বিপ্লব বিশ্বাস
স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থীদের কাছে বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের কাছে পরীক্ষা এক যন্ত্রণাদায়ক, ভীতিকর ও আতঙ্কের বিষয় হিসেবে পরিচিত। ঘন ঘন পরীক্ষা আর লেখাপড়ার চাপের কারণে শিশুরা খেলাধুলা, আনন্দ-ফুর্তি এমনকি প্রাণভরে একটু হাসবার সুযোগও পায় না। আবার পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে তাদের ওপর নানারকম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনও চলে। শিশুদের এই অর্থহীন ও অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার চাপ থেকে মুক্ত রাখার জন্য ইতিমধ্যেই সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহল থেকে প্রস্তাব আসছে। অনেকেই মনে করেন মাধ্যমিক পর্যন্ত পরীক্ষামুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা উচিত। বর্তমানে পরীক্ষার চাপ ও আতঙ্ক শিশু-কিশোরদের দৈহিক ও মানসিক বিকাশে বড় বাধা বলেই অনেকে মনে করছেন।
আমাদের মনে রাখতে হবে, পরীক্ষার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উপযুক্ত ও যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষকের দ্বারা শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার আনন্দমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করা, পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু শিক্ষার্থীদের ভালোভাবে বুঝিয়ে দেওয়া এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে শিক্ষা সম্পন্ন করা। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের কাছে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করার অবারিত সুযোগ দেওয়া হলে এবং প্রশ্ন করার জন্য তাদেরকে উত্সাহিত করা হলে, শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়ার চেয়েও বেশি উপকৃত হবে। এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা যেমন বিষয় সম্পর্কে জানতে, শিখতে ও জ্ঞানার্জন করতে পারবে, তেমনি শিক্ষকও তাঁর শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করার সুযোগ পাবেন। ঘন ঘন পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জনে যেমন সহায়ক নয়, তেমনি তাদের মেধা বিকাশেও কোনো রকম সহায়তা করে না। বর্তমান পরীক্ষানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার কারণে বেশিরভাগ অভিভাবকের কাছেও সন্তানের জ্ঞানার্জনের চেয়ে পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়াটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ছে। এ কারণেই শিশুদের সুস্থ মানসিক বিকাশ বা জ্ঞানার্জনের চেয়েও পরীক্ষা নিয়েই অভিভাবকরাও বেশি উদ্বিগ্ন থাকেন। আর অভিভাবকদের এই উদ্বেগকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণির অসাধু শিক্ষক পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকেই বর্তমানে পরীক্ষা বাণিজ্যে পরিণত করেছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বছরে দুটি পরীক্ষা নেওয়ার সরকারি নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও উচ্চহারে ফিস আদায়ের মাধ্যমে অন্তত চারটি বা তারও বেশি পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। ফিসের টাকার একটি বড় অংশই কতিপয় শিক্ষকের পকেটে যাচ্ছে। কারণ এর কোনো হিসেব দিতে হয় না। এই সুযোগে পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়ার আশ্বাস দিয়ে শিক্ষার্থীদের তাদের কাছে প্রাইভেট পড়তেও বাধ্য করা হচ্ছে। এভাবেই পরীক্ষা নিয়ে চলছে এক রমরমা বাণিজ্য।
অন্যদিকে আমাদের শিক্ষা ও পরীক্ষা পদ্ধতি, প্রশ্ন কাঠামো, পাঠ্যবই, পাঠ্যসূচি ইত্যাদি কেমন হবে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। প্রায় প্রতিবছরই শিক্ষা পদ্ধতির পরীক্ষামূলক পরিবর্তন ও সংশোধন করা হচ্ছে, কিন্তু স্থিতিশীল কোনো শিক্ষাব্যবস্থা দেশের ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য প্রণয়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, উন্নত বিশ্বের কোনো শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের শিশু-কিশোরদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত হবে না। আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক ও পারিবারিক অবস্থা বিবেচনা করেই শিক্ষাব্যবস্থাকে উন্নত করতে হবে। আমরা আশা করি, সরকার শিশু-কিশোরদের জন্য যুগোপযোগী, ভীতিমুক্ত ও পরীক্ষার চাপমুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
ফরিদপুর
