বাজেটে দেশীয় প্লাস্টিক শিল্পকে সুরক্ষা দিতে হবে

আপডেট : ০৩ মে ২০১৯, ২০:২৮

দেশে উত্পাদিত প্লাস্টিক পণ্য অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। কিন্তু এই শিল্প বিকাশে বাস্তবসম্মত কর ও ভ্যাটহার কার্যকর না হওয়ায় নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে এ শিল্পখাত। ক্ষুদ্র-মাঝারি ও সেবা খাত শিল্পের উন্নয়নে আগামী ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের জন্য ভোক্তা ও ব্যবসাবান্ধব ভ্যাট ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশন (বিপিজিএমইএ)। বাজেট প্রস্তাবনা নিয়ে বিপিজিএমইএ’র সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন জানান, রপ্তানি বাণিজ্যে প্লাস্টিক শিল্পখাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে। প্লাস্টিক পণ্যের পাশাপাশি ফার্ণিচার দেশীয় চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। দেশে পর্যাপ্ত ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে এবং এগুলো পণ্য উত্পাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাই কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক হ্রাস, বিদেশি তৈরি পণ্যে অধিকহারে সম্পূরক শুল্ক নির্ধারণসহ আসন্ন বাজেটে (২০১৯-২০) একগুচ্ছ প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। এ খাতের বিনিয়োগ আকর্ষণে বার্ষিক টার্নওভারের ঊর্ধ্বসীমা বর্তমানের ৮০ লাখ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৫ কোটি টাকায় উন্নীত করাসহ টার্নওভার কর ৩ শতাংশ নির্ধারণ করা  প্রয়োজন। তিনি বলেন, স্থানীয় ঋণপত্রের উপর ৩% হারে উেস কর, এলসি কমিশনের উপর ৫% হারে উেস কর এবং আমদানি পর্যায়ে মূল্যের উপর ৫% উেস কর আদায় করা হয়। একই পণ্য উপর্যুপরি উেস কর এবং বহু ক্ষেত্রে অর্জিত মুনাফার উপর প্রদেয় করের চেয়ে বহুগুণ বেশি। কর্তনকৃত করসমূহ সমন্বয় বা ফেরত পাওয়া দুষ্কর। এ সকল উেস কর রহিত করা প্রয়োজন। এই শিল্প খাতে আবশ্যক সকল প্রকার মূলধনি যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ রেয়াতি সুবিধা পাচ্ছে না। সকল রপ্তানি খাতে করপোরেট কর হার সমান না করে বিদ্যমান বৈষম্য বহাল রাখা হয়েছে যা করনীতির পরিপন্থি। সকল রপ্তানি খাতের করপোরেট কর হার সমান ১০% হারে ধার্য করার দাবি জানান তিনি। এছাড়া একক এবং রপ্তানিমুখী গ্রামীণ ও ক্ষুদ্র শিল্প এবং নারী উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে খাতভিত্তিক যৌথ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্ডেড-ওয়্যারহাউজ সুবিধা প্রদান করা, রপ্তানিপণ্য প্রস্তুতকরণে ব্যবহূত আমদানিকৃত এবং দেশীয় উপকরণের উপর পরিশোধিত সকল শুল্ক ও কর মওকুফ গণ্য করে ফেরত প্রদান করা, রপ্তানিমুখী গ্রামীণ ও ক্ষুদ্র শিল্প এবং নারী উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভেঞ্চার-ক্যাপিটেল ফান্ড হইতে অর্থায়ন করার সুপারিশ করেন তিনি।

উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশীয় খেলনার ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপিত হওয়ার পর থেকে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, কেননা-দেশীয় খেলনা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ ক্ষুদ্র, এদের ভ্যাট দেওয়ার ক্ষমতা নেই। এছাড়া ১৫ ভাগ ভ্যাটের কারণে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি হওয়ায় বিদেশি নিম্নমানের পণ্য বাজারে আসছে। ক্ষুদ্র শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে ভ্যাট প্রত্যাহার করা প্রয়োজন।

বর্তমানে বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে প্লাস্টিকের পাইপ, ডোর, চেয়ার, টেবিল, নানান গৃহস্থালি পণ্য সামগ্রী তৈরি হচ্ছে। এসব পণ্য বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। পিভিসি স্টেবিলাইজার, স্টিয়ারিং এসিড ও পলিইথাইলিন ওয়াকস খুবই জরুরি কাঁচামাল যা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এসব পণ্য সামগ্রী ৫% আমদানি শুল্কে আমদানি করা গেলে উত্পাদন মূল্য কমবে। কমমূল্যে জনসাধারণ প্লাস্টিক পণ্য ক্রয় করতে পারবে।

চা শিল্পে, ফুড, ওষুধ, ডিটারজেন্ট প্যাকেট, সাবানের মোড়কে ব্যবহূত হয়। এ সমস্ত পণ্য তৈরি পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে আমদানি করতে হয়। জনস্বার্থে শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে শুল্ক হার কমাতে হবে। প্লাস্টিক ফার্ণিচার দেশীয় চাহিদা পূরণ পূর্বক বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। সুতরাং স্থানীয় শিল্প রক্ষার্থে তৈরি প্লাস্টিক পণ্য সমূহ আমদানি পর্যায়ে এর আমদানি শুল্ক সর্বোচ্চ করতে হবে। প্যাকিং-এর নামে ভারত থেকে আমদানিকৃত ফলমূলের সঙ্গে বিনা শুল্কে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক ক্রেট, কেইস বাংলাদেশে আসছে। এসব পণ্য পরবর্তীকালে স্থানীয় বাজারে মার্কেটিং করা হচ্ছে, যা স্থানীয় বাজারে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে দেশীয় প্লাস্টিক ক্রেট/কেইস শিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এমতাবস্থায় ভারত থেকে প্যাকিং ম্যাটেরিয়াল হিসেবে আমদানিকৃত প্লাস্টিক ক্রেট/কেইস-এর উপর যৌক্তিক হারে শুল্ক নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে আসা বিভিন্ন পণ্য যেমন টয়েজ, মেলামাইন, ব্যান্ড, ক্লিপ (মহিলাদের), প্লাস্টিক জুয়েলারি আইটেম ইত্যাদির উপর এ্যান্টি ডাম্পিং ডিউটি আরোপ করা  দরকার। স্থানীয় শিল্পের প্রতিরক্ষণের স্বার্থে যৌক্তিক পর্যায়ে এ্যান্টি ডাম্পিং ডিউটি আরোপ করা হলে অর্থনীতিতে ইতিবাচক ফল আসবে। বাংলাদেশে স্থাপিত প্লাস্টিক শিল্প কারখানাগুলো অভ্যন্তরীণভাবে চাহিদা পূরণে সক্ষম এবং এ শিল্পকে ঘিরে ইতোমধ্যে বহুশিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। নতুন নতুন বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে দেশীয় শিল্পকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে আমদানিকৃত প্লাস্টিক পাইপস-এর উপর ২৫% শুল্ক বহাল যুক্তিযুক্ত হবে।

ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে প্লাস্টিকের ব্যবহার্য বর্জ্য কালেকশন সিস্টেম উন্নত নয়। এ সমস্ত বর্জ্য কুড়িয়ে রি-সাইক্লিং এর মাধ্যমে নতুন পণ্য উত্পাদন হচ্ছে এবং বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। রি-সাইক্লিং প্রক্রিয়ার কারণে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হচ্ছে।  কাজেই এ শিল্পকে আয়কর মুক্ত রাখা প্রয়োজন।