শাহবাগে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের শাহবাগ। কাদের মোল্লাসহ সকল যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবিতে গত মঙ্গলবার রাজধানীর শাহবাগে প্রেরণার যে প্রদীপ জ্বলেছিল গতকাল সোমবার গভীর রাতেও তা জ্বলজ্বল করছিল। রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পাড়া-মহল্লা-প্রতিষ্ঠান থেকে ‘গণজাগরণে’ সমবেত হচ্ছেন সব বয়সের মানুষ। জমায়েত হওয়া মানুষের সংখ্যাও দিনে দিনে বাড়ছে। তারা শ্লোগানে প্রকম্পিত করছেন শাহবাগ। এর অনুরণন ছড়িয়ে পড়েছে সারা বাংলাদেশে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনে সমবেত জনতা এখন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের অনুপ্রেরণা খুঁজে পেয়েছে। স্বপ্ন ও দাবি বাস্তবায়নে নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ারও প্রেরণা পেয়েছেন নতুন প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধারা। এ আন্দোলনে সমর্থন জানাতে দেশবাসীকে আজ বিকালে কর্মস্থল, বাসস্থান কিংবা অবস্থানস্থল থেকে বাইরে বেরিয়ে তিন মিনিট নীরবতা পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে। আর গণজাগরণের মূল মঞ্চের বাইরেও খণ্ড খণ্ড আয়োজনে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে শ্লোগান-সঙ্গীত চলে অবিরত। আন্দোলনের সপ্তম দিনেও ছেদ পড়েনি শ্লোগান-কর্মসূচিতে। আন্দোলন পাচ্ছে আরো সংহত রূপ।
তিন মিনিট স্তব্ধ থাকবে সারা দেশ :মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ও যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে চলমান আন্দোলনের সমর্থনে দেশবাসীকে কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানিয়েছে গণজাগরণ মঞ্চ। আজ বিকাল চারটা থেকে চারটা তিন মিনিট পর্যন্ত মোট তিন মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা পালনের জন্য দেশবাসীকে আহ্বান জানানো হয়। স্তব্ধতার মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান এবং রাজাকারদের প্রতি ঘৃণা জানাতে দেশের সব পেশার নাগরিকদের আহ্বান জানিয়েছেন আন্দোলনরতরা।
গতকাল বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে আন্দোলনের সূচনাকারী ব্লগার এন্ড অনলাইন এক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কের আহ্বায়ক ডা. ইমরান এইচ সরকার গণজাগরণের মূল মঞ্চ থেকে এ আহ্বান জানান।
ঘোষণায় তিনি বলেন, যে যেখানে আছেন, কলে-কারখানায়, গাড়িতে, রাস্তায়- মঙ্গলবার বিকাল ৪টা থেকে ৪টা তিন মিনিট পর্যন্ত দাঁড়িয়ে যাবেন এবং যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে পুরো বাংলাদেশকে স্তব্ধ করে দেবেন। ইমরানের এ ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে উপস্থিত জনতা হাত তুলে সম্মতি জানান। তিনি বলেন, রবিবার বিকালে জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে আমরা একটি স্মারকলিপি দিয়েছিলাম। এর ভিত্তিতে মহান সংসদ এবং প্রধানমন্ত্রী আমাদের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। পরে মন্ত্রিসভার বৈঠক ডাকা হয় এবং সোমবার সকালে সে বৈঠকে আইন সংশোধনের মাধ্যমে আইনের ফাঁক-ফোকর বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ফলে যুদ্ধাপরাধীদের পার পাওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই। এতে আমাদের প্রাথমিক জয় হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, কয়েকটি সংবাদ মাধ্যমে অপপ্রচার চলছে। তিনি এর তীব্র নিন্দা জানান। অপপ্রচার বন্ধ না করলে তাদের বয়কট করতে বাধ্য হবো। আমাদের আন্দোলন স্বতঃস্ফূর্ত। আন্দোলন যেভাবে চলছে, সেভাবে চলবে।
গণজাগরণে আন্দোলিত ভাষা মতিন
শাহবাগে চলমান আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে আন্দোলনরতদের অভিনন্দন জানিয়েছেন ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিন। গতকাল দুপুর সোয়া ১২টার দিকে ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিন হুইল চেয়ারে বসে সমাবেশস্থলে আসেন। তিনি তরুণদের উদ্দেশে মুষ্টিবদ্ধ হাত দেখিয়ে বলেন, এ জাগরণে আমি অভিভূত, আন্দোলিত। তারুণ্যের দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন এই আন্দোলন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবিরত সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা জিন্নাহ সাহেবকে বলেছিলাম, পাকিস্তানকে স্বাধীন শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে বাংলাকেই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করতে হবে; কিন্তু জিন্নাহ আমাদের কথা শুনলেন না। তিনি কার্জন হলের পেছন দিয়ে পালিয়ে গেলেন। এর এক বছর পর তিনি মারাও গেলেন। এরই ধারবাহিকতায় ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পায়।
ভাষা মতিন বলেন, মওলানা ভাসানি বলতেন, কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-জনতা এক না হলে আন্দোলন সফল হয় না। এ আন্দোলন অসাধারণ। এমন আন্দোলন আমরা কোনো দিনও দেখিনি। এর সফলতা আসবেই।
তিনি বলেন, সংগ্রাম শুরু হয়েছে অনেক আগে। যে সংগ্রাম চলছে, তা অব্যাহত থাকুক। সবাইকে এই সংগ্রামে যুক্ত থাকার আহ্বান জানান তিনি। উপস্থিত তরুণরা আন্দোলনে যুক্ত থাকার অঙ্গীকার করেন ও রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার শপথ নেন।
মাথার উপরে জাতীয় পতাকা, সড়কে অঙ্গীকার
গতকাল বিকাল চারটার দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) এবং বারডেম হাসপাতালের মধ্যবর্তী স্থানে বিশাল এক পতাকা উড্ডয়ন করেন আন্দোলনরতরা। শেষ বিকালের রোদে ৭০ ফুট দৈর্ঘ্যের ঝলমলে পতাকা ছায়া দেয় নিচে দাঁড়ানো তরুণ-কিশোর-যুবাদের। সেই পতাকার দিকে তাকিয়েই শ্লোগান তুললেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের ছাত্র আবদুল আজিজ। তার সাথে বন্ধুসহ সমবেত জনতা শ্লোগান তুলেন- ‘লাল সবুজের পতাকার, মান রাখবোই’, ‘আমাদের পতাকার, মান রাখবোই’। সেই সাথে ছিলো সেই শ্লোগান- ‘তুই রাজাকার’। বিশাল এ জাতীয় পতাকার দিকে তাকিয়ে সবাই যেন আন্দোলনকে সফল করতে নতুন করে অনুপ্রেরণা খুঁজে পেয়েছেন। যেমনি মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজের ছাত্রী নায়লা বললেন, এতো বড়ো পতাকা কখনো দেখিনি। গাইতে ইচ্ছে করছে জাতীয় সঙ্গীত। এই বলেই সাথে আসা বন্ধুদের নিয়ে গাইতে শুরু করলেন ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি.....’।
মুক্তিযোদ্ধাদের অংশগ্রহণ বাড়ছে
শাহবাগে চলমান আন্দোলন ইতিমধ্যেই ‘নতুন প্রজন্মের মুক্তিযুদ্ধের’ খেতাব পেয়ে গেছে। তরুণদের এ আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন একাত্তরের রণাঙ্গনের যাদ্ধারাও। তরুণদের আন্দোলনে তাদের সমর্থন ও সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। সাত দিনের আন্দোলনে গতকাল অন্য দিনগুলোর চেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের উপস্থিতি বেশি দেখা গেছে। জাতীয় জাদুঘরের প্রধান ফটকে ‘একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা’ ব্যানারে সমাবেশের সাথে সংহতি জানিয়ে শ্লোগান তুলেন প্রায় ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধা। এ সড়কে অন্তত চারটি এরকম মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান ছিল। আর মূল মঞ্চ ও পার্শ্ববর্তী এলাকায়ও অবস্থান করছিলেন অনেক মুক্তিযোদ্ধা। তাদের উপস্থিতি তরুণদের আরো অনুপ্রাণিত করেছে। ফেনী থেকে সমাবেশে আগত মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই তরুণদের নিয়ে মনে মনে কষ্ট ছিল। ভেবেছিলাম, তারা মুক্তিযুদ্ধের মর্মার্থ বুঝতে পারেনি। এ গণজাগরণ ও প্রজন্ম চত্বর সে ধারণা ভুল প্রমাণিত করেছে। তরুণদের শ্লোগানে এখন রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশের ছবি দেখতে সাহস পেয়েছি। এটি অভূতপূর্ব। এ আন্দোলন ধরে রাখতে হবে।
‘১৯৭১-এ গণস্বাক্ষর’
গতকাল সকালে শাহবাগের মত্স্য ভবন থেকে কাটাবনে যাওয়ার পথে লম্বালম্বিভাবে বিশাল এক ব্যানার সড়কে টাঙিয়ে দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ধারণাকে ধারণ করে ১৯৭১ ফুট দৈর্ঘ্যের ঐ ব্যানারে স্বাক্ষর করেন আন্দোলনরত ও আগত জনতা। ব্যানারটিতে লেখা হয়েছে- ‘১৯৭১-এ পেরেছি, ২০১৩ তেও পারবো। সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হবেই। কারণ ৭১-এর রেসকোর্স ময়দানই ২০১৩ তে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর’। বিকালেই ব্যানারটি স্বাক্ষরে ভরে গেছে। ব্যানারে সব শ্রেণির মানুষই স্বাক্ষর করেন। নীলক্ষেত হাই স্কুলের শিক্ষার্থী আদনান কবির ব্যানারে লিখেন-‘রাজাকারের ফাঁসি চাই, আর কোনো দাবি নাই।’ মনের ক্ষোভ ও দরদ মিশিয়ে গণস্বাক্ষরে অংশগ্রহণ করেন জনতা।
এছাড়া আন্দোলনের দ্বিতীয় দিন থেকে বিএসএমএমইউ হাসপাতালের সামনে চলমান গণস্বাক্ষর কর্মসূচি গতকালও অব্যাহত রেখেছে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড। এছাড়া এআইইউবি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান গণস্বাক্ষর কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন।
স্লোগানে স্লোগানে সাহসের সঞ্চার
গণজাগরণের প্রথম দিন থেকেই স্লোগানে উত্তাল ছিল শাহবাগ। গলা ভেঙ্গে গেছে, এরপরও স্লোগান থামাননি তরুণরা । ক্লান্তিহীনভাবে তারা স্লোগানে মুখরিত রাখছেন শাহবাগ। গতকাল শাহবাগে রাজধানীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সমাগম ছিল অন্য দিনগুলোর চেয়ে বেশি। আন্দোলনে এসে মূল মঞ্চের সঙ্গে কিংবা পৃথক হয়ে স্লোগান ধরেছেন বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ রাইফেলস কলেজ, মুন্সী আব্দুর রব রাইফেলস কলেজ, ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, বি এম শাহীন কলেজ, আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ, ইস্কাটন গার্ডেন গার্লস হাইস্কুল, সেন্ট যোসেফ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, প্রভাতি বিদ্যানিকেতন, উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা কমার্স কলেজ, ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ, নীলক্ষেত হাই স্কুলসহ বিভিন্ন শিক্ষায়তনের শিক্ষার্থীরা।
তরুণরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে নানা ধারণাকে সামনে রেখে স্লোগান তুলছেন। গতকাল বিকালে কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগারের সামনে কাদের মোল্লার প্রতীকী কফিনের চারপাশে ঘুরে স্লোগান দেন একদল তরুণ-‘তুই রাজাকার, তুই রাজাকার’। একটু দূরেই আরেক দল বসে স্লোগান দিচ্ছিল আরেকটি শূন্য প্রতীকী কফিন নিয়ে। কফিনে লেখা ‘কফিন রেডি, লাশ কই?’
সংহতিতে অনুপ্রাণিত আন্দোলন
গণজাগরণে তরুণদের আন্দোলনের সাথে শুরু থেকেই সংহতি জানিয়ে আসছেন মুক্তিযোদ্ধাসহ দেশের রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, শ্রমজীবীসহ সকল পেশার ও বয়সের মানুষ। এ আন্দোলনে তরুণরা আরো অনুপ্রাণিত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
গতকাল দুপুরে আন্দোলনরতদের দাবির সাথে সংহতি জানান একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির। এ সময় তিনি বলেন, ১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের আন্দোলন থেকে এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল। সেই আন্দোলনের প্রধান দাবি ছিল রাজাকারদের ফাঁসি এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ও জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করা, ৭২’র সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। তরুণরা সেই চেতনায় রাজপথে নেমেছে। আমার জন্য এরচেয়ে বেশি আনন্দের কিছু নেই।
শাহরিয়ার কবির বলেন, আন্দোলনরতরা জাহানারা ইমামের সন্তান। এ যুদ্ধ শুরু হয়েছিল রাজাকারদের ফাঁসির দাবিতে। জাহানারা ইমামের আন্দোলন আপনারা এগিয়ে নিয়ে যাবেন। গণআদালতে গণরায় বাস্তবায়নের দায়িত্ব আপনাদের। আপনারা ইতিহাসের নায়ক। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সোনার বাঙলা গড়ে তুলবেন আপনারাই।
তরুণদের সাথে গতকালও সংহতি জানিয়ে প্রজন্ম চত্বরে উপস্থিত হন শহীদ জায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, শহীদ কন্যা রেজা চৌধুরী সম্পা, ভাস্কর ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণী, অধ্যাপক মেজবাহ কামাল, কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, চিত্রনায়ক ফারুক, নাট্য অভিনেতা তারিক আনাম, এভারেস্ট বিজয়ী মুহিত ও নিশাত।
আন্দোলনরতদের সাথে সংহতি প্রকাশ করেছেন দেশের ব্যবসায়ী নেতারাও। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে গতকাল সন্ধ্যায় শাহবাগে এসে সংহতি জানান তারা। কাজী আকরাম উদ্দিন বলেন, সারা দেশের সাড়ে তিন কোটি ব্যবসায়ী এ আন্দোলনের সঙ্গে রয়েছে, থাকবে। আন্দোলনে যেকোনো ধরনের সহযোগিতা দিতে আমরা প্রস্তুত রয়েছি। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম। আজ দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ দেখালে তোমরা। মুক্তিযুদ্ধের পরে এতো বড় আনন্দ কখনো অনুভব করিনি।
এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি একে আজাদ, বর্তমান সহ-সভাপতি হেলাল উদ্দিন।
আন্দোলনে আছেন জাহানারা ইমাম
যুদ্ধাপরাধের বিচার দাবির অগ্রপথিক শহীদ জননী জাহানারা ইমামও যেন এ আন্দোলনে শরিক রয়েছেন। আন্দোলনরতরা তাকে স্মরণ করছেন গানে, বক্তব্যে স্লোগানে। গত বৃহস্পতিবার থেকে জাদুঘরের মূল ফটকের সামনের সড়কে শহীদ জননীর বিশাল ডিজিটাল পোস্টার স্থাপন করেছে ছাত্র ফেডারেশন। এর চারপাশে গাদা ফুলের বেষ্টনী। গতকাল এর সাথে যুক্ত হয়েছে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের শেষ খোলা চিঠির প্রদর্শনীও। দুটি বড় বিল বোর্ডের মাধ্যমে গণজাগরণ মঞ্চে প্রদর্শন করা হচ্ছে চিঠিটি। খোলা চিঠিতে যা লেখা আছে- ‘আমার সহযোদ্ধা বন্ধুগণ, আপনারা গত তিন বছর একাত্তরের ঘাতক ও যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমসহ স্বাধীনতাবিরোধী সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছেন। এ লড়াই আপনাদের, দেশবাসীর অভূতপূর্ব একতা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। আন্দোলনের শুরুতে আমি আপনাদের সঙ্গে ছিলাম। আমাদের অঙ্গীকার ছিল, লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত কেউ রাজপথ ছেড়ে যাবো না। মরণব্যাধি ক্যান্সার আমাকে মরণ কামড় দিয়েছে। আমি আমার অঙ্গীকার রেখেছি। রাজপথ ছেড়ে যাইনি। মৃত্যুর পথে বাধা দেবার ক্ষমতা কারোর নেই। তাই আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি এবং অঙ্গীকার পালনের কথা আরেকবার মনে করিয়ে দিতে চাই। আমি জানি, জনগণের মতো বিশ্বস্ত আর কেউ নয়। জনগণই সকল শক্তির উত্স। তাই গোলাম আযম ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে দায়িত্বভার আমি আপনাদের বাংলাদেশের জনগণের হাতে অর্পণ করলাম। নিশ্চিত জয় আমাদের হবেই। -জাহানারা ইমাম
নিরাপত্তা জোরদার
সমাবেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে শাহবাগ এলাকায় আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর বহু সংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। গোয়েন্দা, র্যাব, পুলিশ সমাবেশস্থলসহ চারদিকের সড়কে অবস্থান করছেন। নাশকতা ঠেকাতে সবধরনের প্রস্তুতি পুলিশের রয়েছে বলে জানান শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল ইসলাম।
হাসপাতালে লাকী
চলমান গণজাগরণের আন্দোলনে স্লোগানকন্যা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী লাকী আক্তার। ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক লাকী আন্দোলন শুরুর দিন থেকেই স্লোগানে মাতিয়ে রাখেন আন্দোলনরতদের। গত রবিবার সকাল থেকেই তিনি পানিশূন্যতায় ভুগছিলেন। এ জন্য ঐ দিনই বারডেম হাসপাতালে তিনি চিকিত্সাও নিয়েছেন। রাতে তিনি স্লোগান ধরতে কিছু সময় মূল মঞ্চে অবস্থান করেন। ঐ সময় তিনি অজ্ঞাতনামাদের হামলার শিকার হন। অজ্ঞাতানামারা তাকে আঘাত করেন। এতে তিনি মাথায় আঘাত পান। বারডেম হাসপাতালে তিনি চিকিত্সাধীন রয়েছেন।
রবিবার রাতেই মঞ্চে ফিরে লাকী জানান, মঞ্চে কে বা কারা তাকে আঘাত করেছিল, তা তিনি দেখেননি। শারীরিকভাবে কিছুটা দুর্বলতা অনুভব করছেন। আন্দোলনে তিনি অবিরত অংশগ্রহণ করবেন। আন্দোলন চলবে।
