দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়কে লইয়া সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার ব্যাপারে দড়ি টানাটানি কম হইল না। ইহা অতিশয় দুঃখের। সমন্বিত তথা গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা আরো এক দশক আগেই হইতে পারিত। ২০০৮ সালে তত্কালীন শিক্ষা উপদেষ্টা বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের ভর্তি পরীক্ষা গুচ্ছভিত্তিক করিবার প্রস্তাব দিয়াছিলেন। কিন্তু সেইসময়ও কোনো কোনো ভিসি এই শঙ্কা ব্যক্ত করিয়াছিলেন যে, ইহাতে তাহাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হইবে।
ইহার পর পদ্মা মেঘনা বুড়িগঙ্গা দিয়া অনেক পানি গড়াইয়াছে। গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা লইয়া স্বয়ং রাষ্ট্রপতি উদ্যোগী হইয়াছেন, কিন্তু তাহার পরও চালু হইব হইব করিয়াও হয় নাই। অথচ উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল বাহির হইবার পর একজন ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীকে ব্যস্ত হইতে হয় তথাকথিত দেশ-সফরে। ওই শিক্ষার্থীকে ঢাকায় পরীক্ষা শেষ করিয়াই বাস ধরিতে হয় রাজশাহীর, সেইখানে কোনোভাবে পরীক্ষায় অংশ লইয়াই ছুটিবার প্রস্তুতি লইতে হয় খুলনা, সিলেট কিংবা চট্টগ্রামের উদ্দেশে। এই অন্তঃহীন ছোটাছুটির মধ্যে রহিয়াছে টিকেট ম্যানেজ করিবার যন্ত্রণা। এমন কি অগণিত মেধাবী শিক্ষার্থীর সেই আর্থিক সঙ্গতিও থাকে না। অনেক দরিদ্র ছাত্রদের রাতে মসজিদে ঘুমাইয়াও ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার দৃষ্টান্ত আছে। কিন্তু গরিব নারী শিক্ষার্থীরা রাতে থাকিবেন কোথায়? অথচ একটি সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকিলে এই নাভিশ্বাস দশা হইতে মুক্তি মিলিত সহজেই। সর্বশেষ গত বত্সর ১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলির চ্যান্সেলর গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষার বিষয়ে ভিসিদের ডাকিয়া নির্দেশনা দেন। তবে সময় স্বল্পতার অজুহাত দেখাইয়া গত বত্সরও সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা চালু হয় নাই। দেখা যাইতেছে, কিছু বড় বিশ্ববিদ্যালয় নানা কারণে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার বিরোধিতা করিয়া আসিতেছে।
আলাদা ভর্তি পরীক্ষার উপর কয়েক বত্সর আগে গবেষণা চালাইয়াছে বিশ্বব্যাংক পরিচালিত উচ্চশিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্প (হেকেপ)। সেইখানে বলা হইয়াছে যে, প্রতি মৌসুমে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়া, কোচিংসহ আনুষঙ্গিক খাতে একজন শিক্ষার্থীর গড়ে ৯৬ হাজার টাকা খরচ হয়। অনেক দরিদ্র শিক্ষার্থীর পক্ষেই এই পরিমাণ অর্থ ব্যয় করাটা প্রায় অসম্ভব হইয়া পড়ে। অথচ সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হইলে অর্থ, সময়, মানসিক চাপ—সকল দিক দিয়াই মুক্তি মিলিত। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী এবং সরকার—উভয়পক্ষই যখন চাহিতেছে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা, তখন কাহাদের স্বার্থে চালু হইতেছে না এই পদ্ধতি?
আশার কথা হইল, ইতোমধ্যে সকল কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার ব্যাপারে নীতিগতভাবে একমত হইয়াছে। সমবৈশিষ্ট্যের বিচারে বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকেও গুচ্ছবদ্ধ করিবার যেই প্রস্তাব চূড়ান্ত করিয়াছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদ, এইবার যেন তাহার ব্যত্যয় না ঘটে। আমরা আশা করিব এই বত্সর সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার ব্যাপারে কোনো অকারণ অজুহাত দাঁড়া করাইবেন না কেহ।
