বাংলাদেশের প্রাণ যেন জাগিয়া উঠিয়াছে শাহবাগে। অগ্নস্ফুিলিঙ্গের মতো ফুটিয়া উঠিয়াছে তাহার অপরূপ আভা। ইতিমধ্যে সেই আগুনের পরশমণি ছড়াইয়া পড়িয়াছে দেশের আনাচে-কানাচে। ইহা এক অন্যরকম আগুন। এই আগুন ধ্বংসের নয়, সৃষ্টির। এই আগুনের জাদুকরী স্পর্শে হতাশাক্লিষ্ট নতজানু মানুষ জাগিয়া ওঠে। একতাবদ্ধ হয়। রুখিয়া দাঁড়ায় সর্বপ্রকার অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে। আমরা দেখিয়াছি যে, যখনই জাতি পথ হারাইয়া ফেলিয়াছে, নিমজ্জিত হইয়াছে আত্মঘাতী হানাহানি ও সংকীর্ণ স্বার্থপরতার পঙ্কে; তখনই স্বত:স্ফূর্তভাবে জ্বলিয়া উঠিয়াছে চেতনার এই অনির্বাণ মশাল। ব্যতিক্রমহীনভাবে তারুণ্যই এই মশাল জ্বালাইয়াছে বার বার। বায়ান্ন, ঊনসত্তর, একাত্তর এবং নব্বইয়ের গণআন্দোলনসহ আমাদের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের সংগ্রামের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকে স্বর্ণাক্ষরে খোদিত হইয়া আছে তাহার উজ্জ্বল স্বাক্ষর। এমনকী ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী শ্বাসরুদ্ধকর দিনগুলিতেও তাহারাই প্রথম প্রতিবাদের মশাল প্রজ্বলিত করিয়াছিল। এইবারও তাহার ব্যতিক্রম ঘটে নাই।
আগুনঝরা ফাগুন আসিতে এখনো আরও কয়েকদিন বাকি। কিন্তু আমাদের অপরাজেয় তারুণ্য ইতিমধ্যেই পলাশ-কৃষ্ণচূড়ার মতো ফুটিয়া উঠিয়াছে। নিজেদের বাঁধভাঙা চেতনার রঙে রঙিন করিয়া তুলিয়াছে শাহবাগ চত্বর। শুধু শাহবাগই বা বলি কেন—সারা দেশের চিত্রও ভিন্ন নহে। এই তরুণদের কেহ ডাকিয়া বা ভাড়া করিয়া আনে নাই। প্রাণের তাগিদে তাহারা নিজেরাই ছুটিয়া আসিয়াছে। দলে দলে জড়ো হইয়াছে শাহবাগ চত্বরে। কী সেই প্রাণের টান? তাহারা মানবতাবিরোধী অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চায়। কিন্তু ইতিমধ্যে বিচারের যেই রায় হইয়াছে তাহাতে তাহারা সন্তুষ্ট হইতে পারে নাই। তবে বুঝিতে অসুবিধা হয় না যে, ইহাই তাহাদের অসন্তুষ্টির একমাত্র কারণ নহে। বস্তুত দীর্ঘদিন যাবত্ রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিকারহীনভাবে নানা অনিয়ম, অসততা ও নীতিহীনতা দেখিতে দেখিতে তাহারা ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছে। তাহাদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকিয়া গিয়াছে। আমাদের জাতীয় কবি নজরুলের ভাষায় বলিতে হয় যে, তাহারা মূলত ‘দেখিয়া-শুনিয়া ক্ষেপিয়া’ গিয়াছে। শাহবাগে তাহারই বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়াছে মাত্র।
ইহাতে ভীত হইবার কিছু নাই। তরুণরাই হইল সমাজ ও সভ্যতার মূল চালিকাশক্তি। যুগে যুগে দেশে দেশে তাহারাই অচলায়তন ভাঙিয়া অগ্রগতির পথ নির্মাণ করিয়াছেন। আমাদের যাহা কিছু মহত্ অর্জন তাহার পিছনেও তারুণ্যের অপরিমেয় অবদান কাহারো অজানা নহে। তাহারাই হাসিমুখে জীবন উত্সর্গ করিয়া সকল অসম্ভবকে সম্ভব করিয়া তুলিয়াছে। আমাদের দুই মহান বাঙালি কবি উদাত্ত কণ্ঠে বার বার এই তারুণ্যকেই আবাহন করিয়াছেন। নজরুলের যেই ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি শতাব্দীব্যাপী এই জনপদের মানুষের চেতনাকে আলোড়িত করিয়া চলিয়াছে তাহা মূলত তারুণ্যেরই জয়গান মাত্র। ‘বল বীর, চির উন্নত মম শির’—তাঁহার প্রবাদতুল্য এই বাণীতেও ফুটিয়া উঠিয়াছে তারুণ্যেরই চিরায়ত রূপ। রবীন্দ্রনাথের তারুণ্য-বন্দনাও ভিন্ন নহে। প্রসঙ্গত, তাঁহার বহুল-উদ্ধৃত পংক্তিগুলি স্মরণ করা যাইতে পারে। তিনি লিখিয়াছেন: ‘ওরে সবুজ ওরে অবুঝ ওরে আমার কাঁচা/আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।’ রবীন্দ্রনাথের ভাষায় যাহাদের ‘চক্ষু-কর্ণ দুইটি ডানায় ঢাকা’ তাহারাই হইলেন ‘আধমরা’। ইহার বিপরীতে তরুণরা হইল ‘জীবন্ত’। তিনি তরুণদের তুলনা করিয়াছেন ঝড়ের মেঘে লুকায়িত বিদ্যুতের সাথে। অতএব, শাহবাগের আলোর ঝলকানি দেখিয়া শঙ্কিত হইবার কিছু নাই। আমাদের সন্তানেরা যখন জাগিয়া থাকে, তখন বাবা-মায়ের কিসের ভয়! আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, সম্ভাব্য সকল বালা-মুছিবত হইতে তাহারাই স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রসহ আমাদের সকল মহত্ অর্জনকে রক্ষা করিবে। একইসাথে ‘আধমরা’ এই জাতিকে ঘা মারিয়া বাঁচাইয়া তুলিবে।
