জমে উঠেছে মেলা। মেলার টানে সারাদেশ থেকে আসছেন পাঠকরা। প্রতিবারই আসেন। তবে এবার ‘শাহবাগ আন্দোলনও টেনে আনছে অনেককেই। যেমন এনেছে চট্টগ্রামের ঝর্ণাধারা চৌধুরীকে। তিনি চাকরি করেন এনজিওতে। শাহবাগ আন্দোলনে শামিল হতে পাঁচদিনের ছুটি নিয়ে এসেছেন ঢাকায়। দুপুর থেকে শাহবাগে থাকেন। বিকালে চলে আসেন মেলায়। আবার সন্ধ্যার পর থেকে শাহবাগে। এভাবেই গত চারদিন কেটেছে তার। তিনি বললেন, বইমেলায় প্রতিবছরই আসি। তবে এবার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাইতে বেশিদিন থাকা হচ্ছে। তাই ঘুরে ফিরে বইও কেনা হচ্ছে বেশি।
অফিসের কাজে ঢাকায় এসেছিলেন নেত্রকোনার বিপুল মুন্সী। কাজ শেষ করে এসেছিলেন মেলায়। বললেন, ‘ভাষার মাসে আর বইমেলায় যদি আসতে না পারি তবে তো পুরো বছরটাই মাটি’। বইমেলা নিয়ে পুরো দেশে এমন আবেগই কাজ করে পাঠকদের হূদয়ে। বাঙালি যে দেশেই থাকুক না কেন, বইমেলা এলে এক দুর্নিবার টান অনুভব হয়।
ইংল্যান্ড থেকে ঢাকায় এসেছেন লেখক আয়েশা আহমেদ। এবার তার একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। বললেন, এটা আমার দ্বিতীয় বই। গত ৪০ বছর ধরে ইংল্যান্ডে রয়েছি। দেশে আসি কিন্তু বইমেলায় কখনো আসা হয়নি। যে সময়টায় আমি ছুটি পাই তখন বইমেলা শুরু হয় না। এবার বইমেলার সময়টায় ছুটি নিয়ে এসেছি। তিনি বললেন, বইমেলায় আসতে না পারলেও ইংল্যান্ডে বসেই আমরা খবর রাখি। কী বই বের হচ্ছে। বইমেলার জন্য এক ভিন্ন ধরনের টান অনুভব করি। এবার বইমেলা প্রাঙ্গণে ঘুরে খুব আনন্দ পেলাম। এত নতুন বই, এত মানুষ কল্পনা করা যায় না!
মেলায় আসা এবং বই কেনার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকেন সবাই। শুরুর কয়েকটি দিন কাটিয়ে এখন বইমেলা কানায় কানায় ভরে উঠেছে। পরিণত হয়েছে লেখক, পাঠক প্রকাশকের মিলনমেলায়। পুরোপুরি জমে উঠেছে মেলা।
নীতিমালা ভঙ্গের দায়ে ২০ প্রকাশককে নোটিস : নীতিমালা ভঙ্গের দায়ে ২০ প্রকাশককে নোটিস দিয়েছে বাংলা একাডেমী। নিয়ম না মানলে এবার তাদের স্টল বরাদ্দ বাতিল করা হবে বলেও জানিয়ে দেয়া হয়েছে। গতকাল রাতেই সব প্রকাশকের কাছে এ নোটিস পৌঁছে দেয়া হয়েছে বলে মেলা পরিচালনা কমিটির এক সদস্য নিশ্চিত করেছেন।
‘সাংবাদিকতার বাতিঘর তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া’ : সোমবার বিকালে মেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘সাংবাদিকতার বাতিঘর তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাংবাদিক আবেদ খান। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর এবং অধ্যাপক মোহাম্মদ সেলিম। সভাপতিত্ব করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক হারুন অর রশিদ।
প্রাবন্ধিক আবেদ খান বলেন, ‘পাকিস্তানি দুঃশাসনের ক্রান্তিকালে মানিক মিয়া বাংলাদেশের সাংবাদিকতার জগেক দান করেছিলেন আধুনিক অভিমুখ। প্রগতিবাদী সাংবাদিকতার দিশারী ছিলেন তিনি। মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি নির্মাণে তাঁর সম্পাদিত ‘‘ইত্তেফাক’’ পত্রিকা এবং তাঁর রাজনৈতিক কলাম সবিশেষ ভূমিকা পালন করে। তিনি বলেন, দুর্বৃত্তায়িত সাংবাদিকতার কালে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া প্রকৃতার্থেই আমাদের সাংবাদিকতা জগতের দিক নির্দেশক বাতিঘর হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।’
আলোচকবৃন্দ বলেন, ‘মানিক মিয়ার সম্পাদকীয় নীতি বাংলা সাংবাদিকতার জগতে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিলো। পেশাদারিত্বের সঙ্গে তিনি সংশ্লেষ ঘটিয়েছেন মানবিক বোধের। প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশে নিজস্ব নীতি ও আদর্শকে বিন্দুমাত্র বিসর্জন না দিয়ে তিনি শুধু উঁচুমানের সাংবাদিক-সত্তারই নয় সেই সঙ্গে একজন নির্ভীক দেশপ্রেমিকের পরিচয়ও দিয়েছেন।’
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক হারুন অর রশিদ বলেন, ‘তত্কালীন পূর্ববঙ্গে আধুনিক সাংবাদিকতার রূপরেখা নির্মিত হয়েছে মানিক মিয়ার হাতে। আমাদের সাংবাদিকতাকে তিনি রাজনীতি সচেতন করেছেন; বিশ্লেষণী সংবাদভাষ্যের মধ্য দিয়ে জনপ্রিয় করেছেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারণা।’ তিনি বলেন, ‘আমৃত্যু গণতন্ত্রের পূজারি মানিক মিয়া সংবাদপত্রকে জনমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীকে পরিণত করতে যে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছেন তা থেকে আজকের সাংবাদিকদের শিক্ষা নিতে হবে।’
সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে রূপু খানের পরিচালনায় সঙ্গীত পরিবেশন করেন ওস্তাদ মমতাজ আলী খান সঙ্গীত একাডেমীর শিল্পীবৃন্দ। এছাড়াও সঙ্গীত পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পী আনোয়ার হোসেন, পল্লবী সরকার মালতী, এনামুল হক, রীতা ভাদুরী, আহাদ চৌধুরী, শাহ মাহবুবুল আলম, সাগর বাউল, মুক্তার হোসেন শিপন ও ডালিয়া সুলতানা।
নজরুল মঞ্চের চিত্র : সোমবার মেলার একাদশ দিনে একাডেমীর নজরুল মঞ্চে ৭টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচিত হয়। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বিদ্যাপ্রকাশ থেকে আসা সামছুদ্দীন আহমেদের ‘গণতন্ত্র ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি’, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দে র নন্দিনী প্রকাশনী থেকে আসা হালিমা খাতুনের ‘রং তুলিতে টুনটুনিটা’র মোড়ক উন্মোচন করেন।
নতুন বই : সোমবার মেলায় ১২৪টি নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে গল্প ২২টি, উপন্যাস ২৫টি, প্রবন্ধ ১০টি, কবিতা ৩০টি, ছড়া ১টি, শিশুতোষ ৬টি, জীবনী ৪টি, মুক্তিযুদ্ধ ২, বিজ্ঞান ১টি, ভ্রমণ ৪টি, ইতিহাস ৩, চিকিত্সা/স্বাস্থ্য ১, রাজনীতি ১, রম্য/ধাঁধা ৩টি, ধর্মীয় ১টি, অনুবাদ ২ এবং অন্যান্য বিষয়ের উপর ৮টি বই এসেছে।
গতকাল মেলায় ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ এনেছে সৈয়দ শামসুল হকের ‘কেরানিও দৌড়ে ছিল’, সেলিনা হোসেনের ‘ভাষা মুক্তিযুদ্ধ সাহিত্য সংস্কৃতি’, অন্যপ্রকাশ এনেছে শাহানা কায়েসের ‘হুমায়ূন আহমেদের কয়েকটি চিঠি ও একটি ডায়েরি’, নাসরিন জাহানের ‘কানামাছি কোন স্বপ্নে ছুট?’, ঐতিহ্য এনেছে মাহবুব কবিরের সংগ্রহ ও সম্পাদনা ‘উকিল মুন্সির গান’, উত্স প্রকাশন এনেছে আয়েশা আহমেদের ‘পায়ে পায়ে প্রহর’, অনন্যা এনেছে ইমদাদুল হক মিলনের ‘শ্রাবণ জ্যোত্স্নায়’, পাঠসূত্র এনেছে তুষার কণা খোন্দকারের ‘ঘাম এবং সুশীতল পানির গল্প’, শুভ্রপ্রকাশ এনেছে পলাশ মাহবুবের ‘দুই দল দূরন্ত’, অনিন্দ্যপ্রকাশ এনেছে আহমদ রফিকের ‘বিচ্ছিন্ন পঙক্তিমালা’, ‘কবিতা সমগ্র’ ও ‘বিপ্ল¬ব ফেরারী তবু’, আগামী এনেছে আশরাফ আহমেদের ‘কলাচ্ছলে কলা’, অনন্যা ইমদাদুল হক মিলনের ‘শ্রাবণ জোত্স্নার’, সাহস এনেছে ঝর্ণা দাশ পুরুকায়স্থের ‘একুশ ও মুক্তিযুদ্ধে গল্পগুচ্ছ’, অনুপম এনেছে মোনায়েম সরকারের ‘কৃষক নেতা হাতেম আলী খান স্মারক গ্রন্থ’, শুদ্ধস্বর এনেছে শওকত হোসেন মাসুমের ‘কেলেংকারির অর্থনীতি’, ‘মাসুদুজ্জামানের দেবদূত পুরুষ ও যৌন নীতি’। সালমা বুক ডিপো এনেছে নির্মলেন্দু গুণের ‘ও বন্ধু আমার’ ও ‘চাষাভূষার গল্প’, পাঠসূত্র এনেছে মোহিত কামালের ‘বন্ধু আমার বন্ধু’ মহিবুল আলমের ‘সাদা মেঘের ভেলা’, শুভ্রপ্রকাশ এনেছে আহসান হাবীবের ‘নীল ডাউনে ফার্স্ট বয়’, ইকবাল খন্দকারের ‘স্কুল জুড়ে আতঙ্ক’, সিঁড়ি প্রকাশন আনে আশরাফুল আলম পিন্টুর ‘কুয়োব্যাঙের একদিন’ ও কাহলিল জীবরানের ‘দি প্রফেট’, বিভাস আনে রফিক আজাদের ‘সশস্ত্র সুন্দর’, ঐতিহ্য আনে ইশতিয়াক হাসানের ‘জঙ্গলে বিভীষিকা’, অনু হোসেনের ‘বোধ ও বাতি’, শ্রাবণ প্রকাশনী এনেছে সুফি হায়দার জুলফিকার রহমানের ‘অন্তরে প্রান্তরে’।
আজকের অনুষ্ঠান
আজ মঙ্গলবার বিকালে মেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘আলী আহমদ : পাণ্ডুলিপি সংগ্রাহক, গবেষক ও সম্পাদক’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান।
