখন থেকে যেখানেই জামায়াত-শিবির সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হাসান তারেক বলেন, স্বাধীনতার স্বপক্ষের কেউ ইসলামী ব্যাংক, ফোকাস ও রেটিনা কোচিং সেন্টারে যাবে না। যেখানেই জামায়াত শিবিরকে পাওয়া যাবে সেখানেই তাদের ধোলাই দিতে হবে। স্বাধীনতা বিরোধীরা পুলিশের ওপর হামলা ও তাণ্ডব চালাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনী যদি তাদের সাথে না পারে তাহলে তাদের উচিত চুড়ি পরে ঘরে বসে থাকা। তিনি প্রেসক্লাব থেকে আব্দুল কাদের মোল্লা ও কামারুজ্জামানসহ জামায়াত নেতাদের সদস্যপদ বাতিল করার দাবি জানান।
সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি বাপ্পাদিত্য বসু, ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি সাইফুজ্জামান সাকন, বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি আবদুর রউফ, ছাত্র সংহতির আহবায়ক রাশেদুল ইসলাম প্রমুখ।
দাবি আদায়ে গতকাল রাত পর্যন্ত নানা কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে আন্দোলনরতরা শাহবাগে অবস্থান অব্যাহত রাখেন। যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি ঘৃণা জানিয়ে বিকালে প্রায় দুইশ’ তরুণী ঝাড়ু মিছিল করে। ফ্রি মেডিক্যাল চিকিত্সা দিচ্ছেন বিভিন্ন সেবা সংস্থা। তরুণদের দাবির সমর্থনে দুপুরে মিছিল করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষক। সড়কে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে গণস্বাক্ষর গ্রহণ করেন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কমান্ড কাউন্সিল। অন্তত ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শাহবাগে এ অবস্থান কর্মসূচি চলবে বলে আন্দোলনরত একাধিক সূত্র জানিয়েছে। তবে এর মধ্যে দাবি বাস্তবায়ন না হলে আরো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানা গেছে।
