বাংলা ভাষার মর্যাদা ও বিদেশি ভাষার চর্চা

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:১৯
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য স্থানে বিদেশি ভাষা শিক্ষার বহু কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। আর এসকল কেন্দ্রের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই হলো আমাদের দেশের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন প্রত্যাশাকারী। তারা নিজের মাতৃভাষাকে পর করে শুধুমাত্র আর্থিক ও সামাজিক দিক বিবেচনা করে বহু কষ্ট করে পরদেশি ভাষাকে আয়ত্ত করছে। পরদেশি ভাষা হূদয়ঙ্গমে শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে হলেও তারা সমর্থ হচ্ছে ন্যূনতম ভাষাগত দক্ষতা অর্জনে। কারণ এটিই বিদেশে যাবার জন্য তার আবশ্যিক যোগ্যতা। এটি ছাড়া সে অন্য কোনোভাবে নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করতে পারবে না। এমনকি অনেক দেশ তার নিজ দেশের ভাষায় দক্ষতা অর্জনকারীদের বিশেষ সুবিধায় সে দেশে নিয়ে কাজের সুযোগ করে দিচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা আমাদের নিজ দেশের কর্মক্ষেত্রে আমাদের ভাষাশহীদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া মাতৃভাষাকে ব্যবহারের কতটুকু উপযুক্ত ক্ষেত্র বা সুযোগ সৃষ্টি করতে পেরেছি? বা বাংলা ভাষায় দক্ষদের জন্য আলাদাভাবে কোনো কর্মক্ষেত্র তৈরি করতে পেরেছি? দয়া করে আমাদের দেশটাকে মধ্যম আয়ের দেশ বা অনুন্নত দেশ বলে এড়িয়ে গিয়ে ভাষার প্রয়োগকে প্রশ্নবিদ্ধ করবেন না। দেশের গুটি কয়েক মানুষ শুদ্ধ বাংলাভাষা চর্চার ব্যাপারে আওয়াজ তুললেও যেখানে দেশের অভ্যন্তরে সর্বত্র সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি, সেখানে আমরা আমাদের দেশের অভ্যন্তরে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বহু ভাষার প্রচলনকে সমুন্নত রেখে, বিশেষ করে ইংরেজি ভাষাকে গুরুত্ব দিয়ে জাতিসংঘের মতো উঁচু মানের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের দাপ্তরিক ভাষা করার দাবি বা তার কার্যকারিতা আশা করা নিয়ে আমার যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। শুধু বিদেশে নয়, দেশেও আজ ভালো চাকরি পাওয়া ও অন্যান্য ক্ষেত্রে যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে বিদেশি ভাষাজ্ঞান বিশেষ করে ইংরেজি ভাষাকেই বিবেচনা করা হচ্ছে। তাহলে একুশে ফেব্রুয়ারি এলেই আবাল-বৃদ্ধ মিলে শহীদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে শহীদ মিনারে যে জনস্রোতের সৃষ্টি হয়, তা কি শুধুই দিবস উদ্যাপনের তাগিদ বা কর্পোরেট বা বাণিজ্যিক সংস্কৃতির অংশ? শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে যাওয়ার সময় গাওয়া ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ — গানটি কি তাহলে অনুভব ছাড়া শুধুই অভিনয় করে গাওয়া হয়? আর অন্য ভাষা শিখবেই বা না কেন! শুধুমাত্র শুদ্ধ বাংলা ভাষার জ্ঞানসংবলিত দক্ষতা চেয়ে কয়টা বিজ্ঞাপন দৃষ্টি আকর্ষণ করে আমাদের? অথচ ইংরেজি ভাষায় লেখা ও বলার সুনির্দিষ্ট যোগ্যতা চেয়ে চাকরির বহু বিজ্ঞাপন প্রতিদিনই আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আর বিদেশি উন্নয়ন ও কর্পোরেট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের দেশে এই ইংরেজি ভাষা চর্চার মূল পৃষ্ঠপোষক। দুঃখ হয়— এই বিদেশি ও কর্পোরেট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের দেশের পিছিয়ে পড়া হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান ও আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য নানা কর্মসূচি বা প্রকল্প বাস্তবায়ন অথবা গবেষণা কর্মকাণ্ড গ্রহণ করলেও, সেই কর্মকাণ্ড পরিচালনায় ব্যবহার করা হয় ইংরেজি ভাষা। আরো দুঃখ হয়, যখন এসব কাজে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরেও দাপ্তরিক কাজে ব্যবহার করা হয় ইংরেজি ভাষা। কিন্তু ইংরেজি ভাষায় লিখিত মাঠ পর্যায়ের উন্নয়নের কর্মসূচি বা প্রকল্প বাস্তবায়নের যে নির্দেশনা প্রদান করা হয়, তা অনুধাবনে আমাদের সরকারি অফিসের কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের কতটুকু সক্ষম, সে কথা কি ভাবা হয়? আর সরকারি দপ্তরগুলো কেনইবা দেশের অভ্যন্তরে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করবে? বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগেও বাংলা ভাষা জয় করে নিয়েছে বহু মানুষের হূদয়। দিন দিন দেশে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার উত্কর্ষ ও সংখ্যা বাড়ছে। সমান তালে বাড়ছে বাংলা ভাষার প্রচার ও প্রসার। বর্তমানে মানুষের ভাব প্রকাশের অন্যতম অনুষঙ্গ মোবাইল ও কম্পিউটারে ইউনিকোডভিত্তিক বাংলা লেখার অভিনব সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, বিশ্বের জনপ্রিয় ইন্টারনেট সার্চ ইঞ্জিন গুগল ও তাদের ই-মেইল ও ওয়েব সাইটে, এমনকি সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম ফেসবুকও তাদের সাইটে বাংলা লেখার সুযোগ করে দিয়েছে। এর আগে যখন মানুষ তার ভাব প্রকাশে বাংলা শব্দকে ইংরেজি অক্ষরে প্রকাশ করতো, তখন মনের মাঝে একটা অতৃপ্তি কাজ করতো। তারই বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এখন ফেসবুক খুললেই প্রমাণ মেলে দেশের সমকালীন সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়ে সকল বয়সী মানুষের বহুমাত্রিক চিন্তা-ভাবনার বর্ণাঢ্য ঝড় আর অভাবনীয় অংশগ্রহণ। তাই এখনই সুবর্ণ সুযোগ বাংলাকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেবার এবং সুপ্রতিষ্ঠিত করার। আর সেই সময়টাকেই যদি আমরা আমাদের সদিচ্ছার অভাবে সুযোগটির সদ্ব্যবহার না করতে পারি, তাহলে এর দায় কার? তাই আমি বিশ্বাস করি, দেশের সর্বত্র সকল পর্যায়ে বাংলা ভাষার ব্যবহারকে শতভাগ সুনিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে আরো পরিমার্জিত আর গ্রহণযোগ্য অবস্থানে নেয়া সম্ভব। তাই সবশেষে যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, প্রয়োজনের তাগিদে অবশ্যই বিদেশি ভাষার চর্চা ও প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যক্তিগত স্মার্টনেস আর আধুনিকতা প্রকাশের অভিব্যক্তি হিসেবে বিদেশি ভাষার আবশ্যিক প্রয়োগ, আমাদের দীর্ঘদিনের লালিত প্রত্যাশার সঙ্গে কতটুকু সঙ্গতিপূর্ণ তা আমাদের সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞ মহল একটু ভেবে দেখবেন কি? ময়মনসিংহ