ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে হাজির স্কুল পড়ুয়ারাও

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:৪৬
‘ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবি বাস্তবায়নে যোদ্ধার খাতায় নাম লেখাতে এসেছি। তাদের ফাঁসির মাধ্যমে দেশকে কলঙ্কমুক্ত করেই ছাড়বো। একাত্তরে ছিলাম না, এবার তাদের ছাড়বো না। মুক্তিযোদ্ধাদের দেয়া পতাকার মান রক্ষার দায়িত্ব নতুন প্রজন্মের। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করবো।’- যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে শাহবাগের তারুণ্যসমুদ্রে আসা রাজধানীর বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীরা এ ধরনের দৃপ্ত শপথে গতকালও অবিচল ছিলো। গতকাল শনিবার সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকরা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে আসতে থাকে। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র-ছাত্রী, ইডেন কলেজের ছাত্রীরা, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার কর্নেল তাহেরের দুই সন্তান নিতু ও মিশু, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম আযাদ, মহেশখালী স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন সংগঠন শাহবাগে এসে সংহতি প্রকাশ করে। দুপুর ১টার মধ্যে সহস্রাধিক স্কুলের ড্রেস পরিহিত ছাত্র-ছাত্রী শাহবাগে উপস্থিত হয়। এসময় বিক্ষোভের মূল মঞ্চ থেকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি এবং জামায়াত-শিবির প্রতিহত করার আহবান জানানো হয়। অবস্থান কর্মসূচিতে যথারীতি গণসংগীত, শ্লোগানে শ্লোগানে মুখর ছিল গোটা চত্বর। বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র মো. শাকিল আলম শাহবাগে এসে গণস্বাক্ষর করেন। এ সময় তিনি ইত্তেফাককে জানান, কাদের মোল্লাসহ সকল যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই। রাজকারদের ফাঁসি বাস্তবায়নে প্রয়োজনে আরেকটি যুদ্ধে অংশ নিতেও প্রস্তুত শাকিল। নানার কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জেনে জাগ্রত শাকিল এভাবে তার অনুভূতি ব্যক্ত করেন। একই কলেজের আরেক ছাত্র মারুফ মেহেদী বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি বাস্তবায়নে যোদ্ধার খাতায় নাম লেখাতে এখানে এসেছি। তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী জারা মনি গণস্বাক্ষরে লিখেছে, আমার জন্মকে কলঙ্কিত করবেন না, সকল যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই। শাহবাগে কেন এসেছো জানতেই জারা মনি জবাব, রাজকারের ফাঁসির দাবিতে এখানে এসেছি। গতকাল প্রজন্ম চত্বরে শ্লোগানগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ‘জামায়াতে ইসলাম, মেড ইন পাকিস্তান’, ‘এসো ভাই এসো বোন, গড়ে তুলি আন্দোলন’, ‘বাংলাদেশের মাটিতে জামায়াত-শিবিরের ঠাঁই নাই’, ‘ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’, ‘জ্বালো জ্বালো আগুন জ্বালো’, ‘পাকিস্তানের প্রেতাত্মারা, পাকিস্তানেই ফিরে যা’, ‘আমাদের ধমনিতে শহীদের রক্ত, এই রক্ত কোনো দিনও বৃথা যেতে দেব না’, ‘আর কোনো দাবি নাই, রাজাকারের ফাঁসি চাই’, তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘একাত্তরের হাতিয়ার, গর্জে উঠুক আরেকবার’, ‘সারা বাংলার মোহনা, শাহবাগ শাহবাগ’, ‘রক্ত দেব, জীবন দেব, রাজাকারদের ফাঁসি দেব’। গাজীপুর থেকে আসা ষাটোর্ধ্ব মুক্তিযোদ্ধা জালাল উদ্দিন শাহবাগে আসেন। তার এক হাতে পানির বোতল। আরেক হাতে একটি লাঠি। সঙ্গে কিছু দৈনিক পত্রিকা। একা এদিক সেদিক হাঁটছেন। তার চোখ মুখে কিসের যেনো অপ্রাপ্তি আর ক্ষোভ। তিনি বলেন, দেশ স্বাধীন করেছি যুদ্ধ করে। আবার যারা দেশের, দেশমায়ের বিরোধিতা করেছিলো তাদের ফাঁসির দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমেছি। নতুন প্রজন্মের দেশপ্রেম দেখে ভালো লাগছে। যে আশা নিয়ে যুদ্ধ করেছিলাম আজকের এই প্রজন্ম পারবে সেই আশা পূরণ করতে। ওদের সাহস যোগাতে নিজের মনের টানে আজ এখানে এসেছি। শাহবাগের উজ্জীবিত তারুণ্য শুধু পুরো বাংলাদেশকেই নাড়িয়ে দেয়নি, বিদেশিদের মাঝেও সৃষ্টি করেছে গভীর আগ্রহ। গতকাল শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে হাজির হন ব্রিটিশ তরুণী কেটি হার্ট। ইংল্যান্ডের একটি আন্তর্জাতিক ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠানের ট্যুর অপারেশন ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। দায়িত্বের অংশ হিসেবে সারা প্রথিবীই চষে বেড়াতে হয় তাকে। বাংলাদেশেও এসেছেন ট্যুরিজমের নতুন ব্যবসার ক্ষেত্র অনুসন্ধানে। শাহবাগ মোড়ের রাস্তার ঠিক মাঝখানের আইল্যান্ডের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি উপভোগ করছিলেন উজ্জীবিত তারুণ্যের স্পর্ধিত উচ্চারণ। বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের তারুণ্যের এই জোয়ারে তিনি অভিভূত। ব্লগার এন্ড অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কের উদ্যোগে এই আন্দোলন চলছে। ব্লগার নাফিজুর রহমান ইত্তেফাককে জানান, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি না হওয়া পর্যন্ত অরাজনৈতিক এ আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।