রোম নয়, বাগদাদ নয়, পূর্ববঙ্গের সব রাস্তা তখন ঢাকায় এসে যেন এক বিন্দুতে মিশেছে। জেলা শহর, মহকুমা শহর থেকে বিস্তারিত খবর জানতে লোক আসছে, লোক যাচ্ছে। এক কথায় সাংগঠনিক তত্পরতা চলছে প্রদেশ জুড়ে। শীতের আমেজ কেটে যাচ্ছে রাজনৈতিক আবহাওয়ার উত্তাপে। পতাকা দিবস যত না অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তার চেয়েও বেশি গণসংযোগের প্রয়োজনে।
১১ ফেব্রুয়ারি। পতাকা দিবস সফল করে তুলতে যুবলীগ এবং ছাত্রাবাসের তরুণ কর্মিগণ বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। শহর ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ এ কাজের মধ্যমণি। নারায়ণগঞ্জ একুশে নিয়ে তখনো একপা এগিয়ে—শামজ্জোহা, সফি হোসেন, মমতাজ বেগম ও অনুরূপ কয়েকজনের নেতৃত্বে উত্তাল। ঢাকার মতোই স্কুলের কমবয়সী ছাত্র-ছাত্রীরাও পিছিয়ে নেই। তারা স্কুল ছেড়ে পথে, মাঠ ময়দানের জনসভায় হাজির। ঢাকার সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক যোগাযোগ বরাবরই গভীর। সেখানেও পোস্টার দেয়াললিপি একুশের জন্য ডাক পাঠাচ্ছে ছাত্র-ছাত্রী, তরুণ ও সর্বজনতার দিকে। শ্রমিক অঞ্চল নারায়ণগঞ্জ- প্রত্যাশা শ্রমজীবী মানুষও এ আন্দোলনের পক্ষে সাড়া দেবেন, ছাত্রদের পাশে এসে দাঁড়াবেন। ভাষার প্রশ্নটা তাদের জন্যও তো কম গুরুত্বপূর্ণ নয়- গুরুত্বপূর্ণ গোটা বাঙালি জাতির জন্য।
পতাকা দিবসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঢাকায় পোস্টার লেখারও ধুম পড়ে গিয়েছিল। আগেই বলেছি, শুধু চারুকলার ছাত্ররাই নয়- ইমদাদ বা আমিনুলই নয়, তাদের বেশ ক’জন এ কাজে যেমন ব্যস্ততা দেখিয়েছেন তেমনি মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র বদরুল, জিয়া হাসান, নুরুল ইসলামসহ কারো কারো আঙুলে চেপে বসে রয়েছে লালকালির ছোপ- লাল বর্ণমালার বিজয় নিশ্চিত করতে। অন্যদিকে একই কাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী। যদিও সংখ্যায় একটু কম, তবে এরা রাজপথের তত্পরতায় অধিক উত্সাহী।
ওই যে বলেছি, ঢাকার সিদ্ধান্ত, বেলতলার আহ্বান আর সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সমর্থনে প্রদেশ জুড়ে একুশের প্রস্তুতি যতদিন যাচ্ছে জোর কদমে চলছে। সুদূর উত্তরাঞ্চলের রংপুর, নীলফামারি, ডোমার, রাজশাহী, দিনাজপুর থেকে সর্বদক্ষিণে বন্দর নগরী চট্টগ্রাম (তিরিশের বীর চট্টগ্রাম!), নোয়াখালি, বরিশাল, ফরিদপুর আর উত্তরপূর্বে সিলেট, ময়মনসিংহ এবং মধ্যখানে কুমিল্লা, ব্রাক্ষণবাড়িয়া- আন্দোলিত এক বিশাল ক্যানভাস। বাদ যায়নি উত্তপ্ত পাবনা, বগুড়া, যশোর বা খুলনা। এছাড়াও মহকুমা শহর থেকে থানা- সব শিক্ষায়তনে এ আহ্বানে সাড়া পড়েছে।
দেশের সবকয়টা সাপ্তাহিক তাদের প্রতিবেদনে দেশব্যাপী বিক্ষোভ চেতনার চিত্র তুলে ধরে। সাপ্তাহিক ইত্তেফাক (১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২) আবেগ ঝরানো ভাষায় লেখে ছাত্রদের ডাকা হরতাল উপলক্ষে: ছাত্র হরতাল মহড়াই প্রদেশের সর্ব্বত্র শোভাযাত্রা ও সংগঠনে রূপান্তরিত হইয়াছে। ইহাতে স্পষ্ট উপলব্ধি জাগে- বাংলাভাষা ও বর্ণের অধিকার আজ এই প্রদেশবাসীর হূদয়ে কতখানি অধিকার করিয়া আছে। এই সুপ্ত আবেগের মহড়ার স্বতঃস্ফূর্ত অভিব্যক্তিই ভবিষ্যত্ আন্দোলনের ইঙ্গিত জানায়- ২১শে ফেব্রুয়ারীর আগমনী ঘোষণা করে। ...প্রদেশের সর্ব্বত্রই এই চেতনার নবজাগরণ দেখা দিয়াছে।’ এভাবে একুশের আগেই একুশের চেতনার আত্মপ্রকাশ হয় পূর্ববাংলাবাসীদের হূদয়ের উপলব্ধি থেকে। এই উপলব্ধি যেমন মাতৃভাষা নিয়ে মমতার তেমনি মাতৃভূমিকে ঘিরে ভালোবাসার। কোথায় পাহাড়ি সাতকানিয়া আর কোথায় মাদারিপুর বা মেঘনা পারের চাঁদপুর- সর্বত্র অস্থিরতা। এর মধ্যে দিনাজপুরে স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা ভাষার দাবির পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী স্লোগান তুলে আন্তর্জাতিক চেতনারও প্রকাশ ঘটিয়ে চলেছে। চট্টগ্রামের লাল দিঘি ময়দানেও ভাষা চেতনার লাল ছায়া দুলছে। পদ্মা-মেঘনার সংগমস্থলের শহর চাঁদপুরে স্কুল-কলেজের ছাত্র মজদুর ও জনসাধারণ রাষ্ট্রভাষা দিবস (সাপ্তাহিক ইত্তেফাক) নিয়ে উন্মাতাল। পত্রিকার প্রতিবেদন মতে, যুবলীগের ভূমিকা হয়ে ওঠে বিশেষ। এবং তা বাংলার অধিকাংশ অঞ্চলে।
এ সময়ের দুটি ঘটনা একুশের প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। প্রথমত মওলানা ভাসানীর সাংগঠনিক সফর এবং তা জেলা থেকে মহকুমায়, এমনকি তার রাজনৈতিক কর্মসূচির ভিত্তিতে থানা বা দূর প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সরকার-বিরোধী এ প্রচার জনমানসে প্রভাব ফেলেছে। স্বভাবতই একুশের আহ্বানে মানুষের পক্ষে সাড়া দেয়া সহজ হয়ে ওঠে। দ্বিতীয়ত বন্দিমুক্তি নিয়ে, সরকারি অন্যায় ও জুলুম নিয়ে প্রতিবাদও জনচিত্তে দাগ কাটে। মুসলিম লীগের দুঃশাসন সম্বন্ধে মানুষ ক্রমশ সচেতন হতে থাকে।
ভাসানীর ওই সাংগঠনিক সফর পরোক্ষ একুশের কর্মসূচি পালনের ভিত তৈরি করে। ছাত্রদের ভাষা বিষয়ক আন্দোলনের দিকে জনসাধারণেরও নজর পড়ে। ছাত্র-যুব নেতাদের সাংগঠনিক ঘাটতি এভাবে পূরণ হতে থাকে। মুসলিম লীগ সরকারের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ প্রকাশের উত্স হয়ে ওঠে একুশে ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি। একটি পরিপূর্ণ প্রতিবাদী দিন হিসাবে একুশে ফেব্রুয়ারির ফুটে ওঠার সম্ভাবনা এভাবে নানা সূত্রে তৈরি হতে থাকে। লেখক: ভাষাসংগ্রামী ও প্রাবন্ধিক
