দশ দিন আগেও বাংলাদেশে কেউ ভাবতে পারেনি এমন অভূতপূর্ব জাগরণের অমিত শক্তি আমাদের জনগণের মধ্যেই সুপ্ত অবস্থায় আছে। সপ্তাহের মাঝখানেই অন্যরকম এক বাংলাদেশকে মাথা তুলে দাঁড়াতে দেখতে পাওয়া গেল, যে বাংলাদেশ ১৯৭১-কে ফিরে পাওয়ার জন্যে ব্যাকুল হয়ে উঠেছে, শাহবাগ চত্বর থেকে এর মশাল যেন গোটা বাংলাদেশে প্রজ্বলিত হয়ে উঠেছে, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, উত্তরে-দক্ষিণে, পূর্বে-পশ্চিমে, শহরগঞ্জে, এমনকি গ্রামে গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে। কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দল বা নেতার কোনো আহ্বানের প্রয়োজন তাতে পড়েনি, নেতৃত্বও কাউকে দিতে হয়নি, স্বতঃস্ফূর্ত জনগণই প্রতিবাদে ফেটে পড়েছে। বিশেষত তরুণরাই প্রথম ফুঁসে উঠেছে, একাত্তরের ঘাতকদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে মাঠে নেমেছে। ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানে চারদিক মুখরিত হয়ে উঠেছে, নতুন প্রজন্মের যুবক, তরুণ, শিশু-কিশোররাও আকাশ-বাতাস যেন কাঁপিয়ে তুলেছে, বাংলাদেশে আবার যেন ১৯৭১-এর আবহ সৃষ্টি হয়েছে। এ এক অন্যরকম বাংলাদেশ, যা ১৯৭১-এর পর দীর্ঘদিন যেন হারিয়ে গিয়েছিল। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর জনতা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছে, একাত্তরের চিহ্নিত ঘাতকদের নাম উচ্চারণ করে দিন-রাত ক্লান্তিহীনভাবে শ্লোগান দিয়ে যাচ্ছে, সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানাচ্ছে। গত শুক্রবার ঢাকায় তাদেরই উপস্থিতিতে এক মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে—যেখানে বিশেষ কোনো বক্তা ছিলেন না, তবে প্রতিবাদের ভাষা ছিল উপস্থিত প্রতিটি মানুষের কথায় ও চলনে। দেশের সর্বত্র প্রায় একইভাবে প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছে, নতুন করে শপথ নেয়া হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বাংলাদেশকে গড়ার কথা উচ্চারিত হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতিসহ সকলকিছুকে পরিচালিত করার দৃঢ় শপথ নেয়া হয়েছে। এ এক অন্যরকমের আন্দোলন, অন্যরকমের নেতৃত্ব, অন্যরকমের উপস্থিতি, অন্যরকমের বক্তব্য, অন্যরকমের সংস্কৃতি ও জনতা তথা বাংলাদেশ। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া আমার দুই সন্তানকে গত কয়েকদিন আমি দেখছি শাহবাগ চত্বরে সমবেত জনতার সঙ্গে একাত্ম হয়ে থাকতে, তাদের চোখে-মুখে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। পিতা হিসেবে আমি, আমার মতো অনেকেই এমন পরিবর্তনে ভীষণভাবে আপ্লুত এবং আশাবাদী, আনন্দিতও বটে।
গত পাঁচ-ছয় দিনের ঘটনাবলীকে এখন গভীর আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থান থেকে দেখার দাবি রাখে, এমন অভূতপূর্ব ঘটনা বিনা কার্যকারণে ঘটার কোনো সুযোগ নেই, সমাজ-রাজনীতির পরিবর্তনসমূহ বিনা কার্যকারণে বা ছোটখাটো ঘটনায় কখনো ঘটে না। এর পেছনে নানা কার্যকারণ দীর্ঘদিন থেকে পুঞ্জীভূত হতে থাকে, সময় মতোই এর বিস্ফোরণও ঘটে থাকে, কখন সেই বিস্ফোরণটি ঘটবে তা আগে থেকে পুরোপুরি হয়তো বোঝা যায় না, তবে কিছু কিছু আলামত দেখা যায়, যা কেবল অন্তর্দৃষ্টি দিয়েই দেখা যায়। ইতিহাসে ছোট-বড় যতো পরিবর্তনের উদাহরণ পঠিত হয়, বা দেখা যায়—তা বিশ্লেষণ করলে সেই সত্যই ধরা দেয়। বাংলাদেশের নিকট-অতীত ইতিহাসের রাজনৈতিক ঘটনাবলী পর্যালোচনা করলেও তেমন শিক্ষাই আমরা পাবো। তরুণদের বর্তমান গণজাগরণের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
১৯৭১-এ মিরপুরে গণহত্যায় জড়িত কসাই বলে খ্যাত কাদের মোল্লার যাবজ্জীবনের কারাদণ্ডটি একটি উপলক্ষ মাত্র। কিন্তু কাদের মোল্লার বিচারের রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই গোটা দেশ যেন কিছুক্ষণের জন্যে মুষড়ে পড়েছিল, হতবাকও হয়েছিল, এর পরপরই তরুণদের একটি ছোট অংশ ঘুরে দাঁড়ানোর একটি ডাক দেয়—যা অল্প কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নতুন একটি অভাবনীয় দৃশ্যের জন্ম হতে থাকে—যার সঙ্গে দ্রুত যুক্ত হতে থাকে যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের দাবি মনে মনে পোষা লক্ষ-কোটি মানুষ, যারা এতোদিন বিচার প্রক্রিয়াকে দূর থেকে অবলোকন করছিলেন, একই সঙ্গে এই বিচারকে বাধাগ্রস্ত করার সঙ্গে যুক্ত জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডব ও বক্তব্যকে ঘৃণা করছিলেন। গত নভেম্বর মাস থেকে জামায়াত-শিবির এই বিচারের বিরুদ্ধে যেভাবে একের পর এক তাণ্ডব করে আসছিল, হরতাল, ভাঙচুর, গাড়ি পোড়ানো, পুলিশের ওপর নির্বিচারে হামলা ইত্যাদি ঘটনা ঘটিয়ে চলছিল—তাতে জনজীবনে যে আতঙ্ক তেরি হয়েছে, তাতে ১৯৭১-এ যে রাজনৈতিক অপশক্তি এদেশে গণহত্যাসহ নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল তাদের উত্তরসূরি হিসেবে বর্তমান ছাত্র শিবিরের কর্মকাণ্ডকে একইভাবে দেখা গেছে, ফলে নতুন করে ভেতরে ভেতরে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দিন দিন বৃদ্ধি পেয়েছে, পুঞ্জীভূত এতোসব ক্ষোভ প্রত্যাশিত রায় না পাওয়ায় বিস্ফোরিত হয়েছে। তাতে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী শাহবাগ চত্বরে দ্রুত গিয়ে মিলিত হয়েছে, প্রতিবাদের সকল প্রকাশ দিন-রাত ঘটিয়ে চলছে। স্বত:স্ফূর্ত এই সমাবেশ দ্বিতীয় দিনেই দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানেও তরুণরা এগিয়ে এসেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে সর্বোচ্চ সাজার দাবি উচ্চারিত হচ্ছে সর্বত্র। এই দাবি গণমাধ্যমের মাধ্যমে দেশব্যাপী এখন সবচাইতে আলোচিত ও আলোড়িত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। দেশের বাইরেও বাংলাদেশের তরুণদের এই নবজাগরণের বিষয়টি এখন প্রচারিত হচ্ছে। বাংলাদেশের সমাজ জীবনে মুক্তিযুদ্ধের আবেদন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং আদর্শিক রাজনীতির আবেদন একটি সাড়া জাগানো ঘটনা হিসেবে উঠে এসেছে।
ঢাকাসহ দেশের সর্বত্র যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার প্রতিবাদী কণ্ঠের বেশিরভাগই তরুণ-তরুণী। এতোদিন বলা হতো বেশিরভাগ তরুণ-তরুণী দেশ সম্পর্কে উদাসীন, মোবাইল, ইন্টারনেট, ফাস্ট ফুড নিয়ে ব্যস্ত। এই অভিযোগ যে পুরোপুরি সত্য নয়, তার প্রমাণ রেখেছে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ। এসব তরুণের বেশিরভাগই দেশের বড় রাজনৈতিক বা ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয়। তবে তারা আধুনিক একটি বাংলাদেশ রাষ্ট্র সম্পর্কে বেশ সচেতন, মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রিক চিন্তা-চেতনার গুরুত্ব সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন, তাদের লেখাপড়া, দেশকেন্দ্রিক চিন্তা, তথ্য প্রযুক্তিগত দক্ষতা ইত্যাদি যথেষ্ট রয়েছে। তাদের মধ্যে নেতৃত্ব দেয়ার মতো গুণাবলীও বেশ রয়েছে। তারা হয়তো যার যার মতো অবস্থান করছে, কিন্তু দেশের প্রয়োজনে তারা এখন সবার আগেই জড়ো হয়েছে, দেশব্যাপী স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তির উত্থানকে রুখে দিতে তারা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, দেশের জনগণকে তারাই ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছে— এটি এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা। দিনের পর দিন এইসব তরুণ-তরুণী প্রতিবাদের ধারা এখনো অব্যাহত রেখে চলছে, তাতে তাদের ক্লান্তি যেন নেই, বিশৃঙ্খলা-উচ্ছৃঙ্খলার অভিযোগও তাদের বিরুদ্ধে নেই, চাঁদাবাজি, মাস্তানির অভিযোগও নেই, উত্কট কোনো আচরণও নেই। এটি সম্পূর্ণরূপে নির্দলীয় হলেও মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রিক একটি আদর্শিক বাংলাদেশের স্বপ্নেঘেরা রাজনীতির আকাঙ্ক্ষা, যে রাজনীতি দেশের বড় কোনো রাজনৈতিক দলই পুরোপুরি ধারণ করতে পারেনি। যে কারণে এসব তরুণ-তরুণী দলীয় রাজনীতিতে খুব একটা যুক্ত হয়নি, কিংবা হচ্ছে না। তাদের মঞ্চ থেকে দলীয় কোনো শ্লোগানও দেয়া হচ্ছে না, অথচ বিভিন্ন প্রগতিশীল দলের নেতা-কর্মীরা যাচ্ছেন ঐ সব সমাবেশে—তবে বক্তা হিসেবে নয়, শ্রোতা বা দর্শক হিসেবে। এটি একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। তাতে বিস্মিত বা অবাক হওয়ার কিছু নেই। ১৬ কোটি মানুষের দেশে এ ধরনের ঘটনাকে স্বাভাবিক বলেই ধরে নিতে হবে। তবে দেশের বড়-ছোট অনেক দলই সমাজের এই বাস্তবতাটি এতোদিন হয়তো এভাবে উপলব্ধি করতে পারেনি।
এখন মনে হয়, দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে তাদের দল ও অঙ্গ সংগঠনসমূহের বাইরেও যে বৃহত্তর মেধাবী, সত্, যোগ্য এবং দেশপ্রেমিক মানুষ রয়েছে তাদেরকে ধারণ করার উপায় সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করার, তাদেরকেও দেশের নেতৃত্ব দানের সুযোগ করে দেয়ার। বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে পরিচালিত একটি আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে আজকের তরুণ ও কিশোর প্রজন্মের ভাবনাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে, দলীয় রাজনীতির গত্বাঁধা কাঠামো ও অবস্থার পরিবর্তন সাধন করতে হবে, সামাজিক শক্তিসমূহকে বিকশিত হতে দিতে হবে, তাদের জায়গাকে আরো বেশি অবারিত করতে হবে, তাদেরকে অবমূল্যায়ন করা আর মোটেও চলবে না। বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় বাংলাদেশ ভেতরে ভেতরে অনেক দ্রুত বদলে যাচ্ছে, আমাদের তরুণরাও তাদের মেধা, দেশপ্রেমকে অধিকতর কাজে লাগাতে পারলে ত্রিশ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বাংলাদেশ গড়া মোটেও অসম্ভব কিছু নয়। একই সঙ্গে যারা মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী চেতনায় তরুণদের ব্যবহার করে রাষ্ট্র-রাজনীতি করার বিশ্বাসে পড়ে আছে, তাদের এই গণজাগরণ যে বার্তাটি দিয়েছে তা যদি তারা বুঝতে ভুল করে থাকে, তাহলে আমি নিশ্চিত মুসলিম লীগের পরিণতি ভোগ করতে তাদের আর হয়তো বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না। কেননা, বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম ১৯৭১-এর বাংলাদেশ কেন্দ্রিক চিন্তা-চেতনায় গত কয়েক বছরে অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে যে, তার প্রথম প্রকাশ ঘটেছে ২০০৮-এর ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে, দ্বিতীয় বড় প্রকাশটি ঘটিয়েছে এখন। এ থেকে সকলকেই শিক্ষা নিতে হবে, বদলে যাওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে, স্বত:স্ফূর্ত এই গণজাগরণকে দেশ ও জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করার উদ্যোগ নিতে হবে। এর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই।
লেখক : ইতিহাসবিদ, সমাজ ও রাজনীতির বিশ্লেষক
