অনেক সময় টমেটো বা আলু ক্ষেত আক্রান্ত হওয়ার পর মেনকোজেব জাতীয় ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করে কোনো ফল পাওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে অ্যাক্রোবেট অথবা মেলোডি ডিউ অথবা রিডোমিল গোল্ড আলু ক্ষেতে স্প্রে করতে হবে। স্প্রে করার সময় পাতার উভয় দিকসহ সম্পূর্ণ গাছ ভিজিয়ে দিতে হয়। এই ছত্রাকনাশকগুলোর যেকোনো একটি ৭ দিন পর পর ২ থেকে ৩ বার স্প্রে করতে হবে। যদি কুয়াশা দীর্ঘায়িত হয় তাহলে যত দিন কুয়াশা থাকে তত দিন সপ্তাহে ২ বার স্প্রে করা ভাল। সংকটাপন্ন আবহাওয়ায় যারা মেনকোজেব জাতীয় ছত্রাকনাশক ৩ থেকে ৪ দিন পর পর ব্যবহার করবেন তাদের ক্ষেত কম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু এই সময়ে ছত্রাকনাশক ব্যবহার না করলে গাছ আক্রান্ত হবার পর ছত্রাকনাশক ব্যবহার করে অনেক সময় ভাল ফল পাওয়া যায় না। অর্থাত্ এ রোগের জন্য প্রতিকার অপেক্ষা প্রতিরোধই উত্তম।
আগাম ধ্বসা রোগ:অতীতে সাধারণত মৌসুমের শুরুতে এ রোগটি দেখা গেলেও বর্তমানে যেকোনো সময়ই আলু ও টমেটোতে রোগটি দেখা যায়। বাংলায় আগাম ধ্বসা বলা হলেও ইংরেজিতে আর্লি ব্লাইট বলা হয়।
রোগের কারণ ও লক্ষণ:অষঃবত্হধত্রধ ংড়ষধহর নামক এক ধরনের ছত্রাকের কারণে রোগটি হয়। নিচের পাতায় ছোট ছোট বাদামী রঙের অল্প বসে যাওয়া কৌনিক দাগ পড়ে। আক্রান্ত অংশে সামান্য বাদামীর সাথে পর্যায়ক্রমে কালচে রঙের চক্রাকার দাগ পড়ে। পাতার
দাগে বৃত্তাকার পর্যায়ক্রমিক দাগই এ রোগের প্রধান বৈশিষ্ট্য। আক্রমণ ব্যাপক হলে পাতার অনেকগুলো দাগ একত্র হয়ে পাতার একটি বড় অংশকে পচিয়ে দেয়। পাতার বোঁটা ও কাণ্ডের দাগ অপেক্ষাকৃত লম্বা ধরনের হয়। গাছ হলদে হয়, পাতা ঝরে পড়ে। অকালে গাছ মরে যেতে পারে। আক্রান্ত টমেটো ফল ও আলুতে পচন দেখা যায়। এ রোগের আক্রমণে টমেটো ফলের বোঁটার নিচ থেকে পচন শুরু হয়।
উপযোগী পরিবেশ:এ ছত্রাকের জন্য সবচেয়ে উপযোগী তাপমাত্রা হল ২৬ থেকে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বৃষ্টিপাত ও কুয়াশা রোগের আক্রমণকে ত্বরান্বিত করে। অধিক ফলনশীল
গাছে এ রোগের আক্রমণ বেশি দেখা যায়। জমির উর্বরতা কমলে রোগের প্রকোপ বেশি হবে।
বিস্তার:আক্রান্ত টমেটো বা আলুবীজের মাধ্যমে এই ছত্রাক পরের বছরে রোগ ছড়ায়। অনেক সময় আক্রান্ত টমেটো বা আলুগাছ থেকেও এই রোগ সুস্থ টমেটো বা আলুগাছে ছড়ায়। এই রোগের জীবাণু বাতাস ও পানির মাধ্যমে ক্ষেতের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। জমিতে থেকে যাওয়া আলুতে এবং ফসলের অবশিষ্টাংশে এ রোগের জীবাণু বেঁচে থাকে।
নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা:আক্রান্ত ক্ষেত থেকে কোনো অবস্থায় বীজ নেয়া উচিত নয়। প্রত্যয়িত বীজ ব্যবহার করতে হবে। ক্ষেত সব সময় আগাছামুক্ত রাখতে হবে। প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন জাতের চাষ করতে হবে। সুষম সার প্রয়োগ এবং সময়মত ও পরিমিত সেচ প্রয়োগ করতে হবে। বীজের ওজনের ০.২৫% হারে ভিটাভেক্স ২০০ এর দ্রবণে বীজ শোধন করে নিতে হবে। রোগ প্রতিরোধের জন্য প্রতি লিটার পানিতে ইপরিডিওন গ্রুপের ছত্রাকনাশক যেমন রোভরাল ২ থেকে ৩ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭ থেকে ১০ দিন অন্তর অন্তর সেপ্র করতে হবে। এছাড়াও ডায়থেন-এম ৪৫, নেমিসপোর প্রভৃতি প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে ১০ থেকে ১২ দিন পর পর সেপ্র করলে সুফল পাওয়া যাবে।
আলু এবং টমেটো চাষে এ দু’টি রোগ প্রতি বছরই কৃষকদের জন্য আতংকের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই রোগ দু’টির ক্ষেত্রে বিস্তারিত জানা থাকলে দমন করতে সুবিধা হয়। অনুকূল আবহাওয়া দেখা দেয়ার সাথে সাথে ছত্রাকনাশক সেপ্র করে রোগকে মোকাবেলা করা যায়। আক্রমণের শুরুতেই ব্যবস্থা নিলে রোগ নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু রোগ সংক্রমিত হয়ে যাবার পর দমন করা কঠিন। এজন্য কৃষক ভাইদের সবসময় তাদের জমি পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। (শেষ)
লেখক:সহকারী অধ্যাপক
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
