প্রতিবাদী তারুণ্যকে বিনি সুতার মালায় গেঁথে ফেলেছে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ। কি শিশু, কি বৃদ্ধ, কি নারী, কি পুরুষ - যারাই সেখানে এসেছেন, মনে হয়েছে অজানা এক বন্ধনে তারা আবদ্ধ। বলার অপেক্ষা রাখে না সেই বন্ধনটি হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার। সবার আচরণই ছিল তারুণ্যে ভরপুর। শরীরের ভাষা ছিল অকুতোভয় সৈনিকের মতো। মতামত প্রকাশে ছিল না কোন দ্বিধা-দ্বন্দ্ব। সৃজনশীল সব পদ্ধতিতে তারা মনের কথা প্রকাশ করেছেন অবলিলায়।
মানিকদি এলাকার ১৮ বছরের তরুণ মহিউদ্দিন আহমেদ জিন্স পরে উদাম গায়ে এসেছিলেন শাহবাগ চত্বরে। সারা গায়ে বর্ণিল হরফে লেখা ‘ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই, রাজাকারের ফাঁসি চাই’ শ্লোগান। প্রশ্ন করলে বললেন, আমি রাজাকারদের ফাঁসি চাই। সে জন্যেই মহাসমাবেশে হাজির হয়েছি। টঙ্গীর শাকিল, মহাখালীর সাকিব, কচুক্ষেতের কামরুজ্জামান কানন, নটর ডেম কলেজের ছাত্র মনসুর একই সুরে বললেন, আমরা আব্দুল কাদের মোল্লাসহ যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই। সেজন্যেই সংহতি প্রকাশ করতে গণজাগরণ মঞ্চে এসেছি। মোহাম্মদপুরের ফয়সাল জানালেন, তিনি প্রতিদিনই শাহবাগে আসছেন। কারণ একই। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির লেখাপড়া শেষ করেছেন নাবিলা, সমাবেশ স্থলে কথা হলো তার সঙ্গে। কোন দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছাড়াই বললেন, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই। আরও বললেন, আগেই আসতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সুযোগ পাইনি। ইস্কাটনের শেখ রেজাউল স্বপরিবারে এসেছিলেন সমাবেশে। তিনি জানালেন, সংহতি প্রকাশ করার জন্যেই এসেছেন।
শাহবাগের মোড়ে স্থাপিত গণজাগরণ মঞ্চের চতুর্দিকের সড়ক জুড়ে বিস্তৃত হয়েছিল জনসমাবেশ। লাখো মানুষের এই সমাবেশের প্রথম ডানাটি ছিল শাহবাগ থেকে মত্স্য ভবনের দিকে। গতকাল শুক্রবার বিকেল চারটার দিকে প্রথমে মত্স্য ভবন থেকে শাহবাগের দিকে যাওয়া সড়কে উপস্থিত হয়ে দেখা যায়, পুলিশ মত্স্য ভবন মোড় যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। মানুষ পায়ে হেঁটে সমাবেশ স্থলের দিকে যাচ্ছে। একের পর এক মিছিল আসছে। শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত চারদিক। সমাবেশের দ্বিতীয় ডানা ছিল শাহবাগ থেকে টিএসসি পর্যন্ত সড়কটিতে। সেখানে ছিল জনসমুদ্র। তৃতীয় ডানাটি ছিল শাহবাগ থেকে কাঁটাবনের দিকে। বিকেলে কাঁটাবনের মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, পুলিশ মোড় থেকেই সব যানবাহন ঘুরিয়ে দিচ্ছে। মহাসমাবেশে চতুর্থ ডানাটি ছিল শাহবাগ থেকে রূপসী বাংলা হোটেল পর্যন্ত বিস্তৃত। সেখানেও ছিল জনসমুদ্র।
মহাসমাবেশে কেন্দ্রীয় ভাবে চলছিল অনুষ্ঠান। আবার আড্ডার ঢঙ্গে গোল হয়ে বসে চলছিল প্রতিবাদী কর্মসূচি। এসব গোল বৈঠকে একেক সময় একেকজন শ্লোগান ধরছিলেন। সেখানে আরও চলছিল, আবৃত্তি, নাটকসহ নানা কিছু। তবে কেন্দ্রীয় মঞ্চ থেকে বক্তৃতার ফাঁকে ফাঁকে যখন শ্লোগান ধরা হচ্ছিল তখন সমাবেশের সবাই সুর মেলাচ্ছিলেন। কেন্দ্রীয় মঞ্চে সারাদিন ধরে চলেছে গান, নাটক, আবৃত্তি। এছাড়া সমাবেশস্থলে চলেছে, পোস্টার প্রদর্শনী, কার্টুন প্রদর্শনী। আর এসব কিছুরই মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি ঘৃণা জানানো।
