রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথমেই পুস্তকসাধারণকে ‘পাঠ্যপুস্তক এবং অপাঠ্যপুস্তক’ — এই দু’ভাগে ভাগ করেছেন। টেক্সট বুক কমিটি নির্বাচিত গ্রন্থগুলোকে তিনি অপাঠ্যপুস্তকের মধ্যে ফেলেছেন। “ কমিটি দ্বারা দেশের অনেক ভালো হইতে পারে; তেলের কল, সুরকির কল, রাজনীতি এবং বারোয়ারি পূজা কমিটির দ্বারা চালিত হইতে দেখা গিয়াছে, কিন্তু এ পর্যন্ত এ দেশে সাহিত্য সম্পর্কীয় কোনো কাজ কমিটির দ্বারা সুসম্পন্ন হইতে দেখা যায় নাই। ”— অর্থাত্ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৃঢ় প্রত্যয় কমিটি বিশেষ কিছু বই পাঠ্যতালিকায় অন্তর্ভূক্ত করে থাকে , যা শিক্ষার্থীর বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত নয়। তিনি মনে করেন — কমিটি নির্বাচিত পাঠের মধ্যে শিশুকে “নিবদ্ধ রাখিলে তাহাদের মন যথেষ্ট পরিমাণে বাড়িতে পারে না। অত্যাবশ্যক শিক্ষার সহিত স্বাধীন পাঠ না মিশাইলে ছেলে ভালো করিয়া মানুষ হইতে পারে না—” তিনি বেশ স্পষ্ট করেই বলেছেন—“আমরা যতই বি. এ , এম. এ পাস করিতেছি, রাশি রাশি বই গিলিতেছি , বুদ্ধিবৃত্তিটা তেমন বেশ বলিষ্ঠ এবং পরিপক্ক হইতেছে না। ...সেইজন্য আমরা অত্যুক্তি আড়ম্বর এবং আস্ফাালনের দ্বারা আমাদের মানসিক দৈন্য ঢাকিবার চেষ্টা করি। ” কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন , “ বাল্যকাল হইতে আমাদের শিক্ষার সহিত আনন্দ নাই। ... হাওয়া খাইলে পেট ভরে না, আহার করিলে পেট ভরে, আহারটি রীতিমত হজম করিবার জন্য হাওয়া খাওয়ার দরকার। ” মুখস্থ বিদ্যাকে তিনি একপ্রকার নকল করাই ভেবেছেন। এ প্রসঙ্গে তাঁর অভিমত: “ শিশুকাল হইতেই কেবল স্মরণশক্তির উপর সমস্ত ভর না দিয়া সঙ্গে সঙ্গে যথাপরিমাণে চিন্তাশক্তি ও কল্পনাশক্তির স্বাধীন পরিচালনার অবসর দিতে হইবে।” এবার স্কুল সম্পর্কে কবিগুরুর ভাবনা কী ছিলো । তাঁর ভাষায় “ ইস্কুল বলিতে আমরা যাহা বুঝি সে একটা শিক্ষা দিবার কল। মাস্টার এই কারখানার একটা অংশ। সাড়ে দশটার সময় ঘণ্টা বাজাইয়া কারখানা খোলে। কল চলিতে আরম্ভ হয়, মাস্টারেরও মুখ চলিতে থাকে। চারটের সময় কারখানা বন্ধ হয় , মাস্টার-কলও তখন মুখ বন্ধ করেন, ছাত্ররা দুই-চার পাত কলে-ছাঁটা বিদ্যা লইয়া বাড়ি ফেরে। তারপর পরীক্ষার সময় এই বিদ্যার যাচাই হইয়া তাহার উপরে মার্কা পড়িয়া যায়।” তিনি দুঃখ করে বলেছেন — “ শিশুদের জ্ঞানশিক্ষাকে বিশ্বপ্রকৃতির উদার রমণীয় অবকাশের মধ্য দিয়া উন্মেষিত করিয়া তোলাই বিধাতার অভিপ্রায় ছিল। সেই অভিপ্রায় যে পরিমাণে ব্যর্থ করিতেছি সেই পরিমাণেই ব্যর্থ হইতেছি। ” তাঁর মতে, “ সুগমতা, সরলতা, সহজতাই যথার্থ সভ্যতা। ” তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দ্যেশে বলেছেন: কেবল গ্রন্থগত বিদ্যা নয় , প্রাকৃতিক জ্ঞানভাণ্ডার থেকে নানান উপকরণ আহরণ করে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে হবে। “ চিত্ত যখন সমস্ত উপকরণকে জয় করিয়া অবশেষে আপনাকেই লাভ করে তখনই সে অমৃত লাভ করে।...নানা তথ্য, নানা বিদ্যার দিয়া পূর্ণতররূপে নিজেকে উপলব্ধি করিতে হইবে।...পরিণত জ্ঞানে জ্ঞানী হইতে হইবে। ” বিশ্বকবি বিধাতার কাছে কামনা করেছেন — “ আমাদের ছাত্রগণ যেন শুধুমাত্র বিদ্যা নহে , তাহারা যেন শ্রদ্ধা, যেন নিষ্ঠা, যেন শক্তি লাভ করে — তাহারা যেন অভয় প্রাপ্ত হয় , দ্বিধাবর্জিত হইয়া তাহারা যেন নিজেকে নিজে লাভ করিতে পারে।” এতক্ষণ তোমাদের কবিগুরুর বচন
শোনালাম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথার কিছু কিছু বিষয়ের প্রায়োগিকতা নিয়ে এ সময়ের প্রেক্ষাপটে হয়তো কথা থাকতে পারে। তবে তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য যা বলেছেন ,তা একেবারেই যথার্থ। কবি সুনির্মল বসু বলেছেন:“ বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র / নতুন ভাবের নানান জিনিস শিখছি দিবারাত্র।” ঠিক এবিষয়টিকেই কবিগুরু তাঁর মতো বলেছেন। পঞ্চ ইন্দ্রিয় দ্বারা জ্ঞানার্জনকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। সোনালি সনদ সর্বস্ব শিক্ষার দ্বারা কখনোই যথার্থ মানুষ হয়ে ওঠা সম্ভব নয়।
