ভালোবাসা দিবস

ফুলের রাজ্য প্রস্তুত

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৮:৩৪
“জোটে যদি মোটে একটি পয়সা খাদ্য কিনিও ক্ষুধার লাগি, দু’টি যদি জোটে তবে ফুল কিনে নিও হে অনুরাগী।” আর তিনদিন পরই বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। ভ্যালেন্টাইন্স ডে। জাতি, গোষ্ঠি ও দেশের ভূখণ্ড পেরিয়ে দিবসটি ইতোমধ্যে পেয়ে গেছে সার্বজনীন গুরুত্ব। একথা বললে খুব বেশি ভুল হবে না যে, পৃথিবীব্যাপী সমান গুরুত্বে যে দিবসগুলো ঘটা করে উদযাপন করা হয় তার অন্যতম একটি এই ভ্যালেন্টান্স ডে। এখন তরুণ-তরুণী কিংবা মানব-মানবীর প্রেম ভালোবাসার মধ্যেই আর সীমিত নেই ভালোবাসা দিবস। এর পরিধি ছড়িয়ে গেছে বহুদূর। এটি পূর্ণাঙ্গভাবেই রূপ নিতে শুরু করেছে সার্বিক অর্থের ভালোবাসা দিবস হিসেবে। আর ভালোবাসার প্রভাব যে সর্বত্র বিরাজমান তা তো বলাই বাহুল্য। আজ ভালোবাসার একটি কঠিন যোগসূত্রের কথা বলব। যেখানে মাটি, ফসল, কৃষক-কৃষাণী, বাজার সব একাকার হয়ে গেছে ভালোবাসার বন্ধনে। ফুল। ঠিক ভালোবাসার মতই স্নিগ্ধ, সুন্দর, সুরভীময় এক সৃষ্টি। যার নিজস্ব এক আকর্ষণ ক্ষমতা রয়েছে। ভেতরে রয়েছে মধু, যা আহরণ করার জন্য ছুটে আসে মৌমাছি। ফুল হচ্ছে গাছের শোভা। আর গাছ হচ্ছে মাটির মমতায় বেড়ে ওঠা প্রাকৃতিক সম্পদ। সখের বাগান কিংবা, বন-বনানী ছেড়ে এই ফুল এখন দখল করেছে আবাদি ক্ষেত। ফুল শুধু পুষ্প অনুরাগীর সৌখিনতা নয়। ফুল এখন রীতিমত কৃষি উত্পাদন। কৃষকের ধান, গম, ভুট্টা, পাট কিংবা সবজির মত ফসল, যা বহু কৃষকের জীবনে ছড়িয়ে দিয়েছে অন্য এক সুরভী। দরজায় কড়া নাড়ছে দিবসটি। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরগুলোতে বিকিকিনি হবে সর্বোচ্চ ফুল। ফুল দিয়ে ভালোবাসা জানানোর প্রথা আজ গ্রামগঞ্জেও ছড়িয়ে পড়েছে। ভালোবাসা দিবস, পূজা, সম্বোর্ধনা, একুশে ফেব্রুয়ারি, বিয়ে, বাসর সাজানোসহ নানা অনুষ্ঠানগুলোয় আজকাল ফুলের প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। দিন দিন আমাদের দেশে, শহরে কি গ্রামে ফুল জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আগে আমদানিনির্ভর হলেও এখন বাণিজ্যিকভিত্তিতে ফুলচাষ হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। এমনি এক গ্রামের নাম পানিসারা। যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার শান্ত নিরিবিলি স্নিগ্ধ এক গ্রাম। এটিই দেশের সবচেয়ে অন্যতম বৃহত্ ফুল চাষ ক্ষেত্র। প্রতিবছরই ভালোবাসা দিবসের সৌরভ সবচেয়ে বেশি পৌঁছে ঝিকরগাছার গদখালী, পানিসারা, কেচন্দপুর, নারায়ণগালি ও পটুয়াপাড়া গ্রামে। ক্ষুদ্র-প্রান্তিক-মাঝারি কিংবা বড় কৃষক প্রত্যেকের জন্যই ভালোবাসা দিবস নিয়ে আসে অন্যরকম সমৃদ্ধি। ফুল চাষ ও বিকিকিনির মধ্য দিয়ে কয়েক বছরে পাল্টে গেছে এই এলাকার চেহারা। পাল্টে গেছে মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থা। গত কয়েক বছরে এ অঞ্চলের আবাদি ক্ষেতগুলোতে অন্যান্য খাদ্য ফসলের জায়গা দখল করে নিয়েছে ফুল চাষ। ফুল তাদের প্রধান অর্থকরী ফসল। কৃষক যুগ যুগ ধরে খাদ্যশস্য আবাদ করেছেন, কিন্তু এখন আর প্রচলিত মাঠ ফসলে পুষিয়ে উঠতে পারছেন না তারা। তাই বেছে নিয়েছেন ফুলের চাষ। যশোর, ঝিনাইদহের গ্রামে গ্রামে মাঠের ফুল থেকে সম্ভাবনার ফুল ফোটানোর এই তত্পরতা শুরু হয়েছে বেশ আগে। বছর দশেক আগে থেকেই ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের বহু পরিবার কৃষকের মাঠের ব্যস্ততা আর ঘরে ঘরে নারী ও শিশুদের গাঁদা ফুলের লহর তৈরির ব্যস্ততায় যেন ফুলের মতই বিকশিত হয়ে উঠেছে। আর এ অঞ্চলের কৃষকদের সমৃদ্ধি, ফুল চাষের প্রাচুর্য আর একেকটি দিবসকে ঘিরে ফুলের সমারোহ দেখতে হলে যেতে হবে গদখালি বাজারে। গদখালির প্রতিটি সকাল রঙিন হয়ে ওঠে নানা ধরনের ফুলে। লালসবুজের মিশেলে কৃষকের হাসিমাখা মুখ- যেন ফুটে উঠেছে অন্য এক বাংলাদেশ। এর নেপথ্য নায়ক শের আলী। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। এ আর দশটা এলাকার মতই এ এলাকাতেও চলত নানা রকমের ফসলের আবাদ। শের আলীর হাত ধরেই এই এলাকায় শুরু হয় প্রথম ফুলের চাষ। বলা যায়, সেটি ছিল দেশের বাণিজ্যিক ফুল চাষের সূচনালগ্ন। শের আলী উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন ভারতের বিভিন্ন এলকায় ফুল চাষের সাফল্য দেখে। তখন দেশের ফুলের বাজার দখল করে ছিল ভারত, থাইল্যান্ড, চীনসহ অন্যান্য দেশ। খুব বেশি চাহিদা ছিল না ফুলের। আশির মাঝামাঝিতে বাণিজ্যিক ফুল চাষের অল্প স্বল্প সাড়া জাগতে থাকে। যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলা সদর থেকে দিনে দিনে শার্শা, চৌগাছা, মনিরামপুর, কেশবপুরে খুব সীমিত পরিসরে ছড়িয়ে যেতে থাকে ফুল চাষ। কেউ কেউ সফল হন, কেউ কেউ হতাশ হয়ে ফিরে যান স্বাভাবিক চাষাবাদে। একদিকে সম্ভাবনা আরেক দিকে প্রতিবন্ধকতা। এ রকম আশা-নিরাশার মধ্যেই ঝিকরগাছা উপজেলায় রীতিমত বিপ্লব ঘটে যায় ফুল চাষে। প্রথম দিকে গাঁদা, গোলাপ ও রজনীগন্ধা দখল করতে থাকে কৃষকের আবাদি ক্ষেত। দিনের পর দিন বাড়তে থাকে আবাদি ক্ষেতে ফুলের বৈচিত্র। একসময় যে কৃষক তাদের ফসল আবাদ করত শুধুই তার বেঁচে থাকার চিন্তায়। এখন সে কৃষক মিলিত হয়ে গেছে বিশ্বায়নের সঙ্গে। যেকারণে কৃষকের কাছে আজ পরিস্কার বিশ্ব ভালোবাসা দিবস কিংবা এই দিবসে ফুলের গুরুত্ব কতখানি। এভাবেই একেকটি ভ্যালেন্টাইন্ট ডে, একটু একটু করে এগিয়ে নিয়েছে বহু কৃষককে। আজ কৃষক অকপটে বলেন, ধান পাট করে কোনো লাভ হয় না। তাই এসেছেন ফুল চাষে। তবে ফুল চাষ যখন বহুদূর এগিয়ে গেছে, তখন কৃষক মুখোমুখি হয়েছেন বিভিন্ন সংকটের। কৃষক বলছেন, বিশাল ফুল চাষ ক্ষেত্রকে এগিয়ে নেয়ার জন্য কৃষি বিভাগের তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। আজ ফুলাঞ্চলের কৃষক ও ব্যবসায়ীরা স্বপ্ন দেখেন গদখালীর ফুল দিয়ে শুধু দেশের চাহিদাই পূরণ নয়, বিদেশেও রফতানি করার। আর তার জন্য চাই বিভিন্ন প্রস্তুতি, প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগ। গদখালী বাজারে ফুল চাষির সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে ব্যবসায়ীর সংখ্যা। একসময়ের ছোট্ট বাজারটি এখন সারাদেশের ফুল চাষ ও বাজার ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু। সত্যিকার অর্থেই কৃষক ও উদ্যোক্তার হাত ধরেই ফুল চাষে বিশাল সাফল্যের পথে এগিয়ে গেছে দেশ। কিন্তু সে হিসেবে অগ্রসর হয়নি, গবেষণা ও সম্প্রসারণ। তারপরও মনে উত্সাহ নিয়ে এগিয়ে চলেছেন কৃষক। নিজেদের সংকট মোকাবিলা করছেন নিজেরাই। গদখালী বাজারের আনন্দমুখর মানুষগুলোকে সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে একটু এগিয়ে নেয়া গেলে, সত্যিই ফুল চাষে বিশাল এক বিপ্লবের জন্ম দেবে বাংলাদেশ। ফুলের ঋতু, ভালোবাসার ঋতু ফাল্গুনের সূচনা সময়ে সবাইকে ফুলেল শুভেচ্ছা।